মাই ফাদার ইজ এ গভর্নম্যান্ট এমপ্লয়ার

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

১২ এপ্রিল ২০১৭, ১১:২৯ পিএম


মাই ফাদার ইজ এ গভর্নম্যান্ট এমপ্লয়ার

আর্থার রবার্ট অ্যাশ (১৯৪৩-১৯৯৩) নামক যুক্তরাষ্ট্রের একজন সফল প্রফেশনাল টেনিস খেলোয়ারের মতে“সফলতার একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয় হল আত্মবিশ্বাস আর আত্মবিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল প্রস্তুতি। আমাদের ইন্সটিটিউটে চাকুরীর ইন্টারভিউ দেয়াকালীন একজন চাকুরী প্রার্থীকে ইংরেজীতে প্রশ্ন করা হয়েছিল ইন্ট্রোডিউস ইউরসেল্ফ ”মানে“ আপনার সম্পর্কে কিছু বলুন বা আপনার পরিচিতি দিন। উত্তরের একপর্যায়ে ঐ প্রার্থী বলেছিলেন“মাইফাদার ইজ এ গভর্নম্যান্ট এমপ্লয়ার। প্রায় প্রতিটি ইন্টারভিউতেই এটা একটি কমন প্রশ্ন। কিন্তু অনেক প্রার্থীই এমন সাধারন একটি প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত থাকেন না। ইন্টারভিউ বোর্ডের সভাপতি এরপর তাকে পুনরায় প্রশ্ন করেন“এমপ্লয়ী এবং এমপ্লয়ারের মধ্যে পার্থক্য কি? এ উত্তর দিতেও তিনি আমতা আমতা করছিলেন। প্রসঙ্গত তিনি স্থানীয় একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১২ সালে ইংরেজী সাহিত্যে এম.এ পাশ করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে আমি সিলেট অঞ্চলে অবস্থিত একজন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের একজন অধ্যাপককে প্রশ্ন করে ছিলাম। উত্তরে তিনি বলে ছিলেন“আমরা ইংরেজীর মাষ্টার্স কোর্সে ইংরেজদের ইতিহাস এবং ইংরেজী সাহিত্যের ইতিহাসই যেন একটু বেশী পড়াই, ইংরেজী ভাষা নয়, আর সে কারনেই ইংরেজী ভাষার উপর ছাত্রদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জিত হয় না।”

হালে বাংলাদেশে লেখা পড়ার ধরন এমনই পরিবর্তন হয়েছে যে বাংলা কিংবা ইংরেজি কোন সাহিত্যের উপরই তেমন জোর দেয়া হয় না। গুরুজনেরা বলেন ফাউনন্ডেশন কোর্স গুলোতেই ভাষা শিখার উপযুক্ত সময়। অর্থাৎ এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ে ভাষা সাহিত্যের উপর বিশেষ খেয়াল না রাখার ফলে এমনটি হচ্ছে। তাছাড়া ইন্টারভিউতে অনেক প্রার্থীই প্রস্তুতি নিয়ে আসেন না কিংবা প্রস্তুতি নেয়ার প্রয়োজন অনুভব করেননা। তারা বিশ্ব বিদ্যালয়ের নামের উপর কিংবা মামার জোরেচাকুরী পেতেই বেশী আগ্রহী।

একটি পরিসংখ্যানে আসা যাক। আমাদের প্রতিষ্ঠানে সেকশন অফিসার পদে সর্বমোট দরখাস্ত করে ছিলেন ১৭ জন। তন্মধ্যে ১২ জনই ছিলেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারী কলেজ থেকে পাশ করা, আর বাকী ০৫ জন ছিলেন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। যে প্রার্থীটি শেষ পর্যন্তটিকে ছিলেন তিনি ছিলেন ঢাকার একটি স্বনামধন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সুতরাং প্রতিষ্ঠানটি কি, কোথায় এবং কত বড় সেটা বড় কথা নয়, একজন প্রার্থী ইন্টারভিউ বোর্ডর সামনে নিজেকে কিভাবে উপস্থাপন করছেন এবং তার কমিউনিকেশন স্কিল কতটা ধারালো সেটাই বড় কথা। এ ক্ষেত্রে ইংরেজী ভাষার উপর দখলের তারতম্য একজন প্রার্থীর ভাগ্যকে বদলেদিতে পারে। আমরা প্রায়শঃই প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত প্রার্থীদেরকেই বেশি কদর দিয়ে থাকি। কেননা এসব বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে টপ গ্রেডের ছাত্ররাই চান্স পেয়ে থাকে। কিন্তু আশচর্য হলেও সত্যি যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কলেজ থেকে আগত অনেক প্রার্থীর পারফরমেন্স ছিল সত্যিই হতাশা ব্যাঞ্জক। কি সে কারন? আশা করি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা ভেবে দেখবেন।

