ধর্ম কর্মে নয়

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

১৭ মার্চ ২০১৯, ০৫:১৮ পিএম


ধর্ম কর্মে নয়

ধর্ম, কর্মে নয়। পৃথিবীতে সৃষ্টিকর্তা ধর্ম প্রবর্তন করেছে মানব সমাজের জন্য। মানবজাতি ইহ ও পরকালে কী ধরনের হিসেব নিকেশের সম্মুখীন হবে তাই মূলত: ধর্মগ্রন্থে লিপিবদ্ধ থাকে। পৃথিবীতে মানব সৃষ্টির সাথে ধর্ম ও তার গ্রন্থ সৃষ্টি হয়েছে। ধর্মকে প্রচার পাবলিসিটি, আনুগত্য, শৃংখলা, ঐক্য প্রতিষ্টার কথা ধর্মগ্রন্থে পাওয়া যায়। দুনিয়ার শুরু থেকে দেখা যায়, ধর্ম, শৃংখলা, ভ্রাতৃত্ববোধ, ন্যায়, অন্যায়, পার্থক্য, মত পার্থক্য বুঝবার মতো ধর্মীয় রাহ্বার অথবা ব্যাপকভাবে বলতে গেলে নবী, রাসূল, সাহাবা,  অর্থাৎ মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের গুণাবলী সম্পন্ন নেতা মানব সমাজে প্রেরণ করেছেন। তাদেরকে সৃষ্টিকর্তা বিশেষভাবে প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য জ্ঞানের ভান্ডার প্রদান করেছেন। মূলত: ওইসব মহান মহা জ্ঞানী গুণী সমৃদ্ধশালী ঐশী জ্ঞানে গুণী মনিষীগণই সৃষ্টিকর্তার প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) ইসলাম ধর্মে সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তার পরে আর কোনো নবী রাসূল ইসলাম ধর্মে নবীর দাবি নিয়ে আসবে না। আসার দরজা  বন্ধ করে দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। ইসলাম ধর্মের মূল নীতি আদর্শ, চরিত্র, ইহকালীন পরকালীন মানব জীবনের সমস্ত ধারা উপধারা সবকিছু পরিষ্কারভাবে সন্নিবেশিত হয়েছে আসমানী কিতাবের সর্বশেষ কিতাব পবিত্র কোরআন শরীফে। এ গ্রন্থে মানবজাতির ইহকালীন ও পরকালীন সমস্ত দিক নির্দেশনা বর্ণনা করা হয়েছে। ১৫‘শ বছর পুরোনো ধর্মগ্রন্থ এ কিতাবে মানবজাতির কল্যাণ অকল্যাণ মুক্তি, শাস্তির সমস্ত বিধান বলা আছে। লেখকের বক্তব্য ধর্মগ্রন্থের উদ্দেশ্য তুলে ধরানো। কথা হচ্ছে পৃথিবীতে আগত সব ধর্মগ্রন্থ মানবকল্যাণে নিবেদিত। ধর্মের প্রবক্তা যারা নিয়োজিত হন তাঁরা ধর্মগ্রন্থের অনুসরণে ধর্মের অনুসারীদের পরিচালনা করার বাধ্যবাধকতা আছে। আর যারা ধর্ম গ্রন্থের বাধ্যবাধকতার বাইরে পরিচালিত হবে তারা তখন আর সে ধর্মের প্রবক্তা থাকতে পারে না। ধর্মের শুরু থেকে পৃথিবীর আজকের তারিখ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, অনেক প্রবর্তক ধর্মের বিভিন্ন ধারা  উপধারা সংস্কার করছে। তবে সেখানে কথা থেকে যায় সমাজ ও মানবতার সময়োপযোগী কল্যাণের কথা বিবেচনা করে সংস্কার করার কিছু ক্ষমতা প্রবক্তাদের  ইখতেয়ারে থেকে যায়। এর অর্থ এ নয় যে, মূল ধর্মের বাণীকে বিকৃত করা। আজকের পৃথিবীর এ সময়ে ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে পৃথিবীতে প্রতিষ্টিত সবগুলো ধর্মগোষ্ঠী তাদের ধর্মের মধ্যে  নিয়োগ ও বিয়োগ করে ধর্মের আসল চেহারা পরিবর্তন করে সবগুলো প্রতিষ্টিত ধর্মের মধ্যে আসল এবং নকলের সয়লাভ ঘটাচ্ছে। আমার এ বয়সে কম করে হলেও এক হাজার একটি ধর্মীয় সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, আলোচনা ও মহাসমাবেশে পর্যবেক্ষণে যেটা দেখা যায় তা হলো সবগুলো ধর্ম তার আপন স্বকীয়তাকে বিকৃত করে নতুনত্বের ধর্মের প্রচার ঘটাচ্ছে। ফলে হচ্ছে কী? প্রকৃত ধর্মের শিক্ষা ও নৈতিকতা থেকে মানবসমাজ তার বিশ্বাসের ধর্ম থেকে চিটকে পড়ছে। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ইসলাম ধর্মের বাণী নীতি প্রচারের উদ্দেশ্যে যেসব সভা সমাবেশ হয় সেখানে একেকটি গ্রæপ অপর গ্রæপের সমালোচনা আর গিবতে ব্যাস্ত থাকে। ইসলামের নামে পরচর্চা শরিয়ত বৈধ দেয় নি। গঠনমূলকভাবে কোরআন, হাদিস, ফিকাহ শাস্ত্র দিয়ে আলোচনা করা যেতে নিষেধ নেই। কিন্তু এক পক্ষ অপর পক্ষকে কুরূচিপূর্ণ ভাষা দিয়ে আক্রমণাত্মক বক্তব্য রেখে যেসব সভা, সেমিনার ও সম্মেলন করা হয় তা কোনোভাবেই সভ্য সমাজ মেনে নিতে পারে না। আজকের সমাজে বিশেষ করে উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামের নামে পক্ষ বিপক্ষ বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন সতীর্থ সংগঠনের অনুসারীদের ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিয়ে থাকেন, তা কখনো ইসলাম ধর্মানুসারী জনগণের কল্যাণ ও সামাজিক শৃংখলা ও একতা রক্ষা করবে না। প্রকৃতপক্ষে দেখা যায়, এসব বক্তব্যের ফলে ধর্মীয় অনুসারীদের মাঝে মতবিরোধ ও বিভাজন তৈরী হচ্ছে। বলা বাহুল্য, ইসলামসহ অপরাপর সবগুলো ধর্মের উদ্দেশ্য হলো সাম্য, মৈত্রী, শৃংখলা ও একতা প্রতিষ্টা করা। সে জায়গায় এখন এতদঞ্চলে আমরা শান্তিকামী ধর্মীয় অনুসারীগণ পর্যবেক্ষণ করছেন সভা সমাবেশ থেকে যেখানে ধর্মীয়ভাবে ভাবগাম্ভির্যের বক্তব্য পাওয়ার আশা ছিল সেখানে সে ধরনের বক্তব্য আবেদন অনুপস্থিত। ফলে ধর্ম পালনকারী মানুষগুলো দিন দিন ওইসব বক্তব্যের কারণে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। কোরআনের ভাষায় যেখানে ধর্ম অনুসারীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগাদা দিয়েছে সেখানে কোরআনের আবেদনের বিপরীত মতপার্থক্য ও অনৈক্য তৈরী করছে ওইসব সভা সম্মেলন। তাহলে পর্যালোচনায় দেখা যায়,  এ অঞ্চলের ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কতিপয় দেশে ইসলামের নামে নিত্য নতুন সংগঠনের আবির্ভাব ঘটিয়ে আসলে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভ’তিকে পুঁজি করে মুসলিম সমাজকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে সেটাই ধর্মীয় বিজ্ঞজন ভেবে কূল    কিনারা পাচ্ছে না। বাস্তবে পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ইসলাম ধর্ম, কোরআন, হাদিস, ফিকাহশাস্ত্রকে পুঁজি করে কতিপয় গ্রæপ তাদের স্বার্থ সিদ্ধির অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই চোঁখে পড়ছে না। তাহলে কি জাতীয় আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারী সম্প্রদায় ইসলাম ধর্ম ও মুসলমানদের ঐক্য শান্তি শৃংখলা ধ্বংস করার জন্য এসব ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করছে বলে ধরে নিতে হয়। এসব অঞ্চলে প্রতিটি মুহূর্তে নুতন নুতনভাবে ইসলাম ধর্মের নামে নানা রং বেরংয়ের সংগঠনের আবির্ভাব হতে দেখছি। এসব কারণে মুসলমানদের ঐক্যে বড় ধরনের মতানৈক্য সৃষ্টি হচ্ছে। এ মতপার্থক্য পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্র এবং এ উপমহাদেশে যেখানেই মুসলমানদের বসবাস সেখানেই আজকে এ অনৈক্যের দাপট প্রশস্ত হচ্ছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী শক্তি মাথাছাড়া দিয়ে উঠছে। তারা শক্তির মহড়া বৃদ্ধি করে সারা পৃথিবীতে মুসলমানদের বিরোদ্ধে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে। মুসলমানদের বিভিন্ন গ্রæপ তৈরী করে তাদের মতপার্থক্যের সুযোগ সন্ধানে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে যোগান দিচ্ছে। একদিকে মুসলমানদের সন্ত্রাসী ও জঙ্গি বলে বিশ্বে প্রচার চালাচ্ছে, অন্যদিকে মুসলমানদের উপর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তরে সন্ত্রাসী হামলা করে মুসলিম জনপদকে রক্তে রঞ্জিত করছে। মুসলমানদের অতীত গৌরবজ্জ¦ল শাসন ইতিহাস ঐতিহ্যকে ইতিহাসের পাতা থেকে বিলুপ্ত করার গভীর ষড়যন্ত্রে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়ে যাচ্ছে। গত ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডে ক্রাইস্টচার্চে নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলায় দু’টি মসজিদে ৪৯ জন মুসল্লীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা  আন্তর্জাতিক ইহুদী ষড়যন্ত্রের সফল বাস্তবায়ন। এভাবে ফিলিস্তিন, বার্মা, চীন, কাশ্মিরসহ পৃথিবীর নানা অঞ্চলে আমরা ইহুদী ষড়যন্ত্র অবলোকন করছি। ধারাবাহিকভাবে ইঙ্গমার্কিন সা¤্রাজ্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী গোষ্ঠী ইসলাম ও মুসলমানদের বিরোদ্ধে প্রকাশ্যে সন্ত্রাসী সশস্ত্র যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এসব বিষয় মুসলিম বিশ্ব ও ইসলামী সংগঠনগুলোকে গভীরভাবে অনুধাবন করে সময় থাকতে মুসলিম মিল্লাতের ঐক্য, শৃংখলা রক্ষা করতে হবে। ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর মধ্যে ঐক্য, শৃংখলা প্রতিষ্টা করতে হবে। ছোট খাটো বিষয় বিসর্জন দিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঐক্য প্রতিষ্টা করা ছাড়া ইঙ্গমার্কিন সা¤্রাজ্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদীদের সন্ত্রাস থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব না। নিউজিল্যান্ডের নামাজরত শান্তিপ্রিয় মুসল্লীদের আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে শোক সন্তপ্ত পরিবার পরিজনের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন ছাড়া আর কিছুই বলতে পারছি না। বিশ্বের সকল ধর্মের মানুষের মধ্যে শান্তি, শৃংখলা, সম্প্রীতি প্রবাহিত হোক এ প্রত্যাশা এ অঞ্চলের মানুষের। বিশ্বের নেতৃত্ব যেনো সব ধর্ম গোত্রের মানুষের কল্যাণে প্রতিষ্টিত হয় সে প্রত্যাশায় আগামী দিনের সূর্য উদয় হোক।

লেখক : সংগঠক,গবেষক,কলামিষ্ট

 

Ads