মুরগী কথন
১৯ নভেম্বর ২০২৪, ০৪:৩৬ পিএম
কুক কুরুক কু, কুক কুরুক কু --- আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে---- আইজকা আমাগো বড়ই খুশির দিন-- খোপের বাহির হইছি মোরা লাগতাছে স্বাধীন। আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে -- কুক কুরুক কু --
কি গো সোনালী আফা কেমন আছেন? খুব ভাল আছি। কুক কুরুক কু--- এতদিনে মনে হয় জাতে উঠলাম লেয়ার আপা।
ঠিক কইছেন আপা। এতদিনে আমাগো কপাল খুলছে? নিজেগো দেশের প্রথম শ্রেনীর সিটিজেন মনে হইতাছে? তেল চিনি কাঁচা মরিচ পিয়াজ হগগোলে সেঞ্চুরি করতাছে।হেগো লইয়া কত্ত আলাপ সালাপ! সেইসব দেইখ্যা গা জ্বালা করে। আমাগো ডিমের দাম কম আছিল বইল্যা কেউ আমাগো সন্মান দিত না। সে কথা বলবেন না আপা আমাগো লইয়া কত টিটকারী দিত হালায় পাবলিক। কেউ কেউ তো সুদ্ধ কইরা ডিম পর্যন্ত ডাকত না। কেউ কইত আন্ডা! কেউ কইত বৈদা আরো কত্ত কি? শুধু ডিম দিয়ে কোন অতিথিকে খাওয়ালে কত সমালোচনা! নির্ঘাত গরিব মানুষ! না হলে শুধু ডিম দিয়ে কি জামাই কে ভাত দেয় কেউ। কুক কুরক কু,কুক কুরুক কু---
যা বলেছেন সোনালী আপা। পাড়ার বাচ্চা পোলাপান পর্যন্ত আমাগো লইয়া মশকরা করতো। আন্ডা ভুলকা ভাত খাইত।অহন বোঝ ঠেলা! কুক কুরুক কু--- চারিদিকে আমাগো জয় জয়কার চলতাছে। পেপারে লেখতাছে,টেলিভিশনে বড় বড় জ্ঞানী গুনী নেতারা আমাগো ডিম লইয়া টক শো করতাছে। আহা! দেইখাই শান্তি। শুধু কি টক শো আপা ? দ্যাশের মন্ত্রী মিনিষ্টার পর্যন্ত আমাগো লইয়া কতা কইতাছে বিবৃতি দিতাছে। সাংবাদিক সন্মেলন করতাছে। কি আনন্দ, আনন্দে চোখে জল চলে আসছে আপা।কুক কুরুক কু-।
কি যে দুঃখের দিন ছিল গো আফা মনে হইলে বুকটা ফাইট্রা যায়। ডাক্তার সাহেব রা তো রোগী দেখলেই কইত প্রত্যেকদিন একটি করে ডিম খাবেন। আরে বেডা ডিম কি এতোই সস্তা যে প্রত্যেক দিন একটা কইরা খাইব? বোঝ এখন! খাও দেখি? কুকু কুরুক কু----
শুধু কি তাই আপা? কোন কারনে ছোট ডিম পাড়লে সেইটা নিয়ে কত কথা! ডিম এতো ছোট কেন? আরে বেকুব পাবলিক ঐ টুকু ডিম পাড়তে আমাদের প্রশ্চাতদেশ ফাইট্রা যায় যায় অবস্থা।সেইটা ভাবছস কখনো? কুক কুরুক কু--। সেই সব দুঃখের কথা মনে করাবেন না আপা। আমাগো কষ্টে পাড়া ডিম লইয়া যে পাবলিক কত্ত কি করছে। অনুষ্ঠান পছন্দ না হইলে, গান ভাল না লাগলে, কাউকে অপমান করতে হলে পচা ডিম ছুড়ে মারতো।
কুক কুরুক কু-- কুক কুরুক কু-- মনে নাই আবার? আরে পাবলিক তোরা ও তো পচা।সারাদিন সব পচা পচা কাম তোরা করস। চুরি করস,ঘুষ খাস,দুর্নীতি করস,অন্যকে ঠকাস,ব্যাংক লুট করস, বিদেশে টাকা পাচার করস, শেয়ার বাজার গিলে খাস, ধর্ষন করস দুনিয়াতে এমন কোন পচা কাজ নাই যা তোরা মানুষ করস না। তাই বলে কি আমরা তোগো ছুইড়া মারি? তাইলে তোরা কেন আমাগো ছুইড়া মারস? কুক কুরুক কু কুক কুরুক কু ---
দুঃখের কথা কি বলব আপা এ দেশের হগগোল মানুষ আমাগো ডিমের পুষ্টিগুন লইয়া কত কথা কয়। ধনী গরিব শিক্ষিত অশিক্ষিত বেবাক মানুষে জানে ডিম মানুষের শরীরের জন্য কতটা প্রয়োজন। তবু এই উল্লুক পাবলিক "অশ্বডিম্ব বা ঘোড়ার ডিম" নামে বাগধারা চালু করেছে।কেউ কোন কাজ করতে না পারলে,ব্যর্থ হলে, ফলাফল শুন্য হলে মানুষ উপহাস করে অশ্বডিম বলে রসিকতা করে। ভাবুন তো আপা কেমন লাগে? আর যেহেতু ঘোড়া কখনো ডিম পাড়ে না তাই অলিক বস্তু হিসাবে মনে করা হয়। আরে মানুষ(গাধা) ডিম কি আর অলিক বস্তু? ডিম দেখা যায়। কাঁচা খাওয়া যায়, ভেজে খাওয়া যায়, সেদ্ধ খাওয়া যায়, পোচ বা অমলেট করে খাওয়া যায়। এছাড়াও নানা প্রক্রিয়ায় খাদ্য ও শারীরিক সৌন্দয্য বৃদ্ধির কাজে ডিমের ব্যবহার হয়।সেই খবর রাখস বেটা?