ইংরেজীতে মাস্টার্স করেও শুদ্ধ ভাবে ইংরেজীতে একটি বাক্য বলতে নাপারা ছিল দেখা ও ভাববার মত বিষয়। আমি আমার আরও একটি লেখায় বলেছিলাম ইংরেজি একটি সমৃদ্ধশালী ভাষা। আর তাই যিনি ইংরেজিতে ভাল, তিনি তাঁর মাতৃভাষাতেও ভাল। আমি ১৯৭৮ সালে এইচএসসি পাশ করি। বাংলাদেশে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত এইচএসসিতে ইংরেজী মিডিয়াম বাধ্যতামূলক ছিল। তারপর থেকে বাংলা মিডিয়াম প্রবর্তিত হয়। এমনকি ১৯৯০ সালের দিকে কোন একটি সরকার স্নাতক থেকে ইংরেজী একে বারেই তুলে দেন। তা কখনও সঠিক সিদ্ধান্ত ছিলনা  বলে আমি মনে করি। আমাদের কথা হলো বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। তা আমাদের জানতেই হবে। আর আন্তর্জাতিক ভাষা হিসাবে পাশাপাশি আমাদের ইংরেজীও সমানভাবে জানতে হবে। একজন সেনাকর্মকর্তার জন্য ইংরেজী শিখার মোক্ষম স্থান হল বাংলাদেশ মিলিটারী একাডেমি বা বিএমএ। আমরা যখন বিএমএ তে যাই তখন আমাদের ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন মেজর বশির। তাঁর কাছ থেকে সর্ব প্রথম নতুন যে শব্দটি শুনলাম তাহলো“ফনেটিক্স”।  শক্ত প্রশিক্ষন ও শাস্তির ঝাঁতাকলে শ্রেনী কক্ষে ঘুমের ঘোরে অনেক ফনেটিক্সই আমাদের মাথার উপরদিয়ে চলে যেত। একদিন বশির স্যার ক্লাসের সময় বললেন ইট ইজ নট এশিয়া, বাট এই শা”। আমরা তো থ। বলেনকি! ফনেটিক্স এর যন্ত্রনায় প্রায় সময়ই আমাদের“লংআর্ম” (দেয়ালের সংগে উপরে পা নিচে মাথা) হয়ে থাকতে হত। সেখানেও ঘুম। কথায় বলে জিসি (Gentleman Cadet ) রা ঘোড়ার মত দাড়িয়েও ঘুমাতেপারে। আমার কোর্সমেট জিসি খাঁন (পুরো নাম নয়) ফনেটিক্স শিখার একটি সহজ উপায় বের করেছিলেন। তাঁর মতে কোন শব্দের শেষ অক্ষর ইংরেজি“আর”বাদ দিয়ে উচ্চারণ করলেই ফনেটিক্স হয়ে যাবে। উদাহরণ স্বরুপ“মেসওয়েটার” কে বলতেহবে“মেসওয়েটা”, আর“বাটার” (পনির) কে বলতে হবে“বাটা”। সত্যি বলতে কি তাতে কিছুটা হলেও কাজ হয়েছিল। চাকুরী কালীন ভুল ইংরেজী বললে আমাদের সিনিয়র গন একটি কথা বলতেন, যা আমি সেদিন আমার ফেসবুকে পেয়েছি। ষ্ট্যাটাসটি ছিল এরকম, প্রতিশোধ নিলাম। ইংরেজদের ২০০ বছর শাসনের বদলা আমি ৩ ঘন্টায় নিয়েছি। ইংরেজি পরীক্ষায় সব বাংলা লিখে এসেছি।

          আজ কাল চাকুরী ক্ষেত্রে যে কথাটি বেশী প্রচলিত সেটি হল“চাকুরী প্রার্থীরা চাকুরী পায়না, আর চাকুরী দাতা প্রার্থী খুজে পায়না”। তাহলে গ্যাপটি কোথায়? উত্তর একটাই উপযুক্ত প্রার্থীর”বড় অভাব। তাহলে কি উপায়ে নিজেকে কোন একটি চাকুরীর জন্য উপযুক্ত করতে হবে সে উত্তরই চাকুরী প্রার্থীদের খুজতে হবে এবং সে অনুযায়ী চর্চা করতে হবে।

সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহনের পর আমি যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করেছি সে সব প্রতিষ্ঠানের প্রায় সব কটিতেই আমি ইন্টারভিউ বোর্ডের সদস্য ছিলাম। সে অভিজ্ঞতার আলোকেই কিছু কথা বলেছি। প্রথমত: কোন একটি অফিসার পদে চাকুরির জন্য আপনাকে অবশ্যই শুদ্ধ ভাবে ইংরেজী বলতে হবে। এক্ষেত্রে কিছু প্রস্তুতি আপনাকে অবশ্যই নিতে হবে। এখনই ইংরেজি বলার অভ্যাস করুন। কিছু বুঝুন আর না বুঝুন ইংরেজী পত্রিকা পড়াশুরু করুন। ইংরেজী খবর বিশেষত: বিবিসি নিয়মিত শোনা শুরু করুন। বন্ধু-বান্ধবের সাথে ইংরেজিতে কথা বলার চেষ্টা করুন। ফেইসবুকে সব উত্তর ইংরেজিতে দেয়ার অভ্যাস করুন। কেননা ইংরেজি পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারে। দ্বিতীয়ত: মাথা থেকে পা পর্যন্ত নিজের সৌন্দর্য ও পোশাকের প্রতি খেয়াল রাখুন। স্যান্ডেল পড়ে আসলে অফিসার পদে চাকুরী পাওয়া যায়না। তৃতীয়ত: নিজের পান্ডিত্য ও পরিবার পরিচিতি জাহির করবেননা। এতে হিতে বিপরিত হবে। চতুর্থত: যা প্রশ্ন করা হবে তারই সংক্ষিপ্ত ও বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর দিন। কোন একজন প্রার্থীকে ইংরেজীতে প্রশ্ন করা হলে, তিনি বলেছিলেন, আমি কি বাংলায় উত্তর  দিতে পারি?”এমনটি যেন না হয়।

লেখক: মেজর- তারিকুল ইসলাম মজুমদার, পিএসসিজি (অবঃ) বর্তমানে আর্মি ইন্সটিটিউট অব বিজনেস এ্যাডমিনিষ্ট্রেশন, সিলেটে কর্মরত।

 

Ads