স্বাস্থ্যসম্মত কোরবানি ও তদুত্তর পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

২২ আগস্ট ২০১৮, ০৫:০৮ পিএম


স্বাস্থ্যসম্মত কোরবানি ও তদুত্তর পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

কোরবানির ঈদে পশু জবাই করা একটা বড় ধরনের যজ্ঞ। প্রতিবছর সারাদেশে ঈদের জন্য ৫০ থেকে ৫৫ লাখ বড় পশু এবং ৪০ থেকে ৪৫ লাখ ছোটপশু কোরবানি করা হয়ে থাকে। কাজেই মাত্র একদিনে জবাই করা হয় প্রায় ছোট-বড় মিলে এককোটির বেশি পশু। এই এককোটি পশু জবাইয়ের সাথে সেটি স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশসম্মত হলো কিনা তা জড়িয়ে রয়েছে। এমনিতেই দেশের বিভিন্ন স্থানে হাটে-বাজারে পশুর মাংস বিক্রির দোকান থাকলেও রাজধানী ঢাকা শহর ছাড়া অন্য কোথাও পশু জবাইয়ের জন্য কোন নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারিত থাকার কথা শোনা যায়নি। কেবল ঢাকা মহানগরে দুটি সিটি করপোরেশনে মাত্র চারটি স্লটারিং হাউজ (জবাইখানা) রয়েছে।

সম্প্রতি পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে বিষয়টি গণমাধ্যমে আলোচনায় আসায় জানা গেছে যে, যেখানে স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিন সারা ঢাকা শহরে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার পশু জবাই করা হয়। আর সেখানে নিয়মতান্ত্রিকভাবে জবাই করা হয় মাত্র তিনশ’ থেকে চারশ’। আর বাকী ১২০০ থেকে ১৫০০ পশুই জবাই করা হয় যত্রতত্র, যেখানে-সেখানে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে। এখান থেকেই সারা ঢাকা শহরে পশুর মাংস সরবরাহ হয়ে যেমন হয় জীবাণুযুক্ত এবং তেমনি হয় অস্বাস্থ্যকর ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। কারণ এমনিতেই লাল মাংসে কলেস্টেরল বেশি থাকার কারণে স্বাস্থ্য চেতন অনেকেই এখন এসব মাংস থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছেন। তারউপর এসব খেলা জায়গায় উড়ন্ত মশা-মাছির প্রাদুর্ভাবে রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ে শহরময়। তাছাড়া এমনিতেই এখন বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে এ মৌসুমটিতে জিকা ভাইরাস ও এডিস মশার আক্রমণের আতঙ্গে রয়েছে জনগণ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে যেখানে প্রতিদিন গড়ে দেড়-দুই হাজার পশু জবাই ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সকলে হিমসিম খেয়ে যায়, সেখানে সারাদেশের প্রায় এককোটি পশু জবাই ব্যবস্থাপনা করা খুব সহজ কাজ নয়। কিন্তু গতবছর থেকে ঢাকায় নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত দুইটি সিটি করপোরেশন এ নিয়ে কাজ করার কারণে এখন আগের তুলনায় একাজটি অনেক সিস্টেমেটিক হয়েছে, যা সবার চোখেই ধরা পড়ছে। এবারো (২০১৮) কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পশু কোরবানির জন্য দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র একসাথে বসে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে একমত হয়ে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ১০টি অঞ্চলে ৬০২টি কোরবানির পশু জবাইয়ের জন্য স্পট নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আবার উত্তর সিটি করপোরেশনেও প্রায় সমসংখ্যক জবাই স্পট নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

সেসব স্পটে সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় কিছু প্রশিক্ষিত মাওলানা ও অন্যান্য সহায়তাকারী রাখা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সেসব স্পটে কোরবানির পশু জবাই করার পর দুপুর ২ টার পর থেকে সিটি করপোরেশনের বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কর্মীবৃন্দ স্থানগুলো যথাযথভাবে ব্লিচিং পাউডার ও পানি দিয়ে পরিষ্কার এবং জীবাণুমুক্ত করে দেবে। এসব স্পটের বাইরেও যারা যাদের বাসা-বাড়ির ভিতরে নিজস্ব পর্যাপ্ত খোলা জায়গায় কোরবানি করবেন, সেখানে কোরবানির পরপরই স্থানগুলো পরিষ্কার করে দুপুর ২ ঘটিকার মধ্যে প্রয়োজনে নিকটস্থ কোন নির্ধারিত জবাইস্পটে বর্জ্যগুলো রেখে দিবেন যাতে তা সহজেই টহলরত পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চোখে পড়ে এবং সেখান থেকে তা তাৎক্ষণিক তারা নিয়ে যেতে পারে।

