দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চীন- পর্ব-০২

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৭:১৩ পিএম


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চীন- পর্ব-০২

চীনা জনগণের সাহসিকতাপূর্ণ আত্মত্যাগের ফলে জাপানী ফ্যাসিস্ট শক্তির দ্রুত চীনের ভূখ- দখলের স্বপ্ন প্রতিহত হয়। শুধু তাই নয় অপেক্ষাকৃত অনগ্রসর সৈন্য নিয়েও চীনা যোদ্ধারা জাপানী সামরিক বাহিনীর অনেক ক্ষয়ক্ষতি করতে সমর্থ হয়। ১৯৩৭সালের ২৫ সেপ্টেম্বর চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন অষ্টম রুট বাহিনীর হাতে পিনজিনগুয়ান যুদ্ধে শত্রু বাহিনীর প্রায় এক হাজার সৈন্য নিহত হয়। একই বছর প্রায় এক লক্ষাধিক সৈন্য নিয়ে ১৩ আগষ্ট থেকে তিন মাসের চেষ্টায় জাপান সাংহাই দখল করলেও তাদের প্রায় এক চতুর্থাংশ সৈন্য হারাতে হয়। তারপর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা জুঝও দখল করতে গিয়ে ১৯৩৮সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে জাপানী বাহিনীর প্রায় ১০,০০০ সৈন্যকে প্রাণ হারাতে হয়। দক্ষিণাংশে ওহান রাজ্য দখল করতে গিয়েও জাপানীদের আরো ১০,০০০ সৈন্য হারাতে হয়। এছাড়াও অনেক ছোট ছোট যুদ্ধে চীনা যোদ্ধারা জাপানী সেনাবাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি করতে সমর্থ হয়। এভাবে যুদ্ধের প্রথম বছরটি কেটে যায় যখন জাপানীরা বুঝতে পারলো বিশাল চীনা ভূখ- খুব তাড়াতাড়ি কোনভাবেই দখল কর সম্ভব হবে না। ১৯৩৮ সালের শেষ দিকে জাপানী সমরবাদ তাদের সমগ্র সমরশক্তি দিয়ে নতুন ও আত্মরক্ষামূলক পদ্ধতিতে যুদ্ধে অগ্রসর হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রসার
প্রতিরোধ যুদ্ধের শুরু থেকেই চীনা সরকার বৃটেন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও অন্যান্য দেশের কাছে জাপানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানায়। কিন্তু বৃটিশ ও ফ্রান্স সরকার পূর্ব থেকেই ইউরোপীয়, জার্মান এবং ইটালিয়ান সম্প্রসারণবাদীদের চাপে ছিল, তারা পূর্বাঞ্চলে এশিয়ার দিকে মনোযোগ দিতে আগ্রহী ছিল না এবং জাপানী আক্রমণ সম্পর্কে নীরব ভূমিকা পালন করে। সুতরাং লীগ অফ নেশন্স জাপানী আক্রমণকারীদের কোন প্রকার বাঁধাই প্রদান করেনি।

ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং অন্যান্য দেশের এই নীরব ভূমিকার ফলে ফ্যাসিস্ট শক্তির সম্প্রসারণবাদী ভূমিকার কোন পরিবর্তন ঘটলো না। কোন বাধা না পেয়ে জাপান পরদেশ দখলে আরো উৎসাহিত হয়, এতে গণতান্ত্রিক দেশসমূহের দুর্বলতাই প্রকাশ পায় এবং জাপানের পাশাপাশি জার্মানী ফ্যাসিস্ট শক্তি তাদের দেশের আয়তন বাড়ানোর জন্য উৎসাহিত হয়। জার্মানী দ্রুত চেকোস্লোভাকিয়া দখল করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। চেকোস্লোভাকিয়া একটি ছোট দেশ, কিন্তু অবস্থানগতভাবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান, কারণ দেশটি ইউরোপের কেন্দ্রভূমিতে অবস্থিত। জার্মানীর সৈন্যবাহিনী অষ্ট্রিয়ার সাথে মিলিতভাবে চেকোস্লোভাকিয়াকে তিনদিক থেকে ঘেরাও করে ফেলে এবং ইউরোপের উপর প্রভুত্ব বিস্তার করার উদ্দেশ্যে হিটলার তার সেনাবাহিনীকে অগ্রসর করে এবং চেকোস্লোভাকিয়ার সাডেটেন এলাকার উপর মালিকানা দাবী করে। এধরনের হুমকির মুখেও ব্রিটেন এবং ফ্রান্স দুর্বলতা প্রকাশ করে। জার্মানীর মিউনিখে এক সভায় জার্মানী, ইটালী, ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের প্রতিনিধিরা মিলিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় শান্তির জন্য চেকোস্লোভাকিয়াকে জার্মানীর নিকট সাডেটেন এলাকা হস্তান্তর করতে হবে। উক্ত সম্মেলনে চেকোস্লোভাকিয়ার কোন প্রতিনিধি ছিল না। এই ধরনের অন্যায় চুক্তির ফলে যুদ্ধে উদ্ভূত সমস্যাগুলি সমাধান না হয়ে বরং তা বিরূপ পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছিল। জার্মান এবং ইটালিয়ান ফ্যাসিস্ট শক্তি দিনে দিনে উদ্ধত ও বেপরোয়া হয়ে উঠছিল। মাত্র কয়েকমাস পর জার্মান লীগ অব নেশানস্ থেকে পদত্যাগ করে চেকোস্লোভাকিয়া দখল করে নেয়। ইটালীও এই সুযোগে আলবেনিয়া দখল করে। ১৯৩৯সালের ২২মে জার্মানী এবং ইটালী একটি সামরিক জোট গঠন করে যার নাম দেয় ‘প্যাক্ট অফ স্টীল’ এবং জার্মানী, পোলান্ড আক্রমণ করার প্রস্থতি নেয়। এসকল ঘটনায় ব্রিটেন এবং ফ্রান্স বুঝতে পারলো যে এসবই হচ্ছে তাদের দুর্বল ও ভ্রান্ত নীতির ফলে। এসবের প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটেন ও ফ্রান্স পোলান্ডকে সাহায্য করার জন্য যুদ্ধের প্রস্থতি গ্রহণ করে, একই সাথে জার্মানীর পূর্বাঞ্চলে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য রাশিয়ার সাথে যোগাযোগ করে।

