ডা. মোজাহেরুল হক এর বাংলাদেশের চিকিৎসকদের নিয়ে খোলামেলা বক্তব্য
০২ নভেম্বর ২০১৬, ০১:২০ এএম
১৯৬৫-৭০ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে সরকারি চাকরিতে বিভিন্ন চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস থেকে প্রথম স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। পড়াশোনা করেন লন্ডন হসপিটাল মেডিকেল কলেজ ও পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের ড্যান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেন্টার ফর মেডিকেল এডুকেশন ও জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ছিলেন তিনি। ২০১১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিজিওনাল অ্যাডভাইজার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে ইউনেস্কোর মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে এথিকস বিষয়ে পড়াচ্ছেন এবং ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিকেল এডুকেশনের সিনিয়র অ্যাডভাইজার হিসেবে কর্মরত। সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশে চিকিৎসা সেবার মান, চিকিৎসা শিক্ষা, চিকিৎসায় বিদ্যমান অনিয়ম, চিকিৎসা ব্যয় প্রভৃতি নিয়ে কথা বলেছেন।
এখন প্রচুর রোগী বাইরে যাচ্ছেন। এ প্রবণতাকে কীভাবে দেখেন?
রোগীরা কেন বাইরে যাচ্ছে এর উত্তর খুঁজতে হবে সর্বাগ্রে। দেশে চিকিৎসা সেবায় সন্তুষ্ট হলে তো বিদেশে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। যেমন— ঢাকায় ভালো চিকিৎসা পাওয়া গেলে কেউ কি সিলেট, রাজশাহী, চট্টগ্রাম কিংবা দিনাজপুর যাবেন? নিশ্চয়ই না। যেখানেই ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায়, মানুষ সেখানেই যাবে। কারণ এটি সুস্থতা ছাড়াও জীবন-মরণের প্রশ্ন। চিকিৎসা নিতে রোগীরা কখনো টাকা-পয়সা ব্যয় নিয়ে চিন্তা করেন না। কোথায় ভালো চিকিৎসা পাবেন, সেটাই তাদের বিবেচ্য। মানুষ সুস্থ থাকতে চায়, সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকতে চায়।
দেখতে হবে বাংলাদেশী রোগীরা কেন ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বা অন্যান্য দেশে যাচ্ছেন। সাধারণের একটা ধারণা যে, তারা দেশে সুচিকিৎসা পাচ্ছে না। এর কারণ হিসেবে অনেক সময় আমরা মনে করি, চিকিৎসকরা হয়তো সুচিকিৎসা দিচ্ছেন না। এখানে চিকিৎসকের সঙ্গে রোগীর একটা সম্পর্কের ব্যাপার আছে। চিকিৎসকের লক্ষ্য সবসময় হওয়া উচিত রোগীর সন্তুষ্টি অর্জন। সন্তুষ্টি অর্জনের ক্ষেত্রে শুধু রোগমুক্তি নয়, চিকিৎসকের আচার-ব্যবহার-নৈতিকতা সব বিষয়ই যুক্ত। অনেক সময় রোগীরা বলেই থাকেন, চিকিৎসক একটু ভালো কথা বললে, সহমর্মী হলে, তারা অনেক ভালো অনুভব করেন। এটা মানসিক শক্তিও বৃদ্ধি করে; রোগীর রোগমুক্তিরও জন্য সহায়ক। নিঃসন্দেহে সেবার একটা অংশ এটি। এ জায়গায় দেশের রোগীদের একটা ধারণা যে, বাংলাদেশের চিকিৎসকরা সময় দেন না রোগীদের। তাদের কথা শোনেন না। দ্বিতীয়ত. মনে করেন যে, চিকিৎসকদের ব্যবহার আশানুরূপ নয়। ইদানীং চিকিৎসকদের অনেক দোষত্রুটি ধরা পড়ছে। যেমন— অনেক চিকিৎসক ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে কমিশন নেন, ওষুধ কোম্পানি থেকে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নেন তাদের ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে লেখার বিনিময়ে। এগুলো কিন্তু নৈতিকতার প্রশ্ন। চিকিৎসা শিক্ষায় আমাদের চিকিৎসকদের নৈতিকতা শেখানো, বিহেভিয়েরেল সায়েন্স বা কীভাবে রোগীর সঙ্গে আচরণ করবে এবং কমিউনিকেশন স্কিল অর্থাত্ রোগীর সঙ্গে কীভাবে কথোপকথন করতে হবে— এ তিনটি বিষয় থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু আমাদের প্রশিক্ষণে আলোচ্য বিষয়গুলো অনুপস্থিত। এর প্রভাব পড়ে রোগীর সন্তুষ্টির ওপর।
চিকিৎসা সেবার মান উন্নত করলে কি রোগীদের বিদেশ যাওয়া কমবে?
