বিদ্যুৎ বিল বেশি আসার কারন ও সেটি কমানোর উপায়

মো: এনামুল হক

০৪ আগস্ট ২০২৪, ১১:১৯ এএম


বিদ্যুৎ বিল বেশি আসার কারন ও সেটি কমানোর উপায়

মো: এনামুল হক।



মাদের দৈনন্দিন জীবনে বিদ্যুৎ ছাড়া একটা দিনও কল্পনা করা যায়না। বাড়িতে হোক কিংবা অফিসে বা বাহিরে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ এর প্রয়োজন রয়েছে । প্রাত্যহিক জীবনের  গুরত্বপূর্ণ ব্যবহারিক জিনিসপত্র যেমন- মোবাইল, টিভি, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ফ্রিজ, এসি, ফ্যান, ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদি বিদ্যুৎ ছাড়া কল্পনা করা অসম্ভব। আর এই বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য আমাদের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হয়। 

বিদ্যুৎ বিলের বিষয়টি পরিস্কারভাবে জানার বা বুঝার জন্য পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে আমাদের সামগ্রিক ধারনা থাকতে হবে। (১). কারেন্ট-  কোন পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহের হারকে কারেন্ট বলে অথবা একক সময়ে কোন পরিবাহীর ভেতর দিয়ে যে পরিমান ইলেকট্রন একটি নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত হয় তাকে কারেন্ট বলে। কারেন্টের একক Ampere (এ্যাম্পিয়ার)। সংক্ষেপে একে A দ্বারা প্রকাশ করা হয়। কারেন্টের প্রতিক হলো I (আই)। (২). ভোল্টেজ-  কোন পরিবাহীর অভ্যন্তরে থাকা ইলেকট্রনসমূহকে স্থানচ্যুত করতে বা করাতে যে ফোর্স/চাপ প্রয়োজন হয় তাকে ভোল্টেজ বলে অথবা বৈদ্যুতিক চাপকে ভোল্টেজ বলে।  ইহার একক Volt (ভোল্ট)। ইহাকে V দ্বারা প্রকাশ করা হয়। (৩). পাওয়ার-  একটি সার্কিটের মধ্যে দিয়ে যে হারে ইলেকট্রন প্রবাহিত হয়ে কাজ সম্পন্ন করে তাকে ইলেকট্রিক পাওয়ার বলে। সার্কিটের ভোল্টেজ এবং কারেন্ট এর গুনফল করলে পাওয়ার পাওয়া যায়। একে সাধারনত P দ্বারা প্রকাশ করা হয়। পাওয়ার এর একক ওয়াট (Watt) । (৪). এনার্জি- বিদ্যূৎ খরচকে এনার্জি বলা হয় বা একটি সার্কিটে বৈদ্যূতিক পাওয়ার যতক্ষন কাজ করে, সেই পাওয়ার এবং উক্ত সময়ের গুনফলকে এনার্জি বলে। এনার্জিকে E দ্বারা প্রকাশ করা হয়। (৫). পাওয়ার ফ্যাক্টর- এসি সার্কিটে ভোল্টেজ এবং কারেন্টের মধ্যেবর্তী কোনের ফেজ এ্যাঙ্গেল এর কোসাইন  মানকে পাওয়ার ফ্যাক্টর বলে। ইহাকে  CosӨ  দ্বারা প্রকাশ করা হয়। ইহার কোন একক নেই এবং ইহাকে শতকরা হিসেবে প্রকাশ করা হয়। সিঙ্গেল ফেজ আবাসিক গ্রাহকের ক্ষেত্রে ল্যাগিং বা লিডিং পাওয়ার ফ্যাক্টরের জন্য সাধারনত কোনো জরিমানা গুনতে হয় না। থ্রি-ফেইজ  গ্রাহকের ক্ষেত্রে পাওয়ার ফ্যাক্টর খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।  ল্যাগিং বা লিডিং পাওয়ার ফ্যাক্টরের কারনে ল্যাগিং/লিডিং কারেন্ট বেড়ে যায় ফলে বৈদ্যূতিক মেশিনারিজ যেমন-অল্টারনেটর, ট্রান্সফরমার এর কার্যদক্ষতা কমে যায়। পাওয়ার ফ্যাক্টরের মান ইউনিটি থেকে যত কম হবে তত ল্যাগিং কারেন্ট বেড়ে যাবে ফলে একই KVA তে KW (আউটপুট) তত কমে যাবে। একইভাবে পাওয়ার ফ্যাক্টরের মান ইউনিটি থেকে যত বেশি হবে লিডিং কারেন্ট তত বেড়ে যাবে এবং এর ফলে একই KVA তে KW (আউটপুট) তত কমে যাবে। ইহা ছাড়াও ল্যাগিং/লিডিং পাওয়ার ফ্যাক্টরের জন্য লাইন লস বৃদ্ধি পায় ও বিদ্যূৎ বিল বেশি আসে এবং গ্রাহককে জরিমানাও গুনতে হয়। পাওয়ার ফ্যাক্টর ইউনিটি থাকলে এই সমস্যাটি হয়না বা হবেনা। পাওয়ার ফ্যাক্টর ইউনিটি হলে সবচেয়ে ভালো।  

