সেই রাত
২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৫ এএম
তখন আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। সাল ২০০৫। ক্লাস বন্ধ। সারাদিন বই নিয়ে বসে থাকি, কিন্তু রাত হলেই মন অন্যদিকে টানে। পড়া মাথায় ঢোকে না। তখন আমার এক অদ্ভুত অভ্যাস ছিল- পরীক্ষার পড়ার ফাঁকে গল্প, উপন্যাস, কবিতা না পড়লে পড়াশোনাটাই যেন হজম হতো না। যেন নিজের কাছে নিজেই প্রমাণ দিচ্ছি- আমি পড়ছি, খুব পড়ছি।
সেদিনও তেমনই একদিন। সকাল থেকে টানা পড়া, বিকেলে একটু ঘুম, তারপর আবার সন্ধ্যায় বই খুলে বসা। ঘণ্টাখানেক পর গেলাম পত্রিকা রুমে। সেখান থেকে টিভি রুম। ঐ সময়কার জনপ্রিয় হিন্দি গান "কেদোনা কেদোনা", "আমার সোনিয়া"-চলছে, আর পর্দায় কারিনা কাপুর আর ঋত্বিক রোশনের প্রাণবন্ত নাচ। ওটা ছিল আমার প্রতিদিনের ছোট্ট রিচার্জ। ওই অংশটা না দেখলে যেন দিনটাই অসম্পূর্ণ থেকে যেত। ডাইনিং খোলার সাথে সাথেই খেতে বসা আমার আরেকটা অভ্যাস ছিল। বিকেলে নাস্তা করি না, তাই রাতের খাবারটাই একটু তাড়াতাড়ি সেরে ফেলি। রুমমেটদের খোঁচা শুনতে শুনতে অভ্যাসটা পাকাপাকি হয়ে গিয়েছিল। খাওয়া শেষে একটু ঘোরাঘুরি করে বের হলাম। শীতের রাত। রাজশাহীর শীত মানে কাঁপিয়ে দেওয়া ঠান্ডা, কুয়াশায় ঢেকে থাকা চারপাশ। ল্যাম্পপোস্টের আলো কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে গেছে, দৃষ্টি সীমিত। তবুও হাঁটার একটা টান ছিল।
আমি থাকতাম শহীদ হবিবুর রহমান হলে। হলের গেট থেকে ডানদিকে যে রাস্তা যায়, সেটা মেয়েদের হল, বিজ্ঞান ভবন, তুত বাগান আর চারুকলা বিভাগের দিকে। সেদিন কেন জানি ওই পথেই হাঁটতে ইচ্ছে হলো। হাঁটতে হাঁটতে খুব বেশি দূর যাইনি। হলের পাশের ছোট লেকটার মাঝামাঝি এসে হঠাৎ চোখে পড়ল-একজন লোক। এই কনকনে শীতে খালি গায়ে, হাতে জাল। সে পানিতে নামছে মাছ ধরার জন্য। দৃশ্যটা অদ্ভুত লাগল। কৌতূহল আমাকে টেনে নিয়ে গেল একটু কাছে। শব্দ না করে প্রায় দশ-বারো ফুট দূরে দাঁড়িয়ে রইলাম। লোকটা জাল গুছিয়ে ধীরে ধীরে পানিতে নামছে। আমি নিঃশব্দে তাকিয়ে আছি।
সে নামছে… আমি দেখছি।
পানি প্রথমে হাঁটু, তারপর কোমর ছুঁলো। এখন তো জাল ফেলার কথা। কিন্তু না, সে নামতেই থাকল।
সে নামছে… আমি দেখছি।
এবার বুক পর্যন্ত ডুবে গেল। তবুও জাল ফেলল না। আমার ভিতরে অস্বস্তি জমতে শুরু করল।
সে নামছে… আমি দেখছি।
একসময় সে পুরোপুরি পানির নিচে চলে গেল।
আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁঁড়িয়ে রইলাম। ভাবলাম, এখনই উঠবে। কয়েক সেকেন্ড… তারপর আরও কিছুক্ষণ। কিন্তু কেউ উঠল না।
ঠিক সেই মুহূর্তে—একটা অদ্ভুত শব্দ।
কোনো পাখির ডাক যেন। কিন্তু স্বাভাবিক না। তার মধ্যে কান্না, হাসি আর ভয়-তিনটারই এক অদ্ভুত মিশ্রণ। শব্দটা যেন হঠাৎ করেই চারপাশের নীরবতা ছিঁড়ে আমার ভেতরে ঢুকে গেল। আমার শরীর জমে গেল। তারপর হঠাৎই যেন সব স্নায়ু একসঙ্গে কাজ শুরু করল-আমি দৌড় দিলাম। পেছনে তাকাইনি। দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় টের পেলাম- পায়ের জুতা ছিঁড়ে খুলে কোথাও পড়ে গেছে। কিন্তু থামার সাহস হয়নি। সেই অদ্ভুত শব্দটা যেন আমার পিছু নিয়েছে। হলের গেট পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত মনে হচ্ছিল, কেউ বা কিছু আমাকে তাড়া করছে। গেট পেরিয়ে যখন থামলাম, তখনও বুক ধড়ফড় করছে। ঠান্ডা শরীর ঘামে ভিজে গেছে।
সেদিনের পর বহুবার সেই পথ দিয়ে হেঁটেছি- দিনের বেলায়। দূর থেকে রাতের আলোয় লেকটাও দেখেছি অসংখ্যবার। কিন্তু সেই লোকটাকে আর কখনও দেখিনি।
আর সেই ডাক…
আজও মাঝে মাঝে কানে ভেসে ওঠে।
লেখকের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:
চিংলামং চৌধুরী একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, বাচিকশিল্পী ও গবেষক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাক্তনী বর্তমানে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদে জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। তাঁর লেখনীর মূল উপজীব্য মারমা লোকসাহিত্য, প্রকৃতি, কবিতা ও ছড়া।
চিংলামং চৌধুরীর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে কাব্যগ্রন্থ 'সময়সেতু পথে' (২০১৮), 'মারমা কাব্যকথা' (২০২৫) এবং 'মারমা লোকছড়া' (২০২৫)। সৃজনশীল লেখালেখির পাশাপাশি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সেমিনারে তিনি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তাঁর পদচারণা অত্যন্ত উজ্জ্বল। সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবৃত্তি সংগঠন 'স্বনন'-এর সাথে। বর্তমানে তিনি স্থানীয় সৃজনশীল আবৃত্তি সংগঠন "আরণ্যক বাচিকশিল্প চর্চা কেন্দ্র"-এর নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। লোকসাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য ভূষিত হয়েছেন 'খাগড়াছড়ি জেলা সাহিত্য সম্মাননা ২০২৫'-এ। পার্বত্য চট্টগ্রামের আধুনিক সাহিত্য-সংস্কৃতি বিকাশে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
ইমেইল- chingla.khdc@gmail.com
























