১৯৭১ সালের অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠনের প্রেক্ষাপট ও সেনা মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের ভূমিকা
২০ এপ্রিল ২০১৭, ১১:৪০ পিএম
বঙ্গবন্ধুর ৭ ই মার্চের ভাষণের পর দু’টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে যায়, যার জন্য বাংগালীরা যেমন প্রস্তুত ছিলনা, তেমনি পাকিস্তানীরাও প্রস্তুত ছিলনা। এ ঘটনার প্রথমটি হল- (১) ২৫ মার্চের দিনগত রাতে “অপারেশন সার্চলাইট” এর নামে পাকিস্তানীদের অতর্কিতে আক্রমন এবং দ্বিতীয়টি- (২) হল ১৯ মার্চ থেকে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে অবস্থানরত বাংগালী সৈনিকদের ইউনিট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার ও সৈনিকদের বিদ্রোহ ঘোষনা ও স্বপক্ষ ত্যাগ। বস্তুতঃপক্ষে এ দুটি বিশেষ ঘটনা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে নিশ্চিত সূচনাকেই নির্দেশ করে। বিদ্রোহ ও স্বপক্ষ ত্যাগের শাস্তি কি তা সামরিক অফিসার ও জোয়ানদের ভাল করেই জানা ছিল। স্বপক্ষ ত্যাগ করে তারা প্রতিবেশী দেশ ভারতে তাদের নূতন ক্যাম্প স্থাপন করল। তার মানে হয় স্বাধীনতা, না হয় ধরা পড়লে পাকিস্তানিদের হাতে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যু। তারা এমন একটি সিদ্ধান্তে নিয়েছিল, যাকে এক কথায় বলা হয় “পয়েন্ট অব নো রিটার্ন”।
সর্বমোট ৫টি ব্যাটালিয়ন বিদ্রোহ করেছিল। ব্যাটালিয়ানগুলো হল (১) ২ ইষ্ট বেঙ্গল, জয়দেবপুর (২) ৮ ইষ্ট বেঙ্গল, চট্টগ্রাম (৩) ৪ ইষ্ট বেঙ্গল, ব্রাহ্মমবাড়ীয়া (৪) ১ ইষ্ট বেঙ্গল, যশোর (৫) ৩ ইষ্ট বেঙ্গল, সৈয়দপুর। তাঁরা তো বিদ্রোহ করে বসল, কিন্তু এখন তারা কি করবেন? কেননা এই বিদ্রোহের খবর ভারতের রাজনীতিবীদ, ভারতীয় সীমান্তরক্ষি বাহিনী বিএসএফ কিংবা ভারতীয় সেনাবাহিনী, কেউই জানত না। তা হলে এখন উপায়? এদিকে বাংগালী সৈন্যদের বিদ্রোহের পূর্বেই আর একটি বেসামরিক বিদ্রোহ ও স্বপক্ষ ত্যাগের ঘটনাও ঘটে গেল। বাংলাদেশের ইতিহাসে যে বেসামরিক ব্যক্তিটি সর্বপ্রথম স্বপক্ষ ত্যাগ করেন তিনি হলেন তাজ উদ্দিন আহমদ। ২৫ মার্চের ভয়াবহ গণহত্যার পর তাজ উদ্দিন আহমদ নিজ বাসভবন ছেড়ে পালিয়ে যান। ৩০ মার্চ তিনি পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে পৌছান। তারপর ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ৩১ মার্চ মেহেরপুর সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন। ভারতে প্রবেশ করার প্রথমে তার সঙ্গে সাক্ষাত হয় বিএসএফ এর মহাপরিদর্শক গোলক মজুমদারের সঙ্গে। গোলক মজুমদারের কাছে সংবাদ পেয়ে ভারতীয় বিএসএফের মহাপরিচালক কে এফ রুস্তামজী তাজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে দেখা করেন। তাজ উদ্দিন রুস্তামজীকে সার্বিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বাংগালীদের স্বাধীনতা লাভের অদম্য স্পৃহা ব্যক্ত করেন।
তাহলে এখন পরিস্থিতি কেমন দাড়াল? পরিস্থিতি হল এরকম: (১) বাংগালীর স্বাধীনতা যুদ্ধ সর্ম্পকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী, ভারতীয় সেনাবাহিনী, কিংবা ভারতীয় রাজনীতিবিদ, কারোরই স্বচ্ছ ধারণা নেই। (২) তাজ উদ্দিন আহমেদ কি বলে নিজেকে পরিচয় দেবেন, যাতে তার উপর ভারতীয়দের আস্থা অর্জিত হয়? বঙ্গবন্ধুর ৭ ই মার্চের ভাষণে অনেক দিক নির্দেশনা থাকলেও তার অনুপস্থিতিতে কে দল, দেশের কিংবা মুক্তিযোদ্ধের হাল ধরবেন এমন ধারনা স্পষ্ট ছিলনা। (৩) বাংগালী সৈনিকরা তাদের নিজ নিজ অবস্থানে অবস্থান করছে, কিভাবে তাদের সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করা হবে? (৪) বিদ্রোহ সেনাদের সমর্থনে খোদ ভারতীয় সরকার থেকে নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত ভারতীয় সামরিক বাহিনী এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কিছুই করার নেই। সরকারের হুকুম ছাড়া মুক্তিসেনাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দেয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। এ কথা কে এফ রুস্তামজী তাজ উদ্দিনকে জানিয়ে দেন।
