শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে কন্যা শিশুরা
২২ নভেম্বর ২০১৮, ০৭:৩২ পিএম
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত শিক্ষা তথ্য প্রতিবেদনের এক তথ্যে উঠে এসেছে- শিক্ষা খাতে উপবৃত্তি, বিনামূল্যে পাঠ্যবই, শুকনো খাবার ও নাস্তা বিতরণের মতো কর্মসূচির সুবাদে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ এখন প্রায় শতভাগ। তবে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারায় এসব শিক্ষার্থীকে পরবর্তী পর্যায়ে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। প্রাথমিকে ভর্তি হওয়া শিশুদের ২০ শতাংশই পঞ্চম শ্রেণী শেষ করার আগেই ঝরে পড়ে। মাধ্যমিকে গিয়ে ঝরে পড়ার এ হার দাঁড়ায় ৪০ শতাংশেরও বেশি। আর উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন না করেই ঝরে পড়ছে প্রায় ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী। এ হিসাব অনুযায়ী দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি মাধ্যমিক পর্যায়ে।
দেশে শিক্ষায় মাধ্যমিক স্তর শেষ করার আগেই প্রায় অর্ধেক মেয়ের শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে যায়। এটা আগেও ছিলো আর বর্তমানেও আছে। নারী শিক্ষার অগ্রগতির ক্ষেত্রে এ প্রবণতাকে মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারি হিসেবেই ২০১৫ সালে ৪৫.৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী মাধ্যমিক স্তর থেকে ঝরে পড়ছে। ২০০৮ সালে ঝরে পড়ার হার ছিল ৬৫ শতাংশেরও বেশি। ২০১৫ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায় অষ্টম শ্রেণিতে উঠে সবচেয়ে বেশি ২১.০৭ শতাংশ স্কুলছাত্রী ঝরে পড়ে। এরপর দশম শ্রেণিতে ১৮.৫২ শতাংশ মেয়ের পড়ালেখা বন্ধ হয়। হিসাবটি তিন বছর আগের হলেও এই কয়েক বছরে পরিবর্তন হয়নি কিছুই। তার প্রমান তুলে ধরেছে আমাদের গনমাধ্যমগুলো।
শুধু মাত্র ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় ২০১৮ সালের জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় ১১১ ছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। বাল্যবিয়ে হওয়ায় তারা পরীক্ষায় অংশ নেয়নি বা নিতে পারেনি। তাহলে মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, সারা বাংলাদেশের অবস্থা কি হতে পারে? বাঞ্ছারামপুর উপজেলার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে বলা হয়, এবারের জেএসসি (জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট) পরীক্ষায় পাঁচ হাজার ৫৯৪ ও জেডিসি (জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট) পরীক্ষায় ৬১২ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করে। তাদের মধ্যে গত তিন পরীক্ষায় জেএসসিতে ১৭২ জন অনুপস্থিত থাকে। ১৭২ জনের মধ্যে ১০৬ জনই ছাত্রী এবং ৮৯ জন ছাত্র। অন্যদিকে জেডিসি পরীক্ষায় ৬১২ শিক্ষার্থী নিবন্ধন করে। তাদের মধ্যে নয় শিক্ষার্থী অনুপস্থিত। নয়জনের মধ্যে পাঁচ ছাত্রী এবং চারজন ছাত্র। বাঞ্ছারামপুর এসএম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আতিকুর রহমান জানান, তার স্কুলের কেন্দ্রে ৫০ ছাত্রীর বাল্যবিয়ে হওয়ার কারণে অনুপস্থিত।
রূপসদী বৃন্দাবন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুর মোহাম্মদ জমাদ্দার বলেন, আমাদের কেন্দ্রে ২৯ ছাত্রী অনুপস্থিত। তাদের সবারই বাল্যবিয়ে হয়ে যাওয়ায় অনুপস্থিত। রূপসদী খোদাই বাড়ী আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আবদুস সাত্তার বলেন, আমাদের মাদ্রাসার দুই ছাত্রীর বিয়ে হয়ে যাওয়ায় অনুপস্থিত রয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু তৌহিদ বলেন, জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় গত তিন পরীক্ষায় ১৮১ পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত। তাদের মধ্যে ৯৩ ছাত্র এবং ১১১ জন ছাত্রী। ১১১ ছাত্রীর বেশিরভাগ ছাত্রীর বিয়ে হয়ে যাওয়ার কারণে অনুপস্থিত বলে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘মাধ্যমিকে এসেই আমাদের হোঁচট খেতে হয় তার বড় কারণ হলো মাধ্যমিক স্কুলের প্রায় ৯৭ ভাগ বেসরকারিভাবে পরিচালিত।’ আর্থসামাজিক অবস্থাও এর কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রবণতাটি এক ধরনের অশনিসংকেত। আমাদের, বিশেষ করে আমাদের সমাজের জন্য। প্রায় অর্ধেকের মতো মেয়েরা ঝরে পড়ছে, মাধ্যমিক সমাপ্ত করতে পারছে না। আর উচ্চশিক্ষার দিকে যাওয়ার ক্ষেত্রে সেটাতো একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেই।’
তিনি আরো বলেন- 'উচ্চশিক্ষা কেন আমিতো বলবো কারিগরি শিক্ষা যেটা অষ্টম শ্রেণির পরেই যেতে হয়, সেখানেও কিন্তু মেয়েদের অংশগ্রহণের হার প্রভাবিত করে এই ঝরে পড়ার হারটা।’ বাংলাদেশে শিক্ষায় বাজেট ঘাটতির কথা উল্লেখ করে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, মেয়েদের ঝরে পড়া বন্ধ করতে নতুন ভাবে পরিকল্পনা করতে হবে। ‘শিক্ষার্থী প্রতি বরাদ্দ কমে গেছে। এখন আমরা মোট বাজেটের ১০ শতাংশের একটু বেশি খরচ করি শিক্ষার জন্য, যেটা ২০০০ সালে ১৪ শতাংশের ওপরে ছিল।’
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০১৫ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ২০ হাজার ২৯৭টি মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯৭ লাখ ৪৩ হাজার ৭২ জন। এর মধ্যে ৫১ লাখ ৯৩ হাজার ৯৬২ জনই ছাত্রী। তবে এ পর্যায়ে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ঝরে পড়ার হার বেশি। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হওয়া ছাত্রীদের মধ্যে মাত্র ৫৪ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ মাধ্যমিক শেষ করতে পারে। অন্যরা ঝরে পড়ে। এর বিপরীতে ছাত্রদের ঝরে পড়ার হার তুলনামূলক কম। এ পর্যায়ে ভর্তি হওয়া ৬৬ দশমিক ২৮ শতাংশ ছাত্র মাধ্যমিক স্তর শেষ করতে পারে। নিয়মিত মেয়াদে মাধ্যমিক স্তর সম্পন্ন করার ক্ষেত্রেও ছাত্রীরা পিছিয়ে রয়েছে। নিয়মিত মেয়াদে ছাত্রদের মাধ্যমিক স্তর সম্পন্নের হার যেখানে ৭৬ দশমিক ৪ শতাংশ, সেখানে ছাত্রীদের ক্ষেত্রে এ হার ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৪ নামে আইনের খসড়া মতামতের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোও হয়েছে। খসড়ায় উল্লেখ আছে, ‘যুক্তিসংগত কারণে মা-বাবা বা আদালতের সম্মতিতে ১৬ বছর বয়সে কোনো নারী বিয়ে করলে সেই ক্ষেত্রে তিনি “অপরিণত বয়স্ক” বলে গণ্য হবেন না।’
১৮ বছরের কম বয়সীদের কন্যা শিশুকে বিয়ে দেয়া বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, ‘আমরা বয়সের ব্যাপারে সিদ্ধান্তে এসে গেছি। বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ হবে। কিন্তু বিয়ে ছাড়া কেউ প্রেগন্যান্ট (অন্তঃসত্ত্বা) হয়ে গেলে কী হবে?’ তাঁর মতে, প্রতিবন্ধী নারীসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও বিশেষ ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিশ্বের উন্নত দেশেও অভিভাবকদের সম্মতিতে এ ধরনের বিয়ের কথা বলা আছে। সব দিক বিবেচনা করে তাঁরা সূক্ষ্মভাবে আইনটি করতে চান বলে জানান।
প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন জাতিসংঘের সনদ নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ বা সিডও কমিটির সাবেক চেয়ারপারসন এবং বেসরকারি সংগঠন উইমেন ফর উইমেনের নির্বাহী কমিটির সদস্য সালমা খান। তিনি বলেন, একটি মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলে তাকে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া সরকারের কাজ নয়। এখন অনেক মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলে তার প্রতিকার চাইছে। বিষয়টি এখন আর এমন নয় যে ধর্ষণের কথা মুখেই আনা যাবে না। তাই সরকারকে স্বচ্ছ একটি আইন করতে হবে।-- (প্রথম আলো)
