গভীর রাতে বাবার কাছে বাঁচার আকুতি, ভিডিও কল কেটে যাওয়ার পর মিলল তরুণীর লাশ
২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৪ এএম
রাজধানীর মণিপুরিপাড়ায় স্বামী ও যৌতুকলোভী পরিবারের শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে জুমরাতুন নেছা বর্ষা (২৪) নামের এক তরুণীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গভীর রাতে বাবাকে ভিডিও কল করে নির্যাতনের কথা জানিয়ে বাঁচার আকুতি জানানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর রহস্যজনক মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিহতের বাবা তেজগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন এবং পুলিশ অভিযুক্ত স্বামীকে গ্রেপ্তার করেছে।
গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) মধ্যরাতে রাজধানীর তেজগাঁও থানাধীন মণিপুরিপাড়ার একটি ভাড়া বাসায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
ভালোবেসে এক বছর আগে জুমরাতুন নেছা বর্ষা ও নাবিদ হোসাইনের বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই বেকার স্বামী নাবিদ বিভিন্ন অজুহাতে যৌতুক হিসেবে টাকা দাবি করতে শুরু করেন। বর্ষার পরিবার এর আগে একাধিকবার তাঁকে টাকা দিলেও সেই টাকা দিয়ে তিনি মাদক সেবন করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে বর্ষার পরিবার টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিলে তাঁর ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। এর আগেও একবার নির্মম মারধরের শিকার হয়ে বর্ষাকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল, যা তাঁরা গোপন রেখেছিলেন।
ঘটনার রাতে স্বামী নাবিদ ব্যবসা ও মোটরসাইকেল কেনার কথা বলে বর্ষার বাবার কাছে আবারও মোটা অঙ্কের টাকা এনে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। টাকা আনতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে অমানুষিক মারধর করা হয়। এমনকি শ্বশুরবাড়ির এক সদস্য সেই মারধরের ভিডিও ধারণ করে বর্ষার পরিবারকে পাঠিয়েও দেয়। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে বর্ষা তাঁর বাবা শেখ মনোয়ার হোসেনকে একটি ভিডিও কল দেন।
ভিডিও কলে কান্নাকাটি করতে করতে বর্ষা বারবার তাঁর বাবাকে অনুরোধ করেন, তাঁকে যেন দ্রুত ওই বাসা থেকে উদ্ধার করে বাবার বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আতঙ্কের সঙ্গে জানান যে, তাঁকে না নিয়ে গেলে স্বামী ও তাঁর পরিবারের লোকজন তাঁকে মেরে ফেলবে। আকস্মিকভাবেই কথা বলার একপর্যায়ে ভিডিও কলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
মেয়ের এমন আকুতি ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে বর্ষার মা-বাবা তাৎক্ষণিকভাবে লালবাগের বাসা থেকে মণিপুরিপাড়ার উদ্দেশে রওনা হন। রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাঁরা যখন ওই বাসার সামনে গিয়ে পৌঁছান, তখন সেখানে একটি অ্যাম্বুলেন্স দেখতে পান। পরে বর্ষার স্বামীর পরিবারের লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তাঁরা জানান যে বর্ষা আত্মহত্যা করেছেন এবং তাঁকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
খবর পেয়ে বর্ষার বাবা-মা দ্রুত ওই হাসপাতালেও ছুটে যান। সে সময়ো তাঁরা জানতেন না যে তাঁদের মেয়ে আর বেঁচে নেই। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর অ্যাম্বুলেন্স থেকে বর্ষার মরদেহ নামানোর সময় তাঁরা ডাকতে শুরু করেন। এরপর হাসপাতালের কর্তব্যরত নার্স ও চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত করেন যে বর্ষা আগেই মারা গেছেন। পরে তাঁর মরদেহের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের গুরুতর চিহ্ন পাওয়া যায়।
ঘটনার বিষয়ে তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুনিরুজ্জামান জানান, যৌতুকের দাবিতে বিভিন্ন সময় বর্ষাকে তাঁর স্বামী নাবিদ হোসাইন শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। নিহতের শরীরে আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে। এ ঘটনায় বর্ষার বাবা শেখ মনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে তেজগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলা রুজু হওয়ার পর পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে হাসপাতাল থেকেই অভিযুক্ত স্বামী নাবিদ হোসাইনকে গ্রেপ্তার করে এবং পরবর্তীতে তাঁকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। বর্তমানে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পুলিশি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।































