পথশিশু পুর্নবাসন ও শিশু অধিকার নিশ্চিত হোক
২০ নভেম্বর ২০১৮, ০৭:১৩ পিএম
অবসর পেলে আমি ঢাকা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় হাঁটাহাঁটি করতে যাই। সেখানে অসংখ্য মানুষের ভীড়ে কিছু পথশিশু (প্রচলিত ভাষায় টোকাই; আমি আদর করে পথফুল বলি) দেখা যায়। প্যান্ট-শার্ট পড়া মানুষ দেখলে দৌঁড়ে এসে টাকা চায়। ‘কয়ডা টাহা দ্যান, ভাত কিনা খামু। সারাদিন কিচ্ছু খাই নাই।’ তবে আমি সচরাচর টাকা দেই না এই কারণে যে টাকাটা তারা খাদ্য কেনা বা সঠিক কাজে লাগাতে পারে না। হয় বাবার হাতে তুলে দেয়; যিনি তা দিয়ে মাদক কিনে অথবা পথশিশু নিজেরা মাদক কিনে গ্রহণ করে। ওদের ক্ষুধা শর্তেও খাদ্য কিনে খাওয়ার প্রবণতা কম। তাই পথশিশুরা যখন আমার কাছে টাকা চায়, তখন আমি নিকটস্থ দোকান থেকে সাধ্যানুযায়ী খাবার (কলা, রুটি, বিস্কুট, পানি) কিনে দেই। তখন আমার উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়- সামান্য খাবার হলেও পথফুলগুলো অন্তত খেয়ে বাঁচুক। কিন্তু এভাবে ওরা কতদিন বাঁচবে? আমার মত কতজন ওদের মুখে খাবার তুলে দেয় বা দিবে? দিলেও প্রতিদিন তিনবেলা কে বা কারা ওদের দেখভাল করবে? সাময়িক খাদ্য দিয়ে কতদিন সুস্থভাবে ওদের বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব? এর জন্য প্রয়োজন সরকারের পক্ষ থেকে পথশিশু পুর্নবাসন প্রকল্প উদ্যোগ হাতে নেওয়া। কিন্তু এটা যে আমার নিছক কল্পনামাত্র, তা বিশ্বব্যাপী শিশুদের অধিকার ক্ষুন্নের বর্তমান হালচাল দেখলে উপলব্ধি করা যায়। বাংলাদেশসহ অসংখ্য স্বাধীন রাষ্ট্রে অসংখ্য শিশু অনাহারে, অর্ধাহারে জীবন-যাপন করছে; শিক্ষা, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিৎ, অথচ তাদের পুর্নবাসনের ব্যাপারে বিত্তবানদের বিন্দুমাত্র সদিচ্ছা নাই।
আমরা বলে থাকি, ‘আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।’ কিন্তু কোন শিশুগুলো আগামী দিনের ভবিষ্যৎ? নিশ্চিত করে বলা যায়, ধনীর শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এবং স্লোগানটি এমনই হওয়া যুক্তিযুক্ত। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে আজ হাজার হাজার শিশু বঞ্চনার শিকার। পারিবারিক দারিদ্রতা তাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারচ্ছন্ন করে তুলেছে। ভুমিহীন বাবা-মায়েরা পেটের আহার যোগাড় করতে শ্রম দিয়েই কূল পায় না, সেখানে সন্তানদেরকে কিভাবে মানবাধিকার নিশ্চিত করবে? প্রতিটি শিশুরা বাবা-মায়ের প্রত্যাশা, আমাদের সন্তান মানুষ হয়ে গড়ে উঠুক, শিক্ষিত হোক। কিন্তু স্বপ্নবান এই বাবা-মায়ের সন্তানের জন্য পৃথিবীটা বড়ই অনুপযোগী। তাই শিশুদের অধিকার নিশ্চিতকরণে সবার আগে তাদের উপযোগী পৃথিবী আমাদের গড়ে দিতে হবে। অনুকূল পরিবেশে তাদের বেড়ে উঠতে দিতে হবে। আর আমরা যদি তাদের সেই শিশুবান্ধব পরিবেশ উপহার দিতে ব্যর্থ হই, তাহলে আমরা যত স্বপ্নই তাদের ঘিরে দেখি না কেন, সব বিনষ্ট হয়ে যাবে। ঘরের শিশুরা হবে পথশিশু। শুধু বাংলাদেশ নয়, এটা পৃথিবীর সভ্য জাতিসমূহের জন্য অভিশাপের বিষয় বলে বিবেচ্য হবে।