কিন্তু ঘটনা তখন অনেক দূর গড়িয়েছে। দীর্ঘকাল যাবৎ জার্মান রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছিল। জার্মান যখন পোলান্ড আক্রমণ করে রাশিয়ার তখন কিছুই করার ছিল না। কিন্তু পোলান্ড ছিল রাশিয়ার সীমান্তবর্তী একটি দেশ। প্রাথমিকভাবে সোভিয়েত রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং অন্যান্য জাতির নিকট জোরালোভাবে জার্মানীর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একত্রে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানায়। কিন্তু ব্রিটিশ ও ফ্রান্স সরকারের চেকোস্লোভাকিয়া সংক্রান্ত মিউনিখে অনুষ্ঠিত সাধিত অন্যায় চুক্তির ফলে সোভিয়েত সরকারের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয় যে পশ্চিমা শক্তি জার্মানীর পূর্বাঞ্চলে আগ্রাসনকে হয়ত উৎসাহিত করবে।

এইরূপ জটিল ও সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে সোভিয়েত রাশিয়া আত্মরক্ষার উপায় হিসাবে ১৯৩৯ সালের ২১ আগষ্ট ব্রিটেন ও ফ্রান্স থেকে সরে আসে এবং জার্মানীর সাথে আলাদাভাবে সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং জার্মানীর পোলান্ড দখল সমর্থন করে। ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর কোন প্রকার যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই জার্মান পোলান্ড দখল করে নেয়। দুই দিন পর ব্রিটেন এবং ফ্রান্স বাধ্য হয়ে জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। স্বল্প সময়ের মধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উদ্ভব ঘটে।

জাপানের বিরুদ্ধে চীনের প্রতিরোধযুদ্ধ গণতান্ত্রিক দেশসমূহের জন্য যুদ্ধের ধ্বংসলীলা সম্পর্কে শিক্ষা

একথা সত্য, ইউরোপের মত চীনেও আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধ বারবার ব্যর্থ হচ্ছিল। এক বছরের মধ্যে চীনের প্রায় এক মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার এলাকা জাপানী সৈন্যেরা দখল করে নেয়। চীনের বিশাল এলাকা এবং জনসাধারণের কথা বিবেচনায় রেখে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি আত্মরক্ষামূলক প্রতিরোধের পরিকল্পনা গ্রহণ করে, সেনাবাহিনীর অধিকাংশ সদস্যদের জাপানী অধিকৃত এলাকার গ্রামাঞ্চলে প্রেরণ করে যাতে তারা তথাকার লোকদের উদ্বুদ্ধ ও সংগঠিত করে এবং শত্রুর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারে। এভাবে শত্রু পরিবেষ্টিত এলাকায় এক নতুন ধরনের প্রতিরোধযুদ্ধের পটভূমি গড়ে উঠে। বিশ্বে এধরনের প্রতিরোধ যুদ্ধ সৃষ্টি এটাই প্রথম। একই সময় চীনা সরকার তাদের হেডকোয়ার্টার নানজিং থেকে চোংকিং এ স্থানান্তর করে। এর ফলে একদিকে মূল সমরক্ষেত্রে সক্রিয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে অপরপক্ষে সমুদ্রতীর থেকে দূরে দক্ষিণপশ্চিম চীনে শক্তিশালী সামরিক ঘাটি গড়ে তোলে। এভাবেই চীনা জনগণের সমন্বয়ে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধযুদ্ধ ব্যবস্থা গড়ে উঠে। এই ভাবে প্রতিরোধ যুদ্ধের নীতিমালার অধীনে বিশাল চীন দেশে ব্যাপক জনসাধারণের সমন্বয়ে অসংখ্য মানুষের সাহসিকতাপূর্ণ আত্মত্যাগের মাধ্যমে জাপানী ফ্যাসিস্ট শক্তির ক্রম অগ্রসরমান অবস্থাকে ক্রমশই মন্তুর করে দিতে সমর্থ হয়। চীনা জনগণের আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধযুদ্ধ ইউরোপ ও আমেরিকার গণতান্ত্রিক জাতিসমূহের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়।

