পাহাড়ের নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রভাব

রোমিতা দেওয়ান

০৬ জুন ২০২৪, ০৬:২৪ পিএম


পাহাড়ের নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রভাব

 

বাংলাদেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পরিবর্তনের নান্দনিকতার পাশাপাশি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নিজেদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এই কারিকুলাম আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পরিবর্তন। যে পরিবর্তনের ফলে শিক্ষা পৌঁছাবে দেশের এক নতুন দিগন্তে। এই পরিবর্তন নিয়ে তিন পার্বত্যজেলায় পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মাঝে ও যুগপোযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা কতিপয় লোকের বিভ্রান্তি ছিল।  
 

বর্তমানে ভূল-ভ্রান্তি দূর করে পাহাড়ের অভিভাবকেরাও নতুন শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে আগ্রহ। তাদের সন্তানেরা জেনেছে বিজ্ঞান বিষয়ে বিজ্ঞানী হরিপদ কাপালী কিভাবে কৃষক হয়ে কৃষি বিজ্ঞানী প্রকৃতি থেকে শিখার জন্য মাঠে পর্যবেক্ষন ইত্যাদি পদ্ধতি। 
 

নতুন কারিকুলামে একমূখী শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা নির্ভর হবে জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ, আচরন এ চারটি স্তরে। পড়াশুনার পাশাপাশি পরীক্ষা থাকছে ঠিকই তবে গতানুগতিক ধারায় নয়, ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে। যাহাতে একজন শিক্ষার্থীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, দর্শন সমাজ বিজ্ঞান ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের দ্বারা দক্ষ হয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ পেয়ে থাকে। 
 

নতুন শিক্ষাক্রমের রূপরেখায় বলা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জিবীত দেশপ্রেমিক, উৎপাদনমূখী অভিযোজন সক্ষমমূখী ও বৈশ্বিক নাগরিক গড়ে তোলার লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের আনন্দময় পড়াশুনার পরিবেশ সৃষ্টি পাঠ্যপুস্তকের বোঝা কমিয়ে মুখস্থ নির্ভরতার পরিবর্তে কার্যক্রম ভিত্তিক অভিজ্ঞতার শিখনের অগ্রাধিকার প্রদান শিক্ষা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য। আমরা আধুনিক যুগে জীবন যাপন করছি এবং আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছি সেই যুগ সম্পর্কে সকলের ধারনা থাকতে হবে। তাহলে সে শিক্ষা হবে যুগোপযোগী শিক্ষা। 
 

এগুলো ছাড়াও খেলাধুলায় সুজনশীল কার্যক্রমের শিক্ষা প্রদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা ক্লাসের পাঠ ক্লাসেই শেষ করতে পারে। বাড়ির কাজ থেকে মুক্তি সেই ব্যবস্থাই রাখা হয়েছে এই নতুন শিক্ষা কারিকুলামে। ফলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা জীবন শেষে নিদিষ্ট সময়ে অর্জিত পারদর্শি তার প্রাপ্ত সনদে জীবন জীবিকার সুযোগ পাবে। উন্নত দেশের শিক্ষা পাবে আগের তুলনায় বেশি। 
 

যে কোন দেশের শিক্ষা কার্যক্রমের মৌলিক উদ্দেশ্যই থাকে মূলত ব্যক্তির মানবিক গুণাবলির সুস্থ বিকাশ যার মধ্য দিয়ে সে সমাজ রাষ্ট্র গঠনে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখতে পারে। এবারের শিক্ষাক্রম উন্নয়নে সর্বজনবিদিত দার্শনিক, ঐতিহাসিক, মনোবিজ্ঞান, বাস্তবসম্মতভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির প্রতি অগ্রাধিকার কথা বলা হচ্ছে। 
 

বিশ্বায়নের এই একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে পৃথিবীতে প্রবেশ করেছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদের প্রয়োজন বিশ্বের অন্যান্য দেশের ইতিবাচক পরিবর্তনকে আমলে নিয়ে নিজেদের ও সেভাবে তৈরি করা। তাই বিশ্বায়নের যুগে যোগ্যতার ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে হলে প্রয়োজন বৈশ্বিক নাগরিকত্বের ধারনাকে মাথায় রেখে নিজেদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারন করা। একটি রূপান্তরকামী শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন করা যা শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ, আচরন পরিবর্তন হয়ে একটি ন্যায় ও শান্তিপূর্ন পৃথিবী তৈরিতে অবদান রাখবে। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় মানধিকার, শান্তি, টেকসই উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক শিক্ষা ইত্যাদি হতে উপকরন সংগ্রহ করে। এখানে জীবনব্যাপী শিক্ষা অনুসরন করা হয় যা শৈশব হতে শুরু হয়ে সকল শিক্ষাস্তর জুড়ে চলমান থাকে এবং শিক্ষাক্রমের বাইরে বাড়তি জ্ঞানার্জন, অপ্রচলিত উভয় পদ্ধতিকেই সমান গুরুত্ব দেয় (ইউনেস্কো ২০১৫)। 
 

বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এ বৈশ্বিক নাগরিকত্বের মূল ধারনাসমূহ, মূল্যবোধ, ক্ষেত্র ও যোগ্যতাসমূহ সন্নিবেশিত হয়েছে। পৃথিবী বদলে যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে সময়। এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েই পথ চলতে হবে আমাদের আগামী প্রজন্মকে। সুতরাং পাহাড়ের শিক্ষার্থীরাও যেন আগামীর পথে চলতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে না পড়ে যায়, সেদিকে নজর দেওয়া আমাদের কর্তব্য। নতুন কারিকুলামে মূলত সেই পতন থেকে বাঁচানো প্রচেষ্টারই ইতিবাচক ফলশ্রুতি। কাজেই অযথা সমালোচনা না করে এটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহন করে এর ভেতরকার দুর্বলতাগুলো চিহ্নত করে একটি গ্রহনযোগ্য রূপরেখা প্রদানের চেষ্ঠা করাই সময়ের দাবি। বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে তার আপন গতিতে।
 

এ অবস্থায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা যদি পশ্চাৎপদ ও সেকেলে প্রাচীন আমলের তাহলে আমাদের অনাগত প্রজন্ম সময়োপযোগী ও যুগয়োপযোগী শিক্ষার দক্ষতা থেকে পিছিয়ে পড়বে। আমাদের আগামী প্রজন্মকে যদি আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ও বর্তমান সমাজ ভাবনার আলোকে ইতিহাস ও ঐতিহ্য সচেতন হিসেবে যদি গড়ে তুলতে পারি তাহলেই নতুন কারিকুলামের উদেশ্য সার্থক হবে।  

 

রোমিতা দেওয়ান
সিনিয়র সহকারি শিক্ষিকা (কৃষি)
ভাইবোনছড়া মিলেনিয়াম উচ্চ বিদ্যালয়
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা।

 

 

Ads