স্লোগান হোক- 'নিরাপদ দেশ চাই'
১২ আগস্ট ২০১৮, ০৩:৫৫ পিএম
বাংলাদেশ একটি ইস্যু প্রধান দেশ। তুচ্ছ কিংবা বিরাট, সব ইস্যু নিয়েই আজকাল দেশব্যাপী আন্দোলন হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এ নিয়ে ট্রোলিংয়ের সৃষ্টি হয়। দিনভর গুজব চলে। আইসিটির ৫৭ ধারার মামলায় পড়ে অনেকে জেল-হাজতে যায়। অনেকে নিরাপত্তাবোধ করে না। কেননা, কখন কোন কথায় কি না কি হয়ে যায়। তবে দেশের নানাবিধ সমস্যা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলা নিয়ে জনগণ মুখ খুলতে এখন একটুও কুন্ঠাবোধ করে না। সাম্প্রতিক সময়ে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন নিয়ে দেশজুড়ে যে অনিরাপত্তা ও আপত্তিকর পরিস্থিতির তৈরী হয়েছিল, তার পেছনেও এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে তৈরিকৃত ইস্যুই সর্বাংশে দায়ী ছিল। তবে সব কিছুকে আবার গুজব বলে চালিয়ে দিলে দেশের গণতন্ত্রের ধারা নষ্ট হবে তা সত্য। সড়ক দূর্ঘটনায় মানুষ মৃত্যুর ইস্যুটি কখনই হাস্যকর নয়, এর প্রতিকার চাওয়া মানে গুজব রটানো নয়। এটি একটি সার্বজনীন আন্দোলন। সকলের অংশগ্রহণমুলক সুশৃঙ্খলিত আন্দোলন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে অনেক কিছু শেখার আন্দোলন।
নিরাপদ সড়কের এ আন্দোলন শুরু হয়েছিল রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দুইজন কলেজ শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সড়কে এমন মৃত্যুর ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে। কিন্তু তা নিয়ে আগে কখনও দেশে এমন বড়সড়ো আন্দোলন হয় নাই। এ আন্দোলন হওয়ার যুক্তিসংগত অনেক কারণ আছে। সাম্প্রতিক সময়ের একটি পরিসংখ্যানের দিকে নজর দিলেই আমরা বুঝতে পারব যে সড়কে মৃত্যুর ভয়াবহতা কত গভীর ও আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা কত ন্যায্য। তথ্য মতে, ২০১৮ সালের প্রথম ছয় মাসেই সড়কে প্রাণ গেছে ২৪৭১ জনের। এ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে আর বাকি ৩৭ শতাংশ ঘটছে চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে। বেসরকারী সংস্থা ব্র্যাকের তথ্যমতে, ৬৮ শতাংশ দুর্ঘটনার পেছনেই দায়ী বাস ও ট্রাকের চালকেরা। এটি হচ্ছে বাংলাদেশের বর্তমান দৃশ্যমান চিত্র যার পেছনে রয়েছে আরো নানাবিধ কারণ। যার মধ্যে অন্যতম চালকদের অসম প্রতিযোগীতা ও কামখেয়ালীপনা করে গাড়ি চালানো, ফিটনেসবিহীন গাড়ির আধিক্য, শিশু, অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষত চালক, পর্যাপ্ত ও শৃঙ্খলিত রাস্তার তীব্র অভাব, ট্রাফিক সিগন্যাল না মানার প্রবণতা এবং পরিবহন আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব ও সীমাবদ্ধতাসহ ইত্যাদি নানা কারণ।
‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন নিয়ে ইতোমধ্যে অনেক লেখালেখি করা হয়েছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি হতে ভাবলাম, শুধু নিরাপদ সড়ক দিয়ে আমরা কি করব? আমাদেরকে সার্বিক নিরাপত্তা দিতে হবে। দেশের জনগণকে অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান, শিক্ষাসহ সব কিছুতেই নিরাপত্তা দিতে হবে। আমাদের দেশের উচ্চপদস্থতারা বলছেন, বাংলাদেশ এখন ক্ষুধা ও দারিদ্যমুক্ত। কিন্তু আমরা দেখছি, এখনও দেশে ভিক্ষাবৃত্তি রয়েছে। ফুটপাতে হাজার হাজার মানুষ না খেয়ে ঘুমায়। তাদেরও