টেকসই শিল্পায়ন ও নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্ব: একজন মোস্তাকুর রহমান এবং বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৫৯ পিএম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা এবং ১৯৯২ সালে ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (ICMAB) থেকে কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে পেশাদার যোগ্যতা অর্জন-এই মজবুত ভিত্তি দিয়েই শুরু হয়েছিল মোস্তাকুর রহমানের কর্মযাত্রা। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি করপোরেট অর্থব্যবস্থা, রপ্তানি অর্থনীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। দীর্ঘ এই অভিজ্ঞতা তাঁকে কেবল একজন সফল শিল্প উদ্যোক্তা হিসেবেই নয়, বরং একজন অভিজ্ঞ আর্থিক কাঠামো বিশ্লেষক হিসেবেও সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বিজিএমইএ (BGMEA)-এর ‘বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির’ চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি শিল্পখাত ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে নীতিগত সেতুবন্ধন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। শিল্প অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং তারল্য কাঠামোর মতো জটিল বিষয়গুলোতে তাঁর প্রজ্ঞা ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা আজ তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের আসনে বসিয়েছে।
পুঁজিবাজারের রূপান্তরকালেও তাঁর সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো। ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE)-এর বোর্ড সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নব্বইয়ের দশকের সেই সন্ধিক্ষণে পুঁজিবাজারের নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ তাঁর দৃষ্টিকে আরও বহুমাত্রিক করেছে।
তিনি Real Estate and Housing Association of Bangladesh (REHAB) এবং Dhaka Chamber of Commerce and Industry (DCCI)-এর মতো শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্য সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকায় শিল্প, আবাসন ও বাণিজ্য- এই তিন খাতের সমন্বয়ধর্মী আর্থিক বাস্তবতায় তাঁর পদচারণা অত্যন্ত সুতীক্ষ্ণ।
ব্যবসায়িক জীবনে একটি শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের সিইও (CEO) হিসেবে তিনি করপোরেট ফাইন্যান্স, ব্যাংকিং রিলেশন এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ব্যবস্থায় যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন, তার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দেশের ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং টেকসই অর্থায়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সঠিক সমন্বয় নিশ্চিত করাই এখন তাঁর মূল লক্ষ্য।
তবে এই আলোচনা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়; এটি একটি বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত—বাংলাদেশের শিল্পখাত কি পর্যাপ্ত আর্থিক শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে? মোস্তাকুর রহমানের পেশাগত জীবন সেই প্রশ্নের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তুলে ধরে। প্রযুক্তিগত দক্ষতা, নৈতিক দৃঢ়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা—এই তিনের সমন্বয় ছাড়া শিল্পায়নের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য সম্ভব নয়।
একই সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রেও তাঁর সম্পৃক্ততা লক্ষণীয়—প্যালিয়েটিভ কেয়ার, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা এবং চিকিৎসা সহায়তা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ তাঁর নেতৃত্বের মানবিক দিকটি প্রকাশ করে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, সেখানে নীতিনিষ্ঠ আর্থিক নেতৃত্বের বিকল্প নেই। শিল্পখাতকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক রাখতে হলে প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক শাসনের সংস্কৃতি। মোস্তাকুর রহমানের কর্মপথ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সংগঠিত আর্থিক কাঠামো ও জবাবদিহিতার চর্চাই পারে শিল্পোন্নয়নের ভিত্তিকে মজবুত করতে।
ব্যক্তি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিই শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে—আর সেই শক্তি গড়ে ওঠে দক্ষ, সৎ ও বিশ্লেষণসমৃদ্ধ নেতৃত্বের হাত ধরে।
লেখক পরিচিতি:
মো. সহিদুল ইসলাম সুমন, অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com


































