সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন: সরাসরি যুদ্ধ নাকি কৌশলগত সহায়তা?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৫ এএম


সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন: সরাসরি যুদ্ধ নাকি কৌশলগত সহায়তা?

 

সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও আন্তর্জাতিক সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে পাকিস্তানের সামরিক ভূমিকা কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকবে—তা নিয়ে নতুন করে তীব্র ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের মিত্র রিয়াদকে সামরিক দিক থেকে পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার অঙ্গীকার থাকলেও, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সরাসরি স্থল কিংবা আকাশযুদ্ধে ইসলামাবাদ জড়াবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা এখনো কাটেনি। মূলত নিজস্ব অর্থনীতি রক্ষা, সামরিক বাহিনীর ব্যস্ততা এবং প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সংবেদনশীল ভারসাম্য বজায় রাখতেই সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে কেবল ‘সহায়ক ও সামরিক পরামর্শক’ হিসেবে থাকার কৌশলে হাঁটছে পাকিস্তান।

ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৪ (প্রতিদিনের চিত্র ডেস্ক): আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সাময়িকী ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তার নানা সমীকরণ বিবেচনায় নিয়ে পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে নামার ঝুঁকি নিতে চাইছে না, বরং প্রশিক্ষক ও প্রতিরক্ষামূলক কৌশল তৈরি করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।

সৌদি আরব ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ইতিহাস বহু পুরোনো। ১৯৬০-এর দশক থেকেই পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা সৌদি সশস্ত্র বাহিনীকে উন্নত প্রশিক্ষণ ও সামরিক পরামর্শ দিয়ে আসছেন। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে এই নিরাপত্তা সহযোগিতা আনুষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। ঐতিহাসিক সেই সুসম্পর্কের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০-১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ও সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সীমানা রক্ষায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সেনা মোতায়েন করেছিল পাকিস্তান।

তবে দীর্ঘদিনের সুদৃঢ় সামরিক মিত্রতা থাকলেও সব সংঘাতের নীতিতে একমত হতে পারেনি পাকিস্তান। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৫ সালে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক জোটের যে সামরিক অভিযান শুরু হয়, সেখানে সরাসরি পাকিস্তানি সেনা পাঠানোর প্রস্তাব আনা হলেও দেশটির পার্লামেন্ট সর্বসম্মতিক্রমে ‘নিরপেক্ষ’ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে কেবল প্রশিক্ষণ, কৌশলগত সামরিক পরামর্শ ও সৌদি ভূখণ্ডের ভেতরে প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রমের আওতায় সীমান্ত অঞ্চলে কিছু সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল।

সম্প্রতি দুই দেশের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (এসএমডিএ) স্বাক্ষরিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে যৌথভাবে ঐতিহাসিক ‘মক্কা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হলে এই ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সমীকরণ এ অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।

দ্য ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি ভূখণ্ডে হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় গত ৫ অক্টোবর পাকিস্তান ও তুরস্ক যৌথভাবে রিয়াদের নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার করতে সম্মত হয়। তবে নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে সম্মতি থাকলেও শত্রুভাবাপন্ন ভূখণ্ড বা ইয়েমেনের ভেতরে গিয়ে সরাসরি সামরিক অভিযান চালানোর কোনো পরিকল্পনা পাকিস্তানের নেই।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এ ব্যাপারে সম্প্রতি অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান, পাকিস্তান ও তুরস্ক মূলত সহায়ক শক্তি হিসেবে পাশে রয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারি (ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিং), প্রযুক্তিগত সাহায্য এবং পর্যবেক্ষণমূলক কর্মকাণ্ডে পাকিস্তানের সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকলেও রিয়েল-টাইম যুদ্ধক্ষেত্র পরিচালনা করছে সৌদি সামরিক বাহিনী নিজেই।

সৌদি আরবের আহ্বানে সাড়া দিয়ে পুরোদমে হুথিবিরোধী যুদ্ধে নামার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের জন্য প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো প্রতিবেশী ইরান। পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে ইরানের সঙ্গে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ স্পর্শকাতর সীমান্ত রয়েছে। অন্যদিকে, হুথিদের প্রতি তেহরানের সরাসরি সমর্থন সর্বজনবিদিত। ফলে এই যুদ্ধে পাকিস্তান আগ্রাসী ভূমিকা নিলে তেহরানের সঙ্গে ইসলামাবাদের সরাসরি দ্বিপক্ষীয় ও সীমান্ত সংঘাত তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তাছাড়া পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ দেশটির মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ শিয়া ধর্মাবলম্বী। একই সাথে আফগানিস্তান সীমান্তে তালেবানদের অস্থিরতা এবং পূর্ব সীমান্তে ভারতের সাথে দীর্ঘদিনের সামরিক উত্তেজনার দরুন মধ্যপ্রাচ্যের প্রক্সি-ওয়ারে (Proxy War) নতুন করে যুক্ত হওয়া সামরিক বাহিনীর পক্ষে সম্ভব নয়।

অবশ্য বিপরীত হিসাবও রয়েছে। সৌদি আরবের আর্থিক সহায়তা, ঋণ এবং তেল অনুদান পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য অত্যন্ত জরুরি। ফলে রিয়াদের কোনো বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট থেকে একদম মুখ ফিরিয়ে রাখা ইসলামাবাদের পক্ষে সম্ভব নয়। যদিও পাকিস্তানি অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ভবিষ্যতে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো সামরিক সংঘাত বাঁধলে সৌদি আরব ঠিক কতটা সামরিক বা কূটনৈতিকভাবে পাশে দাঁড়াবে—তা নিশ্চিত নয়।

সর্বোপরি, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সামরিক পরিস্থিতি ও নিজস্ব ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়েই এগোচ্ছে ইসলামাবাদ। রিয়াদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি বজায় রেখেও ইরানকে না চটানো এবং নিজের সেনাবাহিনীকে সুরক্ষিত রাখাই এখন পাকিস্তানের মূল কৌশল। পরিশেষে, পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটলে পাকিস্তান এই কৌশলে পরিবর্তন আনবে নাকি শুধু পরামর্শকের ভূমিকা বজায় রাখবে, তা নির্ধারণ করবে আগামীর আঞ্চলিক রাজনীতি।

Ads