অতএব আমরা বুঝতে পারছি কোন ইলেকট্রিক ডিভাইস চালানোর জন্য কারেন্ট এবং ভোল্টেজ দুটোরই প্রয়োজন। যে কোন একটি ছাড়া অন্যটি দিয়ে চালানো সম্ভব নয়। কারেন্ট এবং ভোল্টেজ এর গুনফলকে আমরা পাওয়ার  বলি। P= VI CosӨ (For single Phase)) এবং P= √3 VI Cos Ө (For 3 Phase) । বিদ্যুৎ বিল হিসাব করার জন্য মূলত পাওয়ারকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। আমরা নির্দিষ্ট সময়ে কতটুকু পাওয়ার বা ক্ষমতা ব্যবহার করছি তার উপর ভিত্তি করে বিদ্যুৎ বিল হিসাব করি। পাওয়ারের একক ওয়াট এটাকে বড় করলে হয় কিলোওয়াট। এনার্জি মিটারের গায়ে কিলোওয়াট-ঘন্টা (KWH) লেখা থাকে আর এই কিলোওয়াট-ঘন্টা দিয়েই আমরা আমাদের বিদ্যুৎ বিল  হিসাব করি। বিদ্যূৎ বিল হিসাব করার সূত্র হলো:-  E= PxT ( P হলো ব্যবহৃত পাওয়ার এবং T হলো ব্যবহৃত সময় (ঘন্টা)। এখন WH কে KWH এ প্রকাশ করার জন্য 1000 দিয়ে ভাগ করতে হবে। এটিই হলো এনার্জি বা ইউনিট। উদাহরন- সিঙ্গেল ফেজ বিদ্যূৎ সরবরাহের একটি বাসায় ৬০ ওয়াটের একটি ভালব সংযুক্ত এবং ভালবটি প্রতিদিন গড়ে ১২ ঘন্টা চলে। এই বাসার এক মাসের বিদ্যুৎ বিল (E) বের করতে হবে ? আমরা জানি  E=PxT =60x12 =720WH। ইহাকে KWH এ প্রকাশ করার জন্য 1000 দিয়ে ভাগ করতে হবে। 720WH/1000 = 0.720 KWH বা ইউনিট। আবাসিক  গ্রাহকের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যূৎ এর বর্তমান মূল্য (প্রথম ধাপ 00 থেকে 75 ইউনিট, টাকা- 5.26) । অতএব বিদ্যূৎ বিল টাকা:- (0.72x5.26x30 days)=113.616 টাকা। ইহার সাথে মিনিমাম চার্জ, সার্ভিস চার্জ, ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া, ভ্যাট এইসব বিষয়গুলি যোগ করলে মোট বিদ্যূৎ বিল পাওয়া যাবে। 

বিদ্যূৎ বিল বেশি আসার কারনসমূহ- বৈদ্যূতিক লোড যত বেশি চলবে তত বেশি বিদ্যূৎ বিল আসবে এটাই স্বাভাবিক, তারপরও বিভিন্ন কারনে বেশি বিল আসতে পারে, যেমন-  

(১). নিম্ন মানের তার ব্যবহার করার ফলে ভোল্টেজ আপ/ডাউন এর কারনে বিদ্যূৎ বিল বেশি আসতে পারে। 

(২). বাসায় বা অফিসে ব্যবহৃত বৈদ্যূতিক লোডসমূহ নিম্ন মানের হলে বিদ্যূৎ বিল বেশি আসতে পারে। 

(৩). অত্যাধিক গরমের কারনে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বেড়ে যায়, যাহার দরুন বিদ্যূৎ এর ব্যবহারও বেড়ে যায়, যার কারনে বিদ্যূৎ বিলও বেড়ে যায়। 