সন্দেহ নেই, আমাদের চিকিৎসা সেবার মান উন্নত করতে হলে প্রশিক্ষণের মান উন্নত করতে হবে। এর সঙ্গে চিকিৎসকদের কথোপকথন দক্ষতা বাড়ানো, রোগীর প্রতি সহমর্মিতা ও ভালো আচরণ এবং পর্যাপ্ত সময় দেয়ার বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসককেও নৈতিক হতে হবে। চিকিৎসক যেন শ্রদ্ধার পাত্র হন। এ ক্ষেত্রগুলোয় নজর দিলে রোগীদের চিকিৎসকদের প্রতি আস্থা ফিরে আসবে। আস্থা ফিরে এলে রোগী আমাদের দেশের চিকিৎসকদের কাছেই যাবে। প্রথমে আমাদের চিকিৎসা শিক্ষার মানটা উন্নত করতে হবে, যাতে চিকিৎসকরা দক্ষ ও মানবিক হন এবং সুচিকিৎসা দিতে পারেন। পরবর্তীতে বর্তমান কারিকুলামে বা প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে পরিবর্তন আনতে হবে বর্ণিত তিনটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ রেখে। এটি শুরু করলে এমন দিন আসবে— আমাদের দেশের রোগীরা দেশেই চিকিৎসা নেবে। আমাদের রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিলে আমাদের চিকিৎসকদের ভালো বলবে, চিকিৎসা সেবার মান ভালো বলবে। যখন আমরাই আমাদের চিকিৎসা সেবার মান, যত্নের মান, চিকিৎসকদের দক্ষতা, তাদের ব্যবহার ভালো বলব, তখন এটা প্রচার পাবে। এই প্রচার বিদেশে যাওয়া মানুষের মাধ্যমে বাইরে গেলে বিদেশীরা বাংলাদেশের প্রতি আকৃষ্ট হবে। তখন আমাদের এখানে বিদেশ থেকে চিকিৎসা নেয়ার জন্য মানুষ আসবে। সুতরাং এ বিষয়ে আমাদের লক্ষ রাখা জরুরি।
চিকিৎসা সেবার মান উন্নত হচ্ছে না কেন?
কথায় আছে, একটা খারাপ ব্যবস্থা ভালো মানুষকেও খারাপ করে দেয়। প্রধান সমস্যা হলো, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি)। চিকিৎসা শিক্ষা এবং সেবার মান দেখার দায়িত্ব বিএমডিসির। এখন তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে কিনা, সেটা এক বড় প্রশ্ন। তারা তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করলে আমাদের চিকিৎসা শিক্ষা ও সেবার মানও উন্নত থাকত। কারণ দুটিই দেখার দায়িত্ব তাদের। বিএমডিসি হলো একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এর সম্পূর্ণ স্বাধীনতা আছে এগুলো করার। এটি একটা দিক। আরেকটি হলো, চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা হাসপাতালগুলোর সেবার মান বাড়ানোয় সরকারেরও একটা দায়িত্ব আছে। মানুষের একটা মৌলিক অধিকার হলো বেঁচে থাকার অধিকার। স্বাস্থ্যটাও আমাদের মানবাধিকার। আমাদের জীবন ও সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এটাকে সেভাবে দেখলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সরকারের অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে হবে। যেমন— একটা হাসপাতাল খুলতে গেলে যেসব নির্দিষ্ট মান বা স্ট্যান্ডার্ড নিশ্চিত করা দরকার, সেগুলো ঠিকভাবে পরিপালন হচ্ছে কিনা, তা সরকারকে দেখতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য— প্রচুর হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে, যেগুলোর নিবন্ধনই নেই। মাঝে মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেট গিয়ে কিছু জরিমানা করেন। এটা তো সমাধান নয়। এটির তদারকির দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের। যখনই নতুন হাসপাতাল চালু করা হয়, তখনই সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্টরা পর্যবেক্ষণে যান এবং দেখেন সবকিছু ঠিক আছে কিনা। জনগণ দেখবে, যেকোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকের রিসিপশনে সরকারের সীলমারা নিবন্ধন সার্টিফিকেট আছে কিনা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, প্রচুর হাসপাতাল আছে, যেখানে এ সার্টিফিকেট নেই। সরকারের মনিটরিং সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করছে না। চিকিৎসা সেবা দেখার দায়িত্ব দুটি প্রতিষ্ঠানের— এক. বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) এবং দুই. সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। আবার চিকিৎসা শিক্ষা দেখার জন্য আছে বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। তাদের কাজ হলো, যেসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক তৈরি হয়, সেসব প্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য উপযুক্ত কিনা তা যাচাই করা। এটাও বিএমডিসি, ইউজিসি এবং সর্বোপরি সরকারের দেখার দায়িত্ব। এদের চোখ এড়িয়ে কী করে বাংলাদেশে এমন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থাকছে, যারা মেডিকেল কাউন্সিলের মানদণ্ড মানছে না, সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত মান রক্ষা করছে না বা ইউজিসির নির্ধারিত মানও রক্ষা করছে না! তার পরও তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। মেডিকেল কলেজগুলোয় শিক্ষকস্বল্পতা সর্বজনবিদিত। একটা মেডিকেল কলেজে যখন একটি বিষয়ে দশজন শিক্ষক থাকার কথা, সেখানে থাকছে দুজন। আবার তাদের মধ্যেও অনেকে শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন নন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ উপকরণও নেই এবং সেগুলো ছাড়াই যদি মেডিকেল কলেজগুলো চলে, তখন ভবিষ্যত্ ডাক্তারদের মান প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এটা কিন্তু সবাই জানে, সবাই দেখেও। ছাত্ররাও সবাই জানে যে, মেডিকেল কলেজের প্রশিক্ষণ মান কোন পর্যায়ে, শিক্ষকরা আরো ভালো জানেন। আবার মেডিকেল কলেজগুলো যারা চালাচ্ছেন, তারাও জানেন। আশ্চর্য হবেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজেও শিক্ষকস্বল্পতা আছে। মেডিকেল কাউন্সিলের নির্ধারিত মান এ প্রতিষ্ঠানও পূরণ করে না। সরকারের একটা প্রধান মেডিকেল কলেজে শিক্ষকস্বল্পতা থাকলে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর অবস্থা কী, তা সহজেই অনুমেয়।
মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা ও তা পরিচালনায় নির্ধারিত মান আছে কী?
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল এক্ষেত্রে মানদণ্ড ঠিক করে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নির্দিষ্ট করে দিয়েছে কতজন ছাত্রের জন্য কতজন রোগীর বেড থাকবে, কতজন শিক্ষক থাকবে। কিন্তু খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, নির্ধারিত মান আর বিদ্যমান মানের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। এ বিষয়গুলো যত দিন ঠিক করতে না পারব, তত দিন আমাদের উন্নতি হবে না। প্রথমত. প্রশিক্ষণের মান ঠিক করতে হবে। প্রশিক্ষণের মান উন্নত হলে সেবার মানও উন্নত হবে। যে চিকিৎসক প্রকৃত প্রশিক্ষণ পাননি, তার কাছ থেকে রোগী প্রকৃত সেবা পাবেন কীভাবে? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মেডিকেল কাউন্সিল বা বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টরা সঠিক দায়িত্ব পালন করছেন না। তারা কি সমাজের কাছে দায়বদ্ধ নয়? তাদের কি সামাজিক দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহিতা নেই? নিশ্চয় আছে। কিন্তু তারা তা পালন করছেন না। রাষ্ট্রও নিজের দায়িত্ব পালন করছে না। বর্তমানে দেশে চিকিৎসা শিক্ষা ও সেবার মান সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। আমরা যদি এখনই চিকিৎসা সেবা ও চিকিৎসা শিক্ষার হাল না ধরি, প্রশিক্ষণ ও সেবার মান উন্নত না করি, তবে পুরো জাতিই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকবে।
বাংলাদেশে চিকিৎসা সেবা পাওয়ার সুযোগ-সুবিধা কেমন দেখেন?