সন্তান জন্মগ্রহণ করছে। কিন্তু যথাযথ খাদ্যের নিরাপত্তা নেই বলে রাস্তায় ক্ষধার্ত অবস্থায় পড়ে মরছে। আজ ক্ষুধার যন্ত্রনায় ছটফট করে পথশিশুরা মরবে, আর আমরা বলব- দেশ নিরাপদ ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, তা কখনও হতে পারে না। আজও দেশে অনেকে বস্ত্রের অভাবে অনিরাপদ হয়ে এই সমাজে চলাফেরা করে। মানুষরুপি হায়েনা ও শকুনেরা তাদেরকে দিনে-দুপুরে ধর্ষণ করে। পাগলীয়ও গর্ববতী হয়ে সন্তান জন্ম দেয়। তাহলে দেশের দরিদ্র নারীরা কোথায় নিরাপদ থাকল? শুধু কি ছিন্নমুল নারীরাই অনিরাপত্তায় ভুগছে? আমাদের দেশের কর্মমুখী নারীরাও কর্মক্ষেত্রে অনিরাপত্তায় ভুগছে। গণপরিবহনে তারা লাঞ্চিত হচ্ছে। তাই নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সাথে গণপরিবহনসহ সর্বত্র নারীদের নিরাপত্তা লাভের বিষয়টিও সংযুক্ত করা সময়োপযোগী।
আমরা বলছি, বাংলাদেশ চিকিৎসা ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নতি সাধন করেছে। কিন্তু এ কথা একদমই ভুল। কারণ হিসাবে বলব, দেশে হাজার হাজার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হলেও আজও নিশ্চিত হয় নাই মানসম্মত চিকিৎসা সেবা ও প্রশিক্ষিত ডাক্তার প্রাপ্তি। তাই যদি হতো, তাহলে আমাদের দেশের আমলারা বিদেশে গিয়ে তাদের চিকিৎসা করাতেন না। দেশের অসংখ্য সরকারী চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান থাকতেও চিকিৎসার অভাবে হাসপাতালের বারান্দায় পরে প্রতিনিয়ত অসংখ্য রোগী মারা যায়। ধনীরা অঢেল টাকা আর ক্ষমতার বিনিময়ে ঠিকই সুচিকিৎসা পাচ্ছে; কিন্তু হাসপাতালে দালাল আর অসাধু চিকিৎসকের খপ্পরে পড়ে সাধারণ জনগণকে সরকারী ওষুধও টাকা দিয়ে কিনে সেবন করতে হচ্ছে। একজন রোগী যখন আসছে, তখন তাকে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসা সেবা না দিয়ে চলছে দরদাম। তাহলে আমাদের দেশের মানুষেরা কেমন করে নিরাপদ থাকল?
আমাদের দেশে এখনও অনেক মানুষ বাসস্থানবিহীন। তাদের মাথা গোজার ঠাই নাই। রাস্তার পাশে খুপরি ঘরে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে এখনও অসংখ্য লোকজন বসবাস করে। এমন চিত্রের দৃশ্য রয়েছে আমার নিজ জেলা নাটোরে। কয়েকদিন আগে শুনেছিলাম, সরকার হতদরিদ্রদের জন্য বসতি তৈরি করে দিবেন। কিন্তু তার সফলতা আজও চোখে পড়েনি। সেই সব হতদরিদ্ররা প্রাকৃতিক দূর্যোগ- ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা ও বর্জ্রপাত মাথায় নিয়েই জীবনযাপন করছে। কিন্তু তাদের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়? নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে চরাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তাদেরকে চেয়ে দেখার মত কোনো মানুষই নাই। প্রতিনিয়ত বর্জ্রপাতে মানুষ মারা যাচ্ছে। বন্যায় ভেসে যাচ্ছে দরিদ্রদের ছোট্ট কুড়েঘর। কিন্তু তাদের ভাগ্য উন্নয়নে কেউ কি এগিয়ে আসছে? আসছে না। নির্বাচনের সময় তাদের দেওয়া ভোটে প্রার্থীরা ঠিকই বিজয়ী হচ্ছে; কিন্তু তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে একটুকুও কেউ ভাবছে না। জনপ্রতিনিধিরা জনগণকে রেখে শহরে আরাম-আয়েশে জীবন-যাপন করছে আর টেলিভিশন মিডিয়ায় টক-শো করছে- আমার এলাকায় আমি এত এত উন্নয়ন করেছি। এসব বড় গলার মানুষদের কণ্ঠনালী ছিড়তে আমিও টক-শোতে যেতে চাই। কিন্তু আমি সত্য বললে নিরাপত্তা পাবো কি?
আমাদের দেশের শিক্ষার হার আসলেই বেড়েছে। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে, জিপিএ ৫ এর সংখ্যাও বেড়েছে। শিক্ষার্থীরা আজকাল যথেষ্ট মেধাসম্পূর্ণ ও ক্রমেই তাদের মেধা বিকাশ হচ্ছে, বাড়ছে নানামুখি প্রতিভা। কিন্তু বাড়ে নাই শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগ্রহণ করতে যাওয়ার পথের নিরাপত্তা। আজকাল স্কুল-কলেজগামী অনেক শিক্ষার্থীই সন্ত্রাসী হামলার শিকার হচ্ছে, ছাত্রীরা বখাটেদের খপ্পরে পড়ে অতিষ্ট হচ্ছে, প্রতিবাদ করলে ধর্ষণ ও খুনের শিকার হচ্ছে। নিরুপায় হয়ে অনেকে আত্মহত্যা করছে। মা-বাবা সন্তানদের সঙ্গে গিয়েও সঠিক নিরাপত্তা পাচ্ছে না। বখাটেরা মোটরসাইকেলের চাপায় শিক্ষার্থীদের তাজা প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। বিপরীতে প্রশাসন চেয়ে চেয়ে দেখছে। দেশে এমন অনিরাপত্তাহীনতা সত্যই আশঙ্কাজনক। দেশে যখন নারী শিক্ষার হার বাড়ছে, তখন তাদের সঠিক নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকার ও প্রশাসনের। কিন্তু সর্বত্র তার বিপরীতটাই হচ্ছে বললে ভুল হবে না। আমাদের দেশে আরও নানাবিধও বিষয়ে মানুষজন অনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তাই বলছি, নিরাপদ সড়ক তো আমরা সবাই চাই। পাশাপাশি নিরাপদ দেশ আগে নিশ্চিত করুন।
আমরা ধরে নিচ্ছি, চলমান ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের ইস্যুটির একটি সুন্দর সুরাহা হবে। আইনের সংশোধন, সংযোজন ও পরিমার্জন হবে। তবুও আরো নানা ইস্যু থেকেই যায়। একটু পেছনে ফিরলেই দৃশ্যমান হয় কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিষয়টি; যার সঠিক সমাধান এখনো পর্যন্ত হয় নাই বলে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা এখনও সংশয়ে আছে। তারা অনিরাপত্তায় ভুগছে এই ভেবে যে কখন যেন আমাদেরকে পুলিশ, র্যাব ও ডিবি এসে ধরে নিয়ে যায়। আমাদের দেশের সাংবাদিকেরাও আজ নিরাপদ নয়। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের ইস্যুতে অনেক সাংবাদিকই দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়েছেন। আর দেশের বহুল আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির নিরাপত্তাহীনতায় হত্যাকান্ডের বিচার এখনো হয় নাই। এসব বিচার কার্যকর না হলে দুর্বৃত্তরা যেমন বারবার সাংবাদিকদেরকে হামলা করবে, তেমনি সাংবাদিকেরা অনিরাপত্তায় মহান পেশাকে ত্যাগ করতে বাধ্য হবে। আমাদের দেশে অবস্থানরত বিদেশী নাগরিক, হাই-কমিশনার, রাষ্ট্রদ্রুত ও ব্যবসায়ীরাও কেউই নিরাপদ নয়। তারা বিদেশী হয়েও বাংলাদেশী দুবৃর্ত্ত, ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হচ্ছেন। সড়ক দূর্ঘটনারও শিকার হচ্ছেন। বিদেশীদের নিরাপত্তা দিতে না পারাটা আমাদের দেশের জন্য কতটা লজ্জ্বাকর তা ভাবতেই অবাক লাগে। এছাড়া প্রতিদিন পত্রিকা খুললেই দেখি খুন, ধর্ষণ, বিভিন্ন বিভাগের ঘুষ বাণিজ্য, দখলবাজি এমন কি ব্যাংক থেকে অর্থ লোপাটের খবর। আর এর বাইরে রাজনৈতিক সহিংসতার তো শেষই নেই। মানুষ আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে আজ অনিরাপদ।
সুতরাং, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি হতে এটা উপলব্ধি করা যায়, শুধুমাত্র সড়কের নিরাপত্তা প্রয়োজন নয়, প্রতিটি মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ আজকের মৌলিক দাবি। আর এসব প্রয়োজনয়ীতা নিশ্চিত না করা গেলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল হতে হতে এক সময় হঠাৎ করেই সার্বিক ব্যবস্থাপনাই ভেঙে পড়বে। তখন কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠি কিংবা রাজনৈতিক দল এর দায়ভার কাঁধে তুলে নেবে না। আর্থিকভাবে সচ্ছলরা লেজগুটিয়ে দেশ ত্যাগ করবে, স্বার্থবাদীরা দেশকে নিলামে তুলবে। একাত্তরে অর্জিত স্বাধীনতাকে বিক্রয় করে দিতে কুন্ঠাবোধ করবে না। আশার বাণী হচ্ছে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশে শিক্ষার্থীদের সাথে দলমত নির্বিশেষে সবাই যে রকম একমত হয়েছিল, ঠিক দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে অন্যান্য সমস্যা ও ইস্যুগুলোতেও যে সবাই একমত হয়ে আন্দোলনে নামবে না তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর সেদিনই ভিত্তি রচিত হবে একটি নিরাপদ দেশের, একটি নিরাপদ বাংলাদেশের। তাই এখনই সকলের স্লোগান হোক- নিরাপদ দেশ চাই।
লেখক: কবি ও কলামিস্ট, ঢাকা।


