চীন ছিল একটি দুর্বল আধা উপনিবেশিক আধা সামস্ত্রতান্ত্রিক দেশ। প্রাথমিকভাবে এই দেশের পক্ষে জাপানের মত অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিশালী দেশের আক্রমণ ঠেকানোর মত পরিস্থিতি চীনের ছিল না। তা সত্ত্বেও বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের সাহায্য সহযোগিতা ছাড়া এরকম একটি প্রতিরোধযুদ্ধ অব্যাহতভাবে পরিচালনা করার দৃষ্টান্তের ফলে সারাবিশ্বের মুক্তিকামী মানুষ আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে সাহসিকতাপূর্ণ সংগ্রামের অনুপ্রেরণা লাভ করে। চীনা জনগণের প্রতিরোধযুদ্ধের বিশেষ দিক ছিল, শত্রুদের প্রবল সমরশক্তি সত্ত্বেও যুদ্ধক্ষেত্রে কোন চীনা সৈন্য আত্মসমর্পণ করেনি। চীনা জনগণের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের দৃঢ়তা দেখে বহু বিদেশী সাংবাদিক এবং লেখক এদেশে আসে এবং বীরত্বপূর্ণ গাঁথা রচনা করে। এসকল সাংবাদিক এবং লেখকরা যখন স্বদেশে ফিরে গিয়ে চীনা জনগণের আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধ যুদ্ধের বর্ণনা দেয় তখন বিশ্বের জনগণ এই স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রতি সমর্থন দেয় এবং জাপানী আগ্রাসী শক্তির অন্যায় আক্রমণ ও নিষ্ঠুর আচরণের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে। এর ফলে সারা বিশ্বের শান্তিপ্রিয় ও গণতন্ত্রকামী মানুষ জাপানী ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে চীনা জনগণের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি একাত্মতাবোধ প্রকাশ করে। শুধু তাই নয় অনেক দেশ থেকে স্বেচ্ছাসেবক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী চীনা জনগণের প্রতিরোধযুদ্ধকে সহায়তা করার জন্য এগিয়ে আসে এবং প্রতিরোধযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এমনকি অনেক বিদেশীকে চীনা জনগণের পাশাপাশি যুদ্ধের শেষের দিকে জীবন দিতে হয়।

দ্বিতীয়ত চীনের প্রতিরোধযুদ্ধের ফলে মিত্রপক্ষ যথা সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশের পক্ষে জাপানী ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পরাজিত করা সহজ হয়। জাপানী ফ্যাসিস্টরা দীর্ঘকাল যাবৎ উত্তরদিকে অর্থাৎ রাশিয়াকে আক্রমণ করারও পরিকল্পনা করছিল। সময় পেলে তারা তাও কারত। তারা সবসময়ই তাদের সবচেয়ে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতো সোভিয়েত ইউনিয়কে। জাপান কর্তৃক উত্তর-পূর্ব চীনে প্রভুত্ব করার ব্যাপারে সোভিয়েত ইউনিয়নকে সর্বাপেক্ষা বৃহৎ হুমকি মনে করতো। সেজন্য জাপান কর্তৃক চীনা এলাকা অধিকার করার পর জাপানের সামরিক হেড কোয়ার্টার থেকে কয়েকবারই উত্তর দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের এলাকায় সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু চীনা জনগণের অব্যাহত প্রতিরোধযুদ্ধের কারণে সেদিকে মনোযোগ দেয়ার মত তাদের সুযোগ ছিল না।


কবির আহমেদ
অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক নির্বাহী
(জনতা ব্যাংক লিমিটেড)

 

Ads