লক্ষণীয় বিষয় হলো, সরকারিভাবে দেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ খুব কম। আমাদের স্বাস্থ্য বাজেট সার্ক বা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সবার চেয়ে কম। আবার এর একটা বিরাট অংশ ব্যয়িত হয় অবকাঠামো নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে। অবাক হবেন, এ জায়গায় দুর্নীতিও হয় সবচেয়ে বেশি। যে জিনিসে দুর্নীতির সুযোগ থাকে, সেখানে দুর্নীতিপরায়ণরা উৎসাহিত হবেন। সুতরাং এখানে যখন কোনো কনস্ট্রাকশনের ব্যাপার আসে, তখন সেখানে বেশি করে টাকা বরাদ্দ রাখে সরকার; উপরন্তু থাকে দুর্নীতির সুযোগ। বড় বড় যন্ত্রপাতি কেনার ব্যাপারেও সরকার উৎসাহী থাকে। ব্যবস্থাপনায় বেশি টাকা ব্যয় করায় স্বাস্থ্যসেবায় আমরা যে বরাদ্দ পাই, সেটা সংকুচিত হয়ে আসে। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের জনগণের ভালো চিকিৎসা বা মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ সীমিত।
চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কিনলেও তা চালানোর মতো লোকবল আছে কি?
আমরা বিরাট অংকের যন্ত্রপাতি কিনছি নিয়মিত। সেগুলো চালানোর লোক আছে কিনা, সেগুলো কার্যোপযোগী আছে কিনা, তা খুব একটা দেখা হয় না। যেমন— অনেক উপজেলায় একটা এক্স-রে মেশিন দেয়া হয়েছে কিন্তু সেটি খারাপ হয়ে আছে। একটি অ্যাম্বুলেন্স দিয়েছে সরকার, সেটি এখন খারাপ। এসব মেরামতের কোনো বাজেট নেই। হয়তো দেখা যাবে, এক্স-রে মেশিন আছে, কিন্তু কোনো রেডিওগ্রাফার নেই। মনে রাখতে হবে, বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর স্বাস্থ্য অবকাঠামো বাংলাদেশে। আমাদের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্য অবকাঠামো চলে গেছে। প্রতি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। আমাদের ইউনিয়ন সাব-সেন্টার আছে। তার পর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আছে। তার পর জেলা সদর হাসপাতাল। বিভাগে বিভাগে বড় বড় হাসপাতাল আছে। তার পর আছে বিশ্ববিদ্যালয়। এত সুন্দর অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও রোগীরা বিদেশ যাচ্ছে চিকিৎসার জন্য। বিশ্বের কোথাও উপজেলা পর্যায়ে ২১-৩৫ জন চিকিৎসক নেই। স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের বিরাট অংশ ব্যয় হয় কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে। দ্বিতীয় বড় অংশ যাচ্ছে অবকাঠামো নির্মাণে। তৃতীয় বড় অংশ যাচ্ছে যন্ত্রপাতি ও ওষুধ ক্রয়ে। সমীক্ষা বা গবেষণা হওয়া উচিত সঠিকভাবে স্বাস্থ্য বাজেট বা বরাদ্দ ব্যয়িত হচ্ছে কিনা। সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ফাংশনাল (কার্যকর) সেবা উপযোগী করতে হবে। সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক থাকবেন, যন্ত্রপাতি থাকবে এবং সব সুযোগ-সুবিধা থাকবে, যাতে একজনকে জেলা পর্যায়ে আসতে না হয় বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আসতে না হয়। যাকে উপজেলা কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া সম্ভব নয়, তাকে রেফার করতে হবে উপযুক্ত হাসপাতালটিতে, সেটা জেলা হাসপাতাল বা বিশেষায়িত হাসপাতাল। এটাকে বলা হয় রেফারেল সিস্টেম। আমাদের দেশে এমন রেফারেল সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে— গ্রামের অসুস্থ কৃষকটিও যেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) আসতে পারেন। এই রেফারেল সিস্টেমটা বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ফাংশনাল করা এবং একটা রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলা— এই দুটি কাজ করতে পারলে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যয় অনেক কমে যাবে। সরকার বেশির ভাগ প্রকিউরমেন্ট বা ক্রয় করে জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে। দেখবেন, ঢাকাকেন্দ্রিক ক্রয় সবচেয়ে বেশি। সাধারণ রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত না করে অল্প কিছু রোগীর জন্য সিটিস্ক্যান, এমআরআই প্রভৃতি যন্ত্রপাতি কেনা হয়। ইদানীং এগুলোর অনেক অপব্যবহারও হচ্ছে। আগে যখন এসব মেশিন ছিল না, তখন শুধু এক্স-রের মাধ্যমে আমরা অনেক রোগ নির্ণয় করতাম। এখন কমিশনের লোভে অনেক চিকিৎসক সিটিস্ক্যান করছেন, এমআরআই করাচ্ছেন। এটা বেশির ভাগ রোগীরই একটি বদ্ধ ধারণা। এতে চিকিৎসকদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে এবং রোগীদের আস্থা কমছে।
চিকিৎসকরা ব্যবস্থাপত্রে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লেখেন। এটাকে কীভাবে দেখেন?
