ইনসানে কামেল আল্লামা শফি তুমি কার?

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৫:০৬ পিএম


ইনসানে কামেল আল্লামা শফি তুমি কার?

ছবি- প্রতিদিনের চিত্র

 

বাংলাদেশের গন মানুষের আধ্যাত্মিক জগতের মহান নেতা, ৫ই মে শাপলা চত্বরের গন আন্দোলনের রাহবার, বিখ্যাত ইসলামিক হাদীস বিশারদ, বাংলাদেশ হেফাজতে ইসলামের মুহতারাম আমির, হাটহাজারী মাদ্রাসার সম্মানীত মুহতামিম আল্লামা শাহ আহমদ শফী সাহেব হুজুর মা. জি. আ.আমাদের মাঝে আর নেই। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

১০৪ বছর বয়সে তিনি আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছেন বার্ধক্য জনিত কারনে। তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সমগ্র বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের বহু যায়গায় লক্ষ কোটি ভক্ত অনুরক্ত ছিলেন শোকের সাগরে মুহ্যমান। বামপন্থী কিছু নাস্তিকরা ব্যতীত সকল দল ও মতের মানুষরাই জানিয়েছেন শোক এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ জামায়েত হয়েছেন তার জানাজা ও দাফন কালে। হাজির ছিলেন বাংলাদেশের কওমী অঙ্গনের সকল মুরব্বী শুভাকাংখীরা। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের অনেক বড় বড় দরবারের পীর মাশায়েখগন, চরমোনাই দরবার থেকে নায়েবে আমীর হযরত মাওলানা মুফতি ফয়জুল করীমের নেতৃত্বে ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবন্দ, ছারছীনা দরবারের অনেক মুরিদানদের দেখা যায় জানাজায় অংশ নিতে।

অংশ নিয়েছেন ঝালকাঠী নেছারাবাদ দরবার শরীফের কায়েদ পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম হযরত কায়েদ সাহেব হুজুরের দুই নাতী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এর সাংবাদিকরা বিভাগের সভাপতি ও এনএস ফোরাম এর সভাপতি অধ্যাপক ড. মাওলানা শহীদুল হক এবং আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম এর দাওয়াহ বিভাগের চেয়ারম্যান, এনএস ফোরাম সহ সভাপতি অধ্যাপক ড. মাওলানা আমিনুল হক ও কায়েদ ফাউন্ডেশন এর নেতৃবৃন্দ।

সব চাইতে জানাজায় আগত মানুষদের নজর কেড়েছেন বাংলাদেশ জামাতে ইসলামীর সেক্রেটারী জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরোয়ার, সাবেক এমপি শাহজাহান চৌধুরী ও ছাত্র শিবির সেক্রেটারী নেতৃত্বে একদল ইসলামপ্রিয় জনতার অংশগ্রহন। বিশেষ করে হযরত আল্লামা শফি সাহেব হুজুরের কফিনের খাঁটিয়াটি অন্যদের সাথে নিজ হাতে তুলে নেন। যা ছিলো ইসলামের শিক্ষার বাস্তব নিদর্শন। এটাইতো আমাদের হওয়া উচিত। নিজ আদর্শের বাহিরের কেহ হলে তাকে গ্রহন করা যাবেনা এই মানুষিকতা পরিহার করা এখন সময়ের দাবী। ইসলামের শিক্ষা।

জানাজায় অংশগ্রহন করেছেন ঢাকার সকল কওমী অঙ্গনের সকল বড় বড় আল্লামা ও শায়েখগন। বিশেষ করে আল্লামা আজিজুল হক রহ. সন্তান আল্লামা মামুনুল হক সাহেব অংশনিয়েছেন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। এমনকি তিনি জামাতের নেতৃবৃন্দের সাথে একত্রেই আল্লামা শফি হুজুরের কফিন হাতে নিয়েছেন। এখানেই আমাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে যে আমরা যে যে পদ্ধতিতেই দ্বীনের খেদমত করিনা কেন! দিন শেষে আমরা সবাই এক কালিমার সৈনিক। এক রাসুলের উম্মত।

হুজুরের জানাজায় অংশ নিতে এসেছেন সারা বালাদেশের সকল দল ও মতের লোকেরা, বিশেষ করে বিএনপিপন্থী সহ অন্যান্য ডানপন্থী দলের লোকজনের আনা গোনা ছিলো চোখে পড়ার মতো। স্থানীয় সাধারন আওয়ামিলীগের ও জাতীয় পার্টির  নেতা কর্মীরা ছিলেন জানাজায়। এমন একটি জানাজায় সরকারের মিনিমাম সরাষ্ট্রমন্ত্রী বা পুলিসের আইজি বা উল্লেখযোগ্য মন্ত্রীদের অংশ নেয়া উচিত ছিলো!কিন্তু তাদের কাছে আল্লামা শফি জীবিত থাকার চাইতে মৃত্যু পরে গুরুত্ব কম মনে হয়েছে তাই ভারতীয় তাবেদারী করতে এখানে ছিলেন অনুপস্থিত! তবে পুলিশ প্রশাষনের সহযোগীতা ছিলো মানুষের নিরাপত্তা রক্ষার্থে আলহামদুলিল্লাহ।

জানাজায় আগত লোক সমাগম প্রমান করে হযরত আল্লামা শফি হুজুর কতটা জনপ্রিয় ছিলেন এ জগতে। যা আমার লেখনিতে পরিমাপ করা যাবেনা। দেশ বিদেশের বহু বিখ্যাত আলেম ওলামা শোক বানী দিয়েছেন। বানী দিয়েছেন আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা , সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান সহ অন্যান্য দলের নেতারা।

গতকালের জানাজা ছিলো ইসলামী ঐক্যের মহা মিলন। হেফাজতের চেতনাবোধ জাগ্রত হয় আল্লামা বাবু নগরীর বক্তব্যে। তিনি তার বক্তব্যে মুসলিম উম্মাহর জন্য হেফাজতের আগামীর পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

আল্লামা শফি সাহেব হুজুর বাতিলের কাছে কোনদিন মাথানত করেননি, আর সে কারনেই বিতর্কিত সন্তান মাওলানা আনাস মাদানী পারেনি তার জানাজার ইমামতি করতে। আল্লাহ পাক হুজুরের ইমামতি করালেন তার সহজ সরল সন্তান হযরত মাওলানা ইউসুফ মাদানীর মাধ্যমে।
হুজুর আমাদেরকে অনেক কিছু শিখিয়ে গেলেন তার মৃত্যুর পুর্বের দুই দিনে। ৫০ বছর যেই যায়গায় জীবন বিলিয়েছেন সেই প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নিয়েছেন নিজ ইচ্ছায় এবং সন্তানকেও বিদায় জানিয়েছেন। আহা কি তার আদর্শ।

এ ধরনের আলেমগনগন কখনো কারো একক হতে পারেনা। তারা হয় সকল ইনসানের, হয় সকল মানবতার। তাই আল্লামা আহমদ শফি হুজুর কারো একার নয় বা কোন ব্যক্তি গোষ্ঠির নয়। তিনি সমগ্র জাতীর মহা মুরব্বী। সব ইসলামপন্থী দল মতের মানুষেরা তার কাছে পেতেন অবারিত ভালোবাসা। আর অন্যরাও হুজুরের কাছে আসতো দুনিয়া আখেরাতের কল্যান খুঁজতে ।

ব্যক্তি জীবন আমার সব চাইতে বড় পাওয়া হলো আমি এই মহান ওলী কে আমার বাসায় মেহমানদারী করার সুযোগ ও তাকে আমার গাড়ীতে করে মালয়শিয়ার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরাতে পেরে ছিলাম। মহান ওলী আল্লামা শাহ আহমদ শফী সাহেব হুজুর মা. জি. আ. তখন আমাকে অত্যন্ত আদর স্নেহ করেছিলেন এবং আমার মুখে খাবার তুলে দিয়ে ছিলেন। আমার জীবন ধন্য আলহামদুলিল্লাহ। সাথে ছিলেন হুজুরের বড় সন্তান মাওলানা ইউসুফ সাহেব।

আমি বিশ্বাস করি আল্লামা শাহ আহমদ শফী সাহেব হুজুর মা. জি. আ. তিনি একজন হক্কানী আলেম ও আল্লাহর খাছ বান্দা ছিলেন। তিনি বাতিলের বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিয়েছেন, জীবনের ৫০ বছর হাটহাজারী মাদ্রাসার খেদমত করেছেন। বয়োবৃদ্ধ থাকা অবস্থায়ও হুজুর কেবলা বাকশালীদের হাতে মানষিক চাপে ছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

রাজনৈতিক মতানৈক্য আমাদের দেশের প্রতিদিনের চিরাচরিত অভ্যাস। এখানে মতের উল্টো হলেই কেউ কাউকে ছেড়ে দিয়ে কথা বলেন না। সে যতো বড় উঁচু মাপের মহান ব্যাক্তিই হোকনা কেন! সেই হিসেবে মহান সাধক আল্লামা শাহ আহমদ শফী সাহেব হুজুর মা. জি. আ. এর পক্ষে বিপক্ষে অনেক মতানৈক্য ছিলো।

মহান ব্যাক্তিরা মৃত্যুর পড়ে আরো মহান হন তাঁদের নিজ কর্মের গুনে। দাঁত থাকতে কখনোই আমরা যেমন দাