ইতিহাস গড়লেন ড. খলিল: সাইপ্রাসকে হারিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি বাংলাদেশ
০৩ জুন ২০২৬, ০৯:২৫ এএম
৪০ বছর পর আবারও বিশ্বমঞ্চে অনন্য এক ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসকে পরাজিত করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচনে জয়লাভ করেছে বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সাধারণ পরিষদ হলে স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় এই ঐতিহাসিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রার্থী ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাইপ্রাসের প্রার্থী, সেদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পার্মানেন্ট সেক্রেটারি আন্দ্রেয়াস এস. কাকোরিসকে ৮ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।
জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে ১৯০টি দেশ এই নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে। এর মধ্যে- বাংলাদেশের পক্ষে ভোট: ৯৯টি দেশ
এবং সাইপ্রাসের পক্ষে ৯১টি দেশ ভোট প্রদান করে।
আগামী সেপ্টেম্বর মাসে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন ড. খলিলুর রহমান। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ৪১তম অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের দীর্ঘ চার দশক পর, এটি বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় এবং অত্যন্ত গৌরবময় অর্জন।
এই ঐতিহাসিক জয়ের মাধ্যমে জাতিসংঘের ১৯৩-সদস্যের এই সংস্থায় অন্যতম প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এটি বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা, বিশ্ব শান্তি, টেকসই উন্নয়ন এবং জলবায়ু কার্যক্রমের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাংলাদেশকে এক অভূতপূর্ব ও নেতৃত্বস্থানীয় সুযোগ করে দেবে।
বিজয়ী হওয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, "আমি একজন পূর্ণকালীন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করব এবং দল-মত নির্বিশেষে সবার জন্য সভাপতি হিসেবে কাজ করব।
এর আগে জাতিসংঘের অনানুষ্ঠানিক এক সংলাপে অংশ নিয়ে তিনি তাঁর দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছিলেন, তিনি জাতিসংঘের সনদকে অবিচলভাবে সমুন্নত রাখবেন এবং ছোট প্রতিনিধিদলগুলোর প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিয়ে সকল সদস্য রাষ্ট্রকে সম্পৃক্ত করবেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, "আমি প্রথম দিন থেকেই আপনাদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম, ইচ্ছুক এবং প্রস্তুত।
জাতিসংঘের আঞ্চলিক রোটেশন নীতি অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদটি এবার এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের জন্য নির্ধারিত ছিল। ভৌগোলিক অবস্থান ইউরোপে হলেও সাইপ্রাস জাতিসংঘের কূটনৈতিক গ্রুপিংয়ে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের সদস্য।
শুরুতে এই পদের জন্য ফিলিস্তিনও প্রার্থী হয়েছিল। তবে মুসলিম দেশগুলোর ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা এড়াতে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক বিবেচনা করে ফিলিস্তিন পরবর্তীতে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায়, যা বাংলাদেশের বিজয়কে আরও ত্বরান্বিত করে।
নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দেশের আনুষ্ঠানিক সমর্থন লাভ করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্রগুলো হলো: ১) সৌদি আরব, ২) তুরস্ক, ৩) পাকিস্তান, ৪) ব্রাজিল, ৫) আলজেরিয়া, ৬) গাম্বিয়া এবং ৭) লিবিয়া।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভোটের শেষ মুহূর্তে কূটনৈতিক তৎপরতা সর্বোচ্চ স্তরে জোরদার করে বাংলাদেশ। নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভোটের হিসাব-নিকাশে বিভিন্ন কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনা প্রভাব ফেলেছে। সাইপ্রাস যেখানে প্রায় বছরজুড়ে প্রচারণা চালিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ সময় পেয়েছিল মাত্র তিন মাস বা তারও কম।
সীমিত সময়ের এই বিশাল চ্যালেঞ্জকে পেছনে ফেলে, শেষ মুহূর্তের নিখুঁত ও গতিশীল কূটনৈতিক তৎপরতার কারণেই শেষ পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চের এই শীর্ষ পদে বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হলো বাংলাদেশ।





