মানুষের মৌলিক অধিকার পাঁচটি। যথা- অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা। একটি শিশু জন্মগ্রহণ করা মাত্রই অধিকারগুলোর দাবিদার হয়ে যায়। কিন্তু পারিপারশ্বিক কারণে শিশুরা তাদের অধিকারগুলো হারিয়ে ফেলছে। অথচ একজন সাধারণ মানুষের মতোই একটি শিশুর অধিকার সমান। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুর প্রয়োজনকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অথচ আমাদের পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুদের বাইরেও অনেক শিশু রয়েছে, যারা দীনহীনভাবে বসবাস করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খড়া, বন্যা বা অভিবাসনের দ্বারা তারা শহরে পাড়ি জমিয়ে ফুটপাতে, বস্তিতে বাস করতে থাকে। দু’বেলা দু’মুঠো অন্নই যেখানে ঠিকমতো তাদের জোটে না, সেখানে অন্যান্য চাহিদার কথা তো সুদূর পরাহত। এ জন্য কেবল আমাদের পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুর জন্যই নয়, এই বিষয়টি ‘এক বিশ্ব এক শিশু’ হিসাবে যেদিন সকলে ভাবতে শিখবে, সেদিনই বিশ্বের শিশুদের সকল মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সক্ষমতা আসবে। তখন আর আলাদাভাবে শুধুমাত্র পথশিশুদের পুর্নবাসনের কথা ভাবতে হবে না। শিশুদের মৌলিক অধিকার সুনিশ্চিত করতে পারলে পথশিশু বলে আর কেউ থাকবে না এবং শিশুপন্থি অনৈতিক কাজগুলো সহজেই নির্মূল করা সম্ভব হবে।
বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশে শিশু দিবস পালন করা হলেও ১৯৮৯ সালের ২০ শে নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ গৃহীত হয় এবং দিনটিকে ‘বিশ্ব শিশু দিবস’ বলে ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে প্রথম স্বাক্ষরকারী দেশসমূহের অন্যতম। ১৯৯০ সালের ৩রা আগস্ট জাতিসংঘে বাংলাদেশসহ ২২টি দেশ এই সনদের প্রতি পুনরায় সমর্থন জানায়। ১০৫টি দেশ সনদটিতে স্বাক্ষরের প্রেক্ষিতে ১৯৯০ সালের ২রা সেপ্টেম্বর থেকে জাতিসংঘ গৃহীত ‘শিশু অধিকার সনদ’ সমগ্র বিশ্বের শিশুদের জন্য সর্বমোট ৫৪টি ধারা সংবলিত অধিকারকে স্বীকার ও সংরক্ষণের জন্য আইনগত ভিত্তি তৈরি করে। বিশ্বব্যাপী শিশুদের অধিকার সংরক্ষরণে আশার সঞ্চারণ হয়। কিন্তু জাতিসংঘের শিশু সনদের প্রতিফলন সর্বত্র কাজে আসছে না বলে দেশে দেশে শিশুরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেসব শিশুরা কাজ পাচ্ছে না, তারা পথশিশু হয়ে হাটে, মাঠে, রাস্তায় ঘুরছে। কিন্তু এই বিষয়গুলো বন্ধকরণে সংগঠনসমূহের বোধোদয় নাই বললেই চলে।
