যশোর-১: বিএনপিতে মনোনয়ন যুদ্ধ, মাঠে একক জামায়াত—

নির্বাচনী সমীকরণ কোন পথে?

হুমায়ন কবির মিরাজ

২২ মার্চ ২০২৫, ০৯:২৯ পিএম


নির্বাচনী সমীকরণ কোন পথে?

বাম থেকে ৪ জন বিএনবির মনোনয়ন প্রত্যাশী, ডানে জামাতের একক প্রার্থী।

 

শোর ৮৫-১ (শার্শা) আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক উত্তাপ তীব্র হয়ে উঠেছে। যদিও নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করেনি, তবুও বিএনপি ও জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে নেমে সক্রিয় প্রচারণা চালাচ্ছেন।

বিএনপির অভ্যন্তরীণ মনোনয়ন যুদ্ধে চার নেতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াত একক প্রার্থী নিয়ে সুসংগঠিতভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায়, নির্বাচনী সমীকরণ এখন বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

বিগত ১২টি সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ ৭ বার, বিএনপি ৩ বার, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ১ বার করে জয়ী হয়েছে।

আওয়ামী লীগ: ১৯৭৩, ১৯৯১, ১৯৯৬ সালে (তবিবর রহমান সরদার), ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ সালে (শেখ আফিল উদ্দিন)। বিএনপি: ১৯৭৯ সালে (আলী তারেক), ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি (মফিকুল হাসান তৃপ্তি), ২০০১ সালে (আলী কদর)। জামায়াত: ১৯৮৬ সালে (নূর হুসাইন)। স্বতন্ত্র: ১৯৮৮ সালে (কেএম নজরুল ইসলাম) নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট জুলাই অভ্যুত্থানের পর এ আসনে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেছে। আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা মাঠে নেই। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি, জামায়াত ও সমমনা দলগুলো নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে ব্যস্ত।

বর্তমানে যশোর-১ আসনে মোট ২ লাখ ৯৪ হাজার ৬৯২ জন ভোটার রয়েছে। তার মধ্যে পুরুষ ভোটার: ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭৬ জন, মহিলা ভোটার: ১ লাখ ৪৭ হাজার ১১৪ জন, হিজড়া ভোটার: ২ জন।

আগামী সংসদ নির্বাচনে যশোর-১ (শার্শা) আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে মাঠে রয়েছেন চার নেতা। সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তি আবারও ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিতে চান। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী ছিলেন।

তাঁর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন শার্শা উপজেলা বিএনপির প্রধান উপদেষ্টা খায়রুজ্জামান মধু, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হাসান জহির ও সাধারণ সম্পাদক নূরুজ্জামান লিটন। চারজনই দলের মনোনয়ন পেতে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন। তাঁরা জনগণের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন এবং সাংগঠনিক কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।

তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতে, আসন্ন নির্বাচনে দলটির প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল। বিশেষত, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপির মধ্যে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মফিকুল হাসান তৃপ্তি ও আবুল হাসান জহিরের সমর্থকদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক সংঘর্ষ হয়েছে, যা দলের ভিতরে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

এ বিষয়ে মফিকুল হাসান তৃপ্তি বলেন, "আন্দোলন-সংগ্রামে নেতাকর্মীদের পাশে ছিলাম, এখনও আছি। ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর এলাকায় আরও সক্রিয় হয়েছি। বিশৃঙ্খলা রোধে জিরো টলারেন্স নীতিতে থাকছি। পুজোর সময় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশে ছিলাম, চাঁদাবাজি-দখলবাজির প্রশ্রয় দিইনি। দলের ভেতরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও আদর্শিক বিভেদ নেই, বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে।"

হাসান জহির বলেন, "ছাত্রজীবন থেকেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ১৯৮০ সালে নাভারণ ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি, ১৯৮১ সালে থানা ছাত্রদলের সভাপতি ছিলাম। ১৯৯২ ও ১৯৯৭ সালে নাভারণ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হই। উপজেলা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছি— ১৯৯২ সালে গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক, ১৯৯৭ সালে সংগঠনিক সম্পাদক, ২০০৮ সালে সাধারণ সম্পাদক এবং সর্বশেষ ২ ফেব্রুয়ারি শার্শা উপজেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছি। সাড়ে ১৫ বছর আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে ছিলাম, নাশকতার ৪৪টি মামলার মুখেও নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছি, কখনো পিছু হটিনি। তৃণমূল চায়—যে নেতাকে তারা সবসময় পাশে পায়, দল তাকেই মনোনয়ন দিক।"

খায়রুজ্জামান মধু বলেন, আমি বিএনপি'র প্রতিষ্ঠানগ্ন জাগো দল থেকে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হই। অন্যদের মতো কখনো বিএনপি ছাড়া অন্য কোন দলের সাথে সম্পৃক্ত হয়নি। "আমার বিরুদ্ধে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নেই। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে ধানের শীষকে বিজয়ী করবে।"

এদিকে বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা খায়রুজ্জামান মধু বলেন, "আমি বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে জাগো দলের মাধ্যমে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হই। কখনো বিএনপি ছাড়া অন্য কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত হইনি। আমার বিরুদ্ধে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নেই। আমি সবসময় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের পাশে ছিলাম, এখনো আছি। আমার রাজনীতির মূল শক্তি তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তারা সবসময় আমার পাশে থেকেছে, আগামীতেও থাকবে।

মনোনয়ন প্রসঙ্গে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, "দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে সব নেতাকর্মী ঐক্যবদ্ধ হয়ে ধানের শীষকে বিজয়ী করবে।"

যশোরের সংসদীয় আসনে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা আজিজুর রহমান রাজনৈতিক কার্যক্রমে জোর দিয়েছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রায় ৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হওয়ার পর এবার তিনি আবারও নির্বাচনী মাঠে আছেন। তিনি বলেন, "আওয়ামী লীগ সরকারে সাড়ে ১৫ বছর সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে না পারলেও, আমাদের নিরব কার্যক্রম চলেছে। আগামী নির্বাচনে মানুষের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছি। জামায়াতে ইসলামীর প্রতি মানুষের সমর্থন বাড়ছে, তারা দুর্নীতিমুক্ত সমাজ চাইছে।"

Ads