সঠিক রোগ নির্ণয় (ডায়াগনসিস) করতে পারলে ওষুধ সীমিত হয়ে যাবে। আর রোগ নির্ণয়ে সংশয় থাকলে ওষুধের পরিমাণ বেশি হবে। রোগ নির্ণয়ের অনিশ্চয়তা থাকছে বলে রোগীকে ওষুধ বেশি দেয়া হচ্ছে, এটা একটা কারণ। দ্বিতীয় কারণ হলো, অপ্রয়োজনেও কিছু ওষুধ চিকিৎসকরা লেখেন। অনেক সময় ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক বা অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নেয়ার জন্য চিকিৎসকরা এটা করেন। তবে সব চিকিৎসকের বেলায় এ অভিযোগ আনা যাবে না।
প্রভিশনাল ডায়াগনসিস, পরীক্ষায় প্রাপ্ত বিষয় এবং রোগীর ইতিহাস— এ তিনটা বিষয় লিখতে চিকিৎসকদের উৎসাহ বা বাধ্য করা উচিত।
অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেও ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায় না, কেন?
মনে রাখতে হবে, বেসরকারি হোক বা সরকারি মেডিকেল হাসপাতাল হোক, সেখানে চিকিৎসা সেবার মান একই হতে হবে। চিকিৎসা ব্যয় বেসরকারিতে বেশি হতেই পারে। দেশের সব মানুষের চিকিৎসা সেবার মান নিশ্চিত করতে হলে চিকিৎসকদের মানও একই মানে রাখতে হবে। এজন্য বিএমডিসি ও সরকারকে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের কাজটাই হবে মানসম্পন্ন চিকিৎসা শিক্ষা এবং চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত হচ্ছে কিনা, তা তদারক করা। বিএমডিসি ও সরকার এ দুটো বিষয় নিশ্চিত করতে আন্তরিক হতে পারলে বাংলাদেশে চিকিৎসা সেবার মান ভালো হতে বাধ্য।
আইনের কোনো সীমাবদ্ধতা আমাদের দেশে নেই। কিন্তু আইনের সঠিক প্রয়োগ নেই। এটি সরকারের বড় ব্যর্থতা।
চিকিৎসা ব্যয় সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
আশপাশের দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের দেশে চিকিৎসা ব্যয় প্রায় একই রকম বা কম। দেখতে হবে, চিকিৎসা কোথায় নিচ্ছি। এ্যাপোলেতে গেলে ব্যয় এক রকম, সরকারি হাসপাতালে এক রকম, আবার অন্য হাসপাতালে গেলে আরেক রকম। বলা যায়, একই সেবার জন্য হাসপাতালভেদে আমাদের এখানে চিকিৎসা ব্যয় তিন বা চার স্তরের। তবে এ বিষয়গুলো আইন করে ঠিক করে দেয়া উচিত যে, কোনো সেবা নিতে কত টাকা লাগবে। পাশাপাশি আবার সেবাগুলোর মানও ঠিক করে দিতে হবে। যেমন— দেখতে হবে একটি সিজার করতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, জেলা হাসপাতালে এবং বিএসএমএমইউতে ন্যূনতম কত টাকা লাগে? আবার ঠিক করা থাকবে বেসরকারি হাসপাতালে সিজার