শব্দ দূষণে অতিষ্ঠ এলাকাবাসি, রাতনামলেই শুরু হয় অশান্তি
১০ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:৩১ পিএম
দিনভর হাড়ভাঙা পরিশ্রম হয়েছে। রাতের খাওয়া-দাওয়ার শেষে সবে বালিশে মাথা রেখেছিলেন কলেজ শিক্ষক নুরুজ্জামান। আচমকা বিকট চিৎকার? তারপর এক ভয়ঙ্কর বাজনা। বিছানা থেকে একলাফে উঠে ঘরের আলো জ্বেলে ওই শিক্ষক ভয়ে চিৎকার করে উঠেছিলেন। তাঁর স্ত্রী আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘‘ঘুমিয়ে পড়ো। পাশের বাড়িতে ছেলেপিলেরা গান বাজিয়ে নাচছে। আর ঘুম! বালিশের নীচে মাথা রেখেও ভোর পর্যন্ত দু’চোখের পাতা এক করতে পারেননি ওই শিক্ষক। পরের দিনও বুক ধড়ফড় করছিল।’’ জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের ঘটনা এটি।
এটা শুধু ওই কলেজ শিক্ষক নুরুজ্জামানের একার অভিজ্ঞতা নয়। শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার অধিবাসিদের বর্তমান সময়ের অভিজ্ঞতা এটি। প্রতিদিন নয়, প্রায়শই জন্মদিনে, বিয়েতে ও সামাজিক নানা অনুষ্ঠানে ঘটছে এমন ঘটনা। তাছাড়া পিকনিকের নামে এখন ছেলে মেয়েরা মেতে ওঠে ডিজে নামক ভয়ংকর শব্দ পার্টিতে। ওই কলেজ শিক্ষক এসব ডিজে পার্টির যন্ত্রনা থেকে প্রতিকার চেয়ে সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেন।
এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ডিজের আওয়াজ সাংঘাতিক। পিকনিক ও বিয়েতে আনন্দ করতে গিয়ে রাতভর ডিজে বাজিয়ে এলাকার লোকজনকে সমস্যায় ফেলা হচ্ছে। বিষয়টি সহ্যের বাইরে চলে গেলেও রাতবিরাতে কেউ সাহস পান না প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে প্রতিবাদ করার।
মিনহাজুল ইসলাম বাবুল, শাহীন আলম, মেহেদী হাসান মিলন সহ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ডিজে পার্টির ছেলেমেয়েরা প্রতিবেশি ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, ছোট শিশু, অসুস্থ ও বৃদ্ধ নারী পুরুষ কোন দিকেই খেয়াল রাখে না। অথচ বছর কয়েক আগেও এমনটা ছিল না। আমরা শব্দ দূষণ থেকে রেহাই চাই।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে কয়েকজন ডিজে ব্যবহারকারী জানান, ‘‘ওই আওয়াজটাই তো আসল মজা। আগের দিনের সাউন্ড সিস্টেম তো এখন পানসে হয়ে গিয়েছে। বিয়েতে ওসব আর চলে নাকি!’’ তার কথায় অন্য আয়োজনে কমতি থাকলেও ডিজে কিন্তু থাকবেই। নাহলে অন্যদের কাছে মান থাকবে না।
কয়েক দিন আগে ছেলের বিয়ে দিয়েছেন এমন অভিভাবক আব্দুর রহমান বলেন ‘‘ওদের মান রাখার খপ্পরে পড়ে আমাদের জানটাই না হারায়!’’ তিনি আরো বলেন, “এখনকার ছেলেদের এটাই রেওয়াজ। ওই ডিজের আওয়াজে বুক ধড়ফড় করে। তার পরার্মশ হচ্ছে প্রশাসনের উচিত বিষয়টির লাগাম টানা।’’
নালিতাবাড়ী পৌরশহরের এক মাইক ব্যবসায়ী জানান, পুরনো সাউন্ড সিস্টেম দোকানে পড়ে রয়েছে। সকলেই ডিজে চাইছেন। ডিজে সাউন্ড সিস্টেমের চাহিদা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক ডেকোরেশন এবং টেলিকম দোকান ডিজে ভাড়া দিচ্ছে। এমনকি উপজেলার বিভিন্ন হাট বাজারে ভাড়ায় পাওয়া যাচ্ছে ডিজে-সাউন্ড সিস্টেম।
মাহেদী হাসান, সেলিম আহমেদ, মোহাম্মদ সারোয়ার সহ কয়েকজন কলেজ শিক্ষার্থী জানায়, প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ডিজে বক্সের শব্দ সন্ধ্যা থেকেই শুরু হয়। উচ্চ মাত্রার শব্দের কারনে মন-সংযোগে খুবই সমস্যা পড়তে হচ্ছে। যতক্ষণ গানবাজনা চলে ততক্ষণ আর পড়া হয়না। মাথা ধরে যায়।
অভিযোগকারী শিক্ষক নুরুজ্জামান বলেন, শব্দ দূষণের বিষয়টি দেখা প্রশাসনের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সমাজে একজনের আনন্দের নামে দশ জনের অসুবিধা প্রশাসনের দেখা উচিত।
নালিতাবাড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জোহায়ের আক্তার বলেন, মাত্রারিক্ত উচ্চ শব্দে হার্ট ও কানের রোগীরা ঝুঁকিতে থাকে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খৃষ্টফার হিমেল রিছিল বলেন, শব্দ দূষণের বিষয়ে ইতিমধ্যে অভিযোগ পেয়েছি। আইন শৃঙ্খলা মিটিংয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এজন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সর্ব সাধারণকে শব্দ দূষণের ব্যাপারে সচেতন করতে মাইকিং করতে বলা হয়েছে।
