কোন অবস্থাতেই কোরবানির জন্য কোন পাবলিক প্লেস বা রাস্তা বেছে নেওয়া যাবে না, যাতে কোন ধরনের জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। আর নির্ধারিত স্পট ছাড়া অন্য কোথাও কোরবানি করলে সেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তার নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার করে দেবেন। আর যদি তা না করেন তবে কেউ অভিযোগ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও ইঙ্গিত রয়েছে এবার। এভাবে না করলে পশুর মাংসও যেমন জীবাণুমুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত হয় না, অপরদিকে পশুর চামড়াসহ আশে-পাশের প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে, যা প্রায় মাসাবাধি বিরাজমান থাকে। কারণ কোরবানির পশুর রক্ত, মাংসের উচ্ছিষ্টাংশ, হাড়-হাড্ডি, নাড়ি-ভুড়ি পরিষ্কারের ময়লা, কাঁচা চামড়ার গন্ধ ইত্যাদির ক্ষতিকর প্রভাব মারত্মক পরিবেশ বিপর্যয় সৃষ্টি করে থাকে।

এটা তো গেলো শুধু রাজধানী ঢাকা শহরের কথা। কিন্তু সারাদেশে আসলে কী হচ্ছে? সেখানে সংশ্লিষ্ট এলাকার সরকারের প্রশাসন কিংবা জনপ্রতিনিধিবৃন্দ যদি এরকম ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তাহলে কোরবানির পশু জবাই স্বাস্থ্য ও পরিবেশসম্মত হয়ে জনকল্যাণ হবে। এখন আটটি বিভাগীয় শহর, ৬৪টি জেলা শহর, প্রায় ৫০০ টির উপরে উপজেলা শহর এমনকি এখন পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও অনেক শহর গড়ে উঠেছে সেখানেও সুশৃঙ্খলভাবে ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কোরবানির পশুকে স¦াস্থ্য ও পরিবেশসম্মতভাবে জবাই তদারকি করা উচিত। তাছাড়া গ্রাম-গ্রামান্তরে তো খোলা অনেক মাঠ রয়েছে যেখানে ইচ্ছা করলেই স্বাস্থ্য ও পরিবেশসম্মতভাবে পশু জবাই করা যেতে পারে।

বিষয়টি খুবই সহজ একটি কাজ। কারণ এখানে কোন ধরনের বাড়তি খরচের প্রয়োজন হয় না। শুধু প্রয়োজন হয় একটু আন্তরিকতা। প্রত্যেকে তাদের কোরবানির পশু জবাই দেওয়ার পর তাড়াতাড়ি যদি সেই রক্ত জমাট বাধার আগেই কয়েক বালতি পানি ঢেলে দিয়ে সেখানে অল্প পরিমাণে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দিলেই স্থানটি জীবাণুমুক্ত হয়ে পরিবেশের জন্য ভালো হয়। আর সেই উচ্ছিষ্টাংশ যদি মাটির কোন একটি স্থানে গর্ত করে পরে মাটি চাপা দিয়ে রাখা যায় তাতেও পরিবেশ রক্ষায় অনেক ভাল ফল পাওয়া যায়। দেখা গেছে, ঈদের পরে যদি আমরা কোথাও বেড়াতে যাই তাহলে এসব উচ্ছিষ্টাংশের গন্ধ সহজেই আমাদের নাকে এসে জানিয়ে দেয় যে কোরবানির ঈদ শেষ হয়েছে। সবাই যার যার জায়গায় একটু সচেতন হলেই এ থেকে আমরা পরিত্রাণ পেতে পারি কোরবানির পশু বিলি-বণ্টনে  পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর অনেক পলিথিন ব্যবহার হয়ে থাকে যা ইচ্ছা করলেই আমরা পরিত্যাগ করতে পারি। কারণ পলিথিনের মাধ্যমে বিলি-বণ্টন না করে তা অন্য কোন বহনযোগ্য পাত্রকেও ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে সারাদেশে এসব কাজ তদারকির জন্য প্রয়োজনে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মীবাহিনীসহ সংশিষ্টদেরকে দিয়ে সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ ও প্রচার-প্রচারণা ব্যাপভাবে করা যেতে পারে। সর্বোপরি একটি কথা আমরা সকলেই একবাক্যে স্বীকার করবো যে, সব কিছু শুধু সরকারের ঘাড়ে দায়-দায়িত্ব না চাপিয়ে দিয়ে কিছু দায়িত্ব নিজেকেও নিতে হবে। আর তা হলো আত্ম-সচেতনতা। প্রত্যেকে প্রত্যেকের জায়গায় একটু সচেতন হলেই আমরা নিজের পরিবেশকে নিজেরাই সুন্দর করে রাখতে পারি। এখন থেকে পুরোপুরি না পারলেও অন্তত একটু একটু করে হলেও চেষ্টা করে যাব সকলে। এটাই হোক এবারের কোরবানি ঈদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রত্যয়।                   

লেখক: ড. মো. হুমায়ুন কবীর, কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
 

 

Ads