তাজ উদ্দিন ভাবলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সহিত সাক্ষাত অত্যন্ত জরুরী। এই সুবর্ণ সুযোগ আসে ০১ এপ্রিল। তাজ উদ্দিন আহমেদ ও ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলাম একটি পুরাতন সামরিক বিমানে করে দিল্লি পৌছান। সেখানে ০৩ দিন অবস্থান ও বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনার পর ০৩ এপ্রিল তাজ উদ্দিন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সহিত সাক্ষাত লাভ করেন। তাজ উদ্দিন কি হিসেবে ইন্দিরা গান্ধীর নিকট উপস্থাপন করবেন তা তিনি আগেই আলোচনা করতে চাইলেন। আর সে আলোচনায় ছিলেন এম আর সিদ্দিকি, সিরাজুল হক, আব্দুর রউফ, রেহমান ছোবহান, এবং আনিসুর রহমান। তাজ উদ্দিন নিজেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচয় না দিয়ে তিনি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী কে এ বলে বুঝাতে পেরেছিলেন যে, বঙ্গবন্ধুর গেফতারের পর এবং অন্যান্য কেবিনেট সদস্যদের ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার ফলে তিনিই এখন চলমান আন্দোলনের নেতা। তাছাড়া পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হওয়ার দুটি অকাট্য প্রমাণ তার কাছে ছিল যা তিনি প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধীর নিকট উপস্থাপন করতে পেরেছিলেন। তার প্রথমটি হল ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষনা। আর দ্বিতীয়টি হলো খোদ বাংলাদেশী সেনাদের বিদ্রোহ ও স্বপক্ষ ত্যাগ।
এদিকে দিল্লিতে ঘটে যাওয়া এতসব ঘটনা ত্রিপুরাতে অবস্থিত বিদ্রোহী সেনাদের নিকট না পৌছার ফলে তারা উৎকন্ঠায় কাটাতে থাকেন। এ যাত্রায়ও বিএসএফ প্রধান কে এফ রুস্তামজী এগিয়ে আসেন। পূবাঞ্চল সীমান্ত এলাকা বিশেষ নজরদারীতে আনতে তিনি বিগ্রেডিয়ার বিসি পান্ডে, কর্ণেল রামপাল সিংহ, কর্ণেল মেঘ সিংহ, এবং বিগ্রেডিয়ার এম এস চ্যাটার্জিকে দায়িত্ব প্রদান করেন।
বাংগালী সেনা অফিসারদের উৎকন্ঠা কিছুটা হলেও স্তিমিত হয় ১ এপ্রিল বিকালে যখন তারা দেখলেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একজন কর্মকর্তা সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলায় অবস্থিত তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার বাংলোয় ধীরপদে প্রবেশ করছেন। তিনি ছিলেন ১০৪ কমান্ডো ব্যাটালিয়ন এর কমান্ডিং অফিসার বিগ্রেডিয়ার বিসি পান্ডে, যার নাম আগেই উল্লেখ করেছি। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন লেঃ কর্ণেল এম এম রেজা এবং মেজর সাফাত জামিল। ঐ দিকে ২ এপ্রিল জেলারেল ওসমানি আগরতলা পৌছান। আর অন্য দিকে মেজর জিয়াউর রহমান অবস্থান করছিলেন রামগড়ে। বিগ্রেডিয়ার পান্ডের উদ্দেশ্য ছিল সকল বাংগালী সেনা অফিসারদের একত্রিত করা। তা-ই তিনি ৪ এপ্রিল আবার মিটিংয়ের তারিখ নির্ধারন করলেন।
তারপর আসল ৪ এপ্রিলের সেই মহাক্ষন। সে দিনের সেই ম্যানেজার বাংলোতে ৭২ জন দেশপ্রেমিক বিদ্রোহী অফিসার ঐ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে উল্লেখযোগ্য সিনিয়র সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন, কর্ণেল ওসমানি, লেঃ কর্ণেল আব্দুর রব, লেঃ কর্ণেল সালাহ উদ্দিন মোঃ রেজা, মেজর কাজি নুরুজ্জামান, মেজর সি আর দত্ত, মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর খালেদ মোশাররফ, ক্যাপ্টেন নাসির, মেজর নুরুল ইসলাম, মেজর সাফাত জামিল, মেজর মাইনুল হোসেন চৌধুরী, মেজর কে এম সফি উল্লাহ, লেঃ সৈয়দ ইব্রাহীম, কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী ও অন্যান্যরা। ৪ এপ্রিলের সেই মিটিংটি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে একটি ল্যান্ডমার্ক। এখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যা পরবর্তীতে অস্থায়ী সরকার গঠন করা থেকে শুরু করে গেরিলা যুদ্ধের সকল রুপরেখা প্রণয়ন করতে সাহায্য করে। এখানে যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল, সেগুলো হল (১) কিভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা হবে। (২) ভারতীয় বিএসএফ এর স্বাধীনতার যুদ্ধে সহায়তার রুপরেখা (৩) ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে রাজনৈতিক সরকার গঠনের রুপরেখা (৪) বাংলাদেশকে প্রাথমিকভাবে ৪ সেক্টরে ভাগ করা যেখানে মেজর জিয়াউর রহমানকে-১ নং সেক্টরে, মেজর খালেদ মোশাররফকে ২নং সেক্টরে, কে এম সফিউল্লাহকে ৩ নং সেক্টর এবং মেজর আবু ওসমান চৌধুরীকে ৪ নং সেক্টরে দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
এই মিটিংয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও তৎপরবর্তী সিদ্ধান্তটি ছিল রাজনৈতিক সরকার গঠন। আগেই বলেছি বাংগালী অফিসার ও সৈনিকরা যে অবস্থায় চলে গিয়েছিলেন সেটাকে বলা হয় “পয়েন্ট অব নো রিটার্ন” অর্থাৎ স্বাধীনতা ছিনিয়ে না নেওয়ার আর কোন বিকল্প নেই। তা-ই তাদের গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যেতেই হবে। আর তার জন্য দরকার একটি বৈধ সরকার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। একটি বৈধ ও স্বীকৃত সরকারের প্রয়োজন ছিল এ রকমঃ (১) মুক্তিযুদ্ধকে বৈধ করে নেয়া, যাতে করে পাকিস্থানি জান্তা এই যুদ্ধটিকে একটি বিদ্রোহ হিসেবে চিহ্নিত করতে না পারে। তা হলে তারাও যুদ্ধ করার বৈধতা পেয়ে যাবে (২) আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করা ও বিশ্ব বিবেককে বাংলাদেশের পক্ষে আদায়ের সকল ব্যবস্থা করা (৩) মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। (৪) শরনার্থীদের পুনর্সবাসনের ব্যবস্থা করা।
ঐ দিকে ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা তো দিয়েই দিয়েছেন। ৪ এপ্রিলের মিটিংএ সকল মুক্তিযোদ্ধা অফিসার একটি বৈধ সরকারের প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলেন। তারা এ বিষয়ে জেনারেল ওসমানির সহায়তা চান। তারপরই ১০ এপ্রিল তাজ উদ্দিনের নেতৃত্বে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মজিুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে সরকার ঘোষণা করা হয়। এতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম কে উপ-রাষ্ট্রপতি, তাজ উদ্দিনকে প্রধানমন্ত্রী, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে মন্ত্রীপরিষদের সদস্য নিয়োগ করা হয়। ১১ এপ্রিল এম এ জি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়। ১১ এপ্রিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাজ উদ্দিন এ সম্পর্কীয় ভাষণ প্রদান করেন।
তারপর ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ পূর্ব ঘোষণা মোতাবেক কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলায় এক আমবাগানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের জন্য শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজিত করা হয়। তারপর শুরু হয় সংগঠিত মুক্তিযুদ্ধ।
সুতরাং স্বাধীনতা সংগ্রামে একটি বৈধ অস্থায়ী সরকার গঠনে বাংগালী সেনা মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের ভূমিকা ছিল অপ্রতিম যা মোটেই অস্বীকার করা যাবে না। আজ স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সেই অকুতোভয় সেনা কর্মকর্তারা রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত, যা মোটেই কাম্য ছিলনা। ১৯৭১ সালে সেনা কর্মকর্তারা যদি বিদ্রোহ না করত কিংবা তাজ উদ্দিনের মত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ভারতে গিয়ে যদি স্বাধীনতার জন্য ধর্না না দিত তাহলে ইতিহাস কি হতো তার বিচার আমি সম্মানিত পাঠকদের কাছে ছেড়ে দিলাম।
লেখকঃ আর্মি ইন্সটিটিউট অব বিজনেস এ্যাডমিনিষ্ট্রেশনে কর্মরত।
বিঃ দ্রঃ এই বিভাগের লেখা সম্পূর্ণ লেখকের মতামত