করতে কত টাকা লাগবে। সেগুলো অনুমোদন দেয়া থেকে শুরু করে তদারক করে সরকার। কিন্তু চিকিৎসা সেবায় মান (সরকারি-বেসরকারি) একইভাবে নির্দিষ্ট থাকবে। তখন কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা হলে সরকারি হাসপাতালে যাবে, ইচ্ছা হলে বেসরকারি হাসপাতালে যাবে। পরিতাপের বিষয়, বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয় মেটানোর জন্য ৬৪ লাখ লোক দরিদ্র হয়ে যায় প্রতি বছর। এর কারণ হলো, চিকিৎসা বাবদ ১০০ টাকা খরচ হলে ৬৩-৬৪ টাকা নিজের পকেট থেকে দিতে হয়। যে পরিবারের ক্যান্সার হয়েছে, সে পরিবার নিঃশেষ হচ্ছে। যে পরিবারে একজনের ক্রনিক কিডনি রোগে ভুগছেন, তাকে ডায়ালিসিস সারা জীবন নিতে হবে। তাতেই সে পরিবারটি সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে। সুতরাং এ বিষয়গুলো চিন্তা করতে হবে। আমাদের দেশ দরিদ্র নয়। এ দেশটা একটা হতভাগা দেশ। আমাদের যে সম্পদ আছে, তা দিয়ে আমরা বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় ভালো থাকতে পারি। আমাদের উপজেলা পর্যায়ে ৩৫ জন চিকিৎসক দেয়ার ক্ষমতা আছে। সেটা আমাদের শক্তি। কিন্তু আমরা এতই হতভাগা যে, সেই ৩৫ জন চিকিৎসকের মধ্যে পাঁচজনকে সেখানে সেবা দেয়ার জন্য রাখতে পারছি না। তার মানে সুশাসনে আমাদের সাংঘাতিক ত্রুটি আছে। সুতরাং আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যত দিন সুশাসন না আসবে, তত দিন সরকার স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ন্ত্রণ বা উন্নত করতে পারবে না।
চিকিৎসা খাতে সমন্বয় কীভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়?
এখানে সমস্যাগুলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক। মন্ত্রী চাইলে বাংলাদেশে চিকিৎসা সেবার মান উন্নত করতে পারেন। শিক্ষার মান উন্নত করতে পারেন। এটি চাইতে তাকে আন্তরিক হতে হবে। বিএমডিসি যদি চায় তারা নৈতিকভাবে নিয়ম-কানুনগুলো মেনে চলবে, তাহলেও সেবা ও শিক্ষার মান অনেক উন্নত হয়ে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় (ভিসি) যদি ইচ্ছা করেন, আমাদের চিকিৎসা শিক্ষার মান অনেক উন্নত হয়ে যাবে। কাজেই নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা, নৈতিকতা ও সাহসিকতা থাকলে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানো কঠিন নয়।
চিকিৎসকের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হলে তদন্তের ব্যবস্থা আছে কি?
কথা হলো, রোগী অবহেলার শিকার হচ্ছেন না— এটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিএমডিসির। আমরা অনেক সময় দেখি পুলিশ মামলা করেছে, পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এখানে পুলিশের গ্রেফতার করার কোনো বিষয় নেই। এখানে একটা তদন্তের ব্যাপার আছে। এই তদন্তের দায়িত্ব বিএমডিসির। যে কেউ অবহেলার জন্য মামলা করতেই পারে। তাতে কোনো অসুবিধা নেই। সেটা শুধু চিকিৎসকের বেলায় নয়, সব ক্ষেত্রেই হতে পারে। এক্ষেত্রে সঠিক নির্দেশনা হওয়া উচিত, সরকার বিএমডিসিকে অনুরোধ করতে পারে যে, আপনারা বিষয়টি তদন্ত করে দেখুন। কিংবা যারা শিকার হয়েছেন, তারা যদি সরাসরি বিএমডিসিকে গিয়ে নালিশ করেন— এই চিকিৎসকের সেবায় অবহেলা হয়েছে বা এই হাসপাতাল অবহেলা করেছে। এগুলো দেখার দায়িত্ব হতে পারে সরকার ও বিএমডিসির। তবে একজন চিকিৎসককে সাজা দিতে বিএমডিসিকে যুক্ত করতেই হবে অন্তত তদন্ত পর্যায়ে। তদন্তে লিগ্যাল মেডিসিন বা ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের ব্যবহার করা যেতে পারে। আমাদের দুটো জিনিস মনে রাখতে হবে। এক. অবহেলা এবং দুই. ভুল। দুটো দুই জিনিস। মানুষ মাত্রই ভুল করে। সে হিসাবে চিকিৎসকও ভুল করতে পারেন। কিন্তু অবহেলাটা গ্রহণযোগ্য নয়। একটা অপারেশনের প্রটোকলগুলো ঠিক করা আছে। কিন্তু অপারেশনের পর দেখা গেল, পেটের ভেতরে একটা তোয়ালে বা ছুরি রেখে দেয়া হলো— সেটা তো অবহেলা। এটা তদন্ত করার দায়িত্ব বিএমডিসির। প্রতিষ্ঠানটি যা করতে পারে তা হলো, লিগ্যাল মেডিসিন এক্সপার্টদের যুক্ত করে তদন্ত এবং নির্ধারিত শাস্তি নিশ্চিত করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্যি, বিএমডিসিতে অভিযোগ আসে অত্যন্ত কম।
চিকিৎসকরা বলেন, রোগীর চাপ এত বেশি যে, তারা ঠিকমতো মনোযোগ দিতে পারেন না। ফলে ভুল হয় বা অবহেলা হয় প্রসঙ্গটি কতটুকু যুক্তিসঙ্গত?
একজন চিকিৎসক কতজন রোগী দেখবেন তার কোনো সংখ্যা নির্ধারিত নেই। তবে প্রতিটি রোগীকে যথেষ্ট সময় দিয়ে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার বলতে পারে না— একটা রোগীকে ১৫-২০ মিনিট দেখবেন। এটা নৈতিক বিষয়। কোন দিন আমি কতজন রোগী দেখব বা নির্দিষ্ট কয় ঘণ্টা রোগী দেখব, সেটা ডাক্তার নিজেই ঠিক করে নেবেন। রোগীর চাপের কারণে ভুল বা অবহেলা হবে— এটা কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমি একজন রোগীকে কতটুকু সময় দিচ্ছি। শুনে আশ্চর্য হবেন, বাংলাদেশে চিকিৎসকরা সবচেয়ে কম সময় দেন রোগীদের। এক্ষেত্রে ডাক্তারদের আন্তরিক, নৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হওয়া দরকার।
চিকিৎসায় রাজনৈতিক দৌরাত্ম্য বাড়ছে, এটা কীভাবে কমানো যায়?
এজন্য যা দরকার তা হলো, রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আমি রাজনীতি করব কেন? রাজনীতি আগে যারা করতেন, তারা সবাই সমাজসেবক ছিলেন। তারা কিছু পাওয়ার জন্য রাজনীতি করেননি। নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন জনগণের ভালোর জন্য, সমাজের মঙ্গলের জন্য। তাহলে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মনে রাখা উচিত, স্বাস্থ্য একটি রাজনৈতিক ইস্যু এবং সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আমাদের স্বাস্থ্য খাতে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে। স্বাস্থ্যবান জাতি গড়তে এর বিকল্প নেই।
একসময় ছাত্ররাজনীতির নেতৃত্বে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে ভূমিকা রেখেছেন। আপনার সমসাময়িকদের জন্য কোনো পরামর্শ?
দেখুন, সমকালীন এ যুগেও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন আমার রাজনৈতিক দর্শনের বিপরীত। তার পরও আমি মনে করি, একজন দেশপ্রেমিক রাজনীতিক জাতির মঙ্গলের জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করবেন। স্বাস্থ্য একটি রাজনৈতিক ইস্যু। এটাকে সেভাবেই মূল্যায়ন করে এর উন্নতির জন্য রাজনীতিবিদরা রাজনৈতিক (বাস্তবায়নযোগ্য নীতি) সিদ্ধান্ত নেবেন এবং বাস্তবায়ন করবেন।
সূত্রঃ পুরো প্রতিবেদনটি বনিক বার্তা প্রত্রিকার