কুক কুরুক কু--কুক কুরুক কু-- তয় এখন আমাগো দিন ফিরছে গো আপা।অহন বিশ্ব ডিম দিবস পালন হইতাছে।আমাগো ডিম খাইয়া কোট টাই পইড়া বড় বড় বেডারা সভা সেমিনার করতাছে, গোল্লা গোল্লা বাতচিৎ করতাছে। হুনতাছি আমাগো দ্যাশের সরকার নাকি দাদাগো দ্যাশ থাইকা চার কোটি ডিম আমদানীর ব্যবস্থা করতাছে। এই খবরে দিলে যে কি শান্তি লাগতাছে। ভাবা যায়! আমাগো ডিম এখন আমদানী পন্য? বুকটা গর্বে প্যারাসুটের মতো ফুলে উঠছে আপা। কুকু কুরুক কু--কুক কুরুক কু--
সেদিন হয়েছে কি জানেন আপা! আমার মনিবের বাড়িতে এক বন্ধু বেড়াতে এসেছেন।তাকে বারান্দায় পাটি বিছিয়ে খেতে দেওয়া হয়েছে।আমি ও আঙ্গিনাতে খুঁটে খুঁটে পোকা মাকড় খাচ্ছি আর গেৃহস্থ পরিবারের গল্প শুনছি। যদিও অন্যের কথা কান পেতে শোনা মোটেই উচিত নয়। কিন্তু তাদের উচ্চস্বরের আলাপ আমার কানে এসে পড়ছিল। সুতরাং কি আর করা! খাওয়া শেষে অতিথি বন্ধু গামছায় হাত মুখ মুছতে মুছতে বলল-- "আহ্! কি খেলাম দাদা অর্ধেক ডিমের পুরোটাই"। এ কথা শুনে আমার ভিষন হাসি পেল।পাছে তারা দেখে ফেলে তাই হাসি চেপে মুখ আড়াল করে কুক কুরুক কুক, কুক কুরুক কু করতে করতে বাড়ির বাহিরে চলে এলাম।
সন্ধ্যা হয়ে এলো সোনালী আপা। খোপের মধ্যে গিয়ে ঢুকতে হবে। তাছাড়া চারিদিকে মানুষ আছে,শিয়াল আছে, গাওড়া আছে। নিরাপত্তার ঝুঁকি আছে। কোনদিন জানি মালিক জবাই কইরা দিব সেই টেনশনে আছি। তয় মরনের আগে ছোট একটা শেষ ইচ্ছা ছিল আফা! কুক কুরুক কু।সেইটা কি লেয়ার আপা? বেশী কিছু না।আমাগো ডিমের হালি যদি ১০০ টাকা হইতো! এই আর কি। কুক কুরুক কু--কু কুরুক কু-- অবশ্যই হইব। সেই দিন আর বেশী দুরে নাই আপা।দৈনিক আমাগো খাদ্যের দাম বাড়তাছে। দেশের ছোট ও মাঝারী খামারীদের অবস্থা খারাপ। তয় আমাগো একটু বুদ্ধি কইরা চলতে হইবো। ডিম পাড়া কমাইতে হইব। প্রতিদিন ডিম পাড়া যাইবো না? কম ডিম পাড়লে বাজারে ডিমের ক্রাইসিস থাকবো তাছাড়া অতি মুনাফালোভী সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা তো আছেই সুতরাং চিন্তা কি? হু হু কইরা দাম বাড়বো। তখন আপনার মনের আশা পুরুন হইবো আপা। কুক কুরুক কু --তাই যেন হয় আফা। কুক কুরক কু---
এই তুলির আব্বু তোমার কি হয়েছে? কুক কুরুক কু---কুক কুরুক কু করছ কেন? ঘুম থেকে উঠে পড় সকাল সাতটা বাজে। রুটি ডিমভাজি ও সবজি করেছি। ফ্রেস হয়ে নাস্তা করে তাড়াতাড়ি অফিসে যাও। নাস্তার টেবিলে ভাজা ডিমের দিকে তাকিয়ে মারুফের গত রাতে স্বপ্নে দেখা সোনালী ও লেয়ার মুরগীর কথপোকথন মনে পড়ল। আপন মনে হেসে উঠল সে। তার সেই রহস্যময় হাসির কারণ জানল না কেউ।



