আমাদের বাংলাদেশের দিকে দৃষ্টি দিলে শিশু অধিকার ক্ষুন্নের ব্যাপারে টনক নড়বে। শুধু তাই নয়, দেশে বেগতিক হারে পথশিশুর সংখ্যা বাড়ছে, শিশুশ্রমিকের দ্বারা মিল-কারখানা চালানো হচ্ছে এবং তাদেরকে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে নির্যাতন-নিপীড়ন করা হচ্ছে। শিশুশ্রমের সত্যতা অনুধাবনে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, মাত্র ৫ থেকে ১৪ বছরের শিশুদের ঘরে, মাঠে এবং কারখানায় কাজ করতে দেখা যায়, যা অনেকটা বিনা বেতনেই বলা চলে। বেতন মিললেও তা অতি সামান্য। কেউ কেউ ‘পেটে-ভাতে’ চুক্তিতেই সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে থাকে। বিষয়গুলো সুশীল সমাজের নজরে আসে। সে প্রেক্ষিতে মাঝেমাঝে নানা সভা-সেমিনারে শিশু অধিকারের কথা বলা হলেও বিষয়টিতে প্রকৃত অর্থে সামান্যই গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই গুরুত্বহীনতা কারণে শিশু অধিকারের অব্যাহত অপব্যবহার হচ্ছে এবং শিশু অধিকার লঙ্ঘন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘনবসতি, সীমিত সম্পদ এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে এবং এ অবস্থায় শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আমরা এ কথাটি স্পষ্টত উপলব্ধি করতে পারছি যে দারিদ্রতার কারণে শিশুরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এই বিচ্ছিন্নবাদিতা তাদেরকে শিশুশ্রমিক বানাচ্ছে, অপরাধী বানাচ্ছে, পথশিশু বানাচ্ছে। তাই প্রথমত এদের পুর্নবাসন করা প্রয়োজন বলে মনে করছি। শিশুদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে জাতিসংঘসহ দেশীয় নানা সংগঠনকে আরও তৎপর হতে হবে। আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী শিশু দিবস পালন করাই শিশুদের অধিকার ফিরিয়ে আনার একমাত্র পথ নয়। তবে বিশ্ব শিশু দিবস থেকে আমাদের ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতন হতে হবে শিশুদের টিকিয়ে রেখে ভবিষ্যৎ বিশ্বকে গৌরবজ্জ্বোল পথে নিয়ে যেতে হবে। শিশুদের রক্ষায় দেশে দেশে লিখিত আইন থাকলেই চলেবে না, তার সঠিক প্রয়োগ সুনিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতায় কারখনায় শিশুশ্রমিক নিয়োগ বন্ধ হবে। সেই সাথে আমাদের কোমলমতি শিশুদের সকল অধিকার নিশ্চিত করতে পারিবারিক উন্নয়ন ঘটানো খুবই জরুরি। পরিবারকে স্বচ্ছল করার মাধ্যমে শিশুদের অনুকূল পরিবেশ তৈরিকরণ সম্ভব যাতে তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পথশিশু হতে না পারে। পরিশেষে, সকলের প্রতি আমার আহ্বান- আসুন, আমরা শিশু অধিকার সম্পর্কে সচেতন হই, পাশাপাশি কোনো শিশু যেন আমাদের দ্বারা নির্যাতিত, অত্যাচারিত না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখি। সম্ভব হলে তাদের সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসি। কোথাও শিশু নির্যাতন চোখে পড়লে তা পতিহত করি। পারতপক্ষে শিশুদেরকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ বন্ধ না করে তাদের মৌলিক অধিকার প্রাপ্তির পথকে সুগম করি। জেনে রাখুন, আপনার আমার ব্যক্তিগত কিছু উদ্যোগই পারে সমাজকে পরিবর্তন করতে। সর্বোপরি, বিশ্ব শিশু দিবস সাফল্যমণ্ডিত হয়ে শিশু অধিকার সুনিশ্চিত হোক, এমনটাই প্রত্যাশা করছি।
মোহাম্মদ অংকন: কলামিস্ট, ঢাকা।


