শিশু ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ এবং নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তিরা এর সঙ্গে একমত নন। এ বিষয়ে শিশু বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় অধ্যাপক এম আর খান বলেন, ১৮ বছর বয়সের আগে কারও বিয়ে হওয়া উচিত নয়। ১৮ বছরের আগে কেউ বিচার, বুদ্ধি-বিবেচনাবোধ হতে পারে না। তা ছাড়া ১৮ বছর না হলে একজন ভোটও দিতে পারছে না। আর নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে বিয়ে করলে কেউ কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারবে না।
মুলত অভিভাবকদের নিম্ন আয়, বাল্যবিয়ে ও দারিদ্র্যই শিক্ষা থেকে কন্যা শিশুর ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ। এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, 'বর্তমানে শুধু উপবৃত্তির টাকা দিয়ে পড়াশোনার ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হয় না। কারণ কোচিং-প্রাইভেটসহ অন্যান্য খরচ রয়েছে। এছাড়া সামাজিক ও আর্থিক বাস্তবতার কারণেও অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে।'
দেশে দারিদ্র্যতার হার কমেছে। তবে দারিদ্র্যের এই হার কমানোর ক্ষেত্রে শিশুশ্রমের রোজগারও বড় ভূমিকা রেখেছে। তার মধ্যে কন্যা শিশুদের ভূমিকা অনেক বেশি। দারিদ্রতা কমাতে তারা নিয়োজিত হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ কাছে। অসহায় একটি পরিবারে একটি ছেলে একটি মেয়ে থাকলে পরিবারটি আগে ছেলে শিশুটির লেখাপড়ার কথা ভাবে। ছেলে শিশুটিকেই সুযোগ দিচ্ছে। অন্য দিকে কন্যা শিশুকে পাঠাচ্ছে রোজগার করতে। তাদের ধারণা ছেলেটাকে শিক্ষিত করলে সে পরক্ষনে পরিবারের হাল ধরবে। এটার ও একটা ব্যাখ্যা আছে, এখনও একটা মেয়ে বিয়ের পর আয় রোজগার করলে তা নিজের সংসারে, স্বামীর সংসারে, কোন ক্ষেত্রে স্বামীর হাতে তুলে দিতে হয়। খুব অল্প সংখ্যক মেয়েরাই পারে বাবা মায়ের পাশে দাঁড়াতে। নভেম্বরের প্রথম সাপ্তাহে এমন এক তথ্য তুলে ধরে নিউজ টুয়েন্টিফোর। সেখানে বলা হয় শিশুশ্রমে যে হারে ছেলে শিশুর হার কমছে তা চোখে পড়ার মতো, অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি এটাই এর উল্টো চিত্র কন্যা শিশুদের। কয়েকগুন বেশি কন্যা শিশুরা পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করতে কাজে যায়। যে বয়সে ওদের খেলনা নিয়ে খেলার কথা সেসময় তারা খেলনা তৈরীর কারখানায় কাজ করে।
উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারের যারা বাসা বাড়িতে ফুট ফরমায়েশ খাটাসহ নানা ধরনের কাজের জন্যে লোক রাখে, তারা অধিকাংশই মেয়ে শিশুকে রাখে। এতে গ্রামে হতদরিদ্র পরিবারের কিছু আর্থিক সহযোগিতা হয় ঠিকই, কিন্তু শিশুটির ভবিষৎ অনিশ্চিত রয়ে যায়। পরিবারকে সহযোগিতা করতে গিয়ে হারিয়ে ফেলে নিজের সোনালী শৈশব। মুলতো পরিবারের আয় বাড়াতে রোজগারের পথে নামতে হয় শিশুকে।
একদিকে পরিবারের হাল ধরতে, পরিবারের আর্থিক সহযোগিতা করতে মেয়ে শিশুরা লেখাপড়া থেকে সরে যায়। অন্য দিকে পরিবারের কন্যা শিশুকে বিয়ে দিয়ে সদস্য সংখ্যা কমাতে, খরচ কমাতে, অল্প বয়সে বিয়ের পিড়িতে বসিয়ে দেয় পরিবারগুলো। এর ফলে ওদের ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যায় তা পরিবারগুলো বুঝেই না। বিয়ের বয়স কম বা বেশি নয়, মেয়েদের আত্মনির্ভরশীল হবার কথা ভাবতে হবে, পথ দেখাতে হবে। পরিবারগুলোকে বুঝতে ও বুঝাতে হবে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। নেপোলিয়ন এর সেই উক্তি, 'আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দিব।'
লেখক - সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।


