(৪). সুইচ, রেগুলেটর, সকেট এর বিদ্যূৎ কানেকশন বা সংযোগ দূর্বল বা ল্যূজ থাকলে লো ভোল্টেজের সৃষ্টি করে ফলে বিদ্যূৎ বিল বেশি আসতে পারে। 

(৫). অপ্রয়োজনীয় লাইট, ফ্যান চালু থাকলে বিদ্যূৎ বিল বেশি আসবে। (৬). সাবষ্টেশন পুরাতন হলে বেশি বিল আসতে পারে।

বিদ্যূৎ বিল কমানোর উপায়সমূহ- আমরা যদি একটু সচেতনতার সহিত বিদ্যূৎ ব্যবহার করি তাহলে বিদ্যূৎ খরচ কম হবে এবং মাস শেষে বিদ্যূৎ বিল কম আসবে। বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে বিদ্যুৎ বিল  কমানো সম্ভব, যেমন- (১). প্রয়োজন ছাড়া লাইট, ফ্যান, টিভি, কম্পিউটার, ওয়াটার হিটার এবং এসির সুইচ অন রাখা যাবেনা।  প্রয়োজন শেষ হওয়ার সাথে সাথে বৈদ্যূতিক লোডের সুইচ বন্ধ রাখতে হবে। তাহলে বিদ্যূৎ বিল কম আসবে। (২).  মানসম্মত তার ব্যবহার করতে হবে। (৩). এনার্জি মিটারের ত্রুটির কারনে বিদ্যূৎ বিল বেশি আসতে পারে। মিটারে সিরিজে সংযুক্ত কারেন্ট কয়েলের কারনে সামান্য বিদ্যূৎ বিল যোগ হয়। (৪). বিদ্যূৎ সাশ্রয়ী লোড ব্যবহার করতে হবে। যেমন- এলইডি লাইট ব্যবহার করলে বিদ্যূৎ বিল কম আসবে। (৫). প্রচন্ড গরমে এসির তাপমাত্রা সঠিক নিয়মে রাখলে বিদ্যূৎ বিল কম আসবে। এসির তাপমাত্রা সাধারনত ২৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এ রাখতে হবে, এর নীচে রাখা যাবেনা। ইহা ছাড়াও কিছুক্ষন এসি ব্যবহারের পর এসি অফ করে ফ্যান চালানো যেতে পারে। নিয়মিত এসি সার্ভিসিং করতে হবে। ইনভার্টার টাইপ এসি ব্যবহার করলে বিল কম আসবে।  (৬). ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি যেমন- ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন এবং ওয়াটার হিটার সঠিকভাবে ব্যবহার করলে বিদ্যূৎ বিল কম আসবে। (৭). দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে এবং সে অনুযায়ী ঘরের বা রুমের ভিতর প্রয়োজনীয় আলো বাতাস ঢুকার ব্যবস্থা রাখতে হবে। যাহাতে লাইট, ফ্যান, এসি চালানো  কম প্রয়োজন পড়ে। (৮). বাসায় তাপ নিরোধক উপাদান বা জিনসিপত্র ব্যবহার করতে হবে। (৯). থ্রি-ফেইজ  গ্রাহকের ক্ষেত্রে পাওয়ার ফ্যাক্টর ইউনিটি রাখলে লাইন লস কম হয় ও বিদ্যূৎ বিল কম আসবে এবং জরিমানা গুনতে হবেনা। (১০).মিটার রিডারের বা রিডিং ভুলের কারনেও বিদ্যুৎ বিল বেশি আসতে পারে। বিদ্যূৎ বিল ব্যবহৃত ইউনিটের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধাপে মূল্যহার নির্ধাররিত।  যেমন:-0-50 ইউনিট পর্যন্ত 4.63 টাকা, 0-75 ইউনিট পর্যন্ত 5.26 টাকা, 76-200 ইউনিট পর্যন্ত 7.20 টাকা, 201-300 ইউনিট পর্যন্ত 7.59 টাকা, 301-400 ইউনিট পর্যন্ত 8.02 টাকা, 401-600 ইউনিট পর্যন্ত 12.67 টাকা নির্ধারিত। গ্রাহকের ব্যবহৃত ইউনিট দেখা গেলো 48 ইউনিট, কিন্তু  মিটার রিডারের বা রিডিং ভূলের কারনে বিলের গায়ে ব্যবহৃত ইউনিট আসলো  58 ইউনিট, তাহলে গ্রাহকের বিল  82.84 টাকা বেশি আসবে।


মো: এনামুল হক
সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম)
গণপূর্ত অধিদপ্তর                                                                                                 
 

Ads