পশ্চিমবঙ্গে গরু জবাইয়ের কড়া নির্দেশিকা

সংকট ও অনিশ্চয়তায় মাংস ব্যবসায়ী থেকে প্রান্তিক অর্থনীতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০০ এএম


সংকট ও অনিশ্চয়তায় মাংস ব্যবসায়ী থেকে প্রান্তিক অর্থনীতি

 

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য সরকারের জারি করা গবাদিপশু জবাইসংক্রান্ত কড়া শর্তাবলি ও বিধিনিষেধের প্রভাবে চরম সংকট দেখা দিয়েছে। গত মে মাসের শুরুতে জারিকৃত সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়, ১৪ বছরের বেশি বয়সী এবং কায়িক পরিশ্রম ও প্রজননে সম্পূর্ণ অক্ষম গবাদিপশু ছাড়া অন্য পশু জবাই করা যাবে না। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য পরীক্ষার সনদ বাধ্যতামূলক করায় কলকাতার ট্যাংরাসহ রাজ্যের প্রধান কসাইখানাগুলো প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফলে মাংসের বাজার, রেস্তোরাঁ ব্যবসা, চামড়াশিল্প এবং প্রান্তিক গবাদিপশু খামারিদের জীবনযাত্রায় এক নজিরবিহীন আর্থিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিধিনিষেধের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন হাওড়া, কলকাতা ও আশপাশের অঞ্চলের ক্ষুদ্র মাংস ব্যবসায়ীরা। পশুর বয়স ও স্বাস্থ্য ছাড়পত্রের জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে বাজারে দৈনন্দিন জোগান আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। টিকিয়াপাড়ার মতো প্রধান কসাইখানাগুলো বন্ধ থাকায় অনেক ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে অবৈধ কিংবা ঘোরানো পথে চড়া দামে মাংস সংগ্রহ করছেন। এর ফলে সাধারণ বাজারে গরুর মাংসের দাম কেজিতে ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৩৫০-৩৬০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। অতিরিক্ত পরিবহন খরচ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক স্তরে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের চাপে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে নিত্যদিনের এই প্রোটিন।

এই সংকটের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁ ও আতিথেয়তা খাতেও। জোগান কম থাকায় নিজামস, জমজম, অলিপাব কিংবা মোকাম্বোর মতো জনপ্রিয় রেস্তোরাঁগুলো তাদের অনেক ঐতিহ্যবাহী বিফ আইটেম তালিকা থেকে বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে আলীপুর চিড়িয়াখানার মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানেও মাংসাশী প্রাণীদের খোরাক জোগাতে মহিষের মাংসের বদলে চার গুণ বেশি দামে খাসির মাংস কিনতে গিয়ে বাজেট আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছে। মাংস সরবরাহের এই ঘাটতি কেবল ব্যবসায়ীদের ওপর নয়, বরং গবাদিপশু কেনাবেচার ওপর নির্ভরশীল গ্রামীণ কৃষক, পশু পালনকারী এবং চামড়াশিল্পের সঙ্গে জড়িত ক্ষুদ্র কারবারিদের রুজি-রোজগারেও বড় আঘাত হেনেছে।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অচলাবস্থার কোনো সমাধান না পাওয়ায় বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এখন পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। হাওড়ার কাজিপাড়ার বংশানুক্রমিক মাংস ব্যবসায়ী ফিরোজ আলমের মতো অনেকের কাছেই এখন টিকে থাকার লড়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক কড়াকড়ির কারণে রাজপথের ছোট দোকান থেকে শুরু করে গ্রামীণ অর্থনীতি—সবখানেই এখন কেবল অনিশ্চয়তার দীর্ঘশ্বাস।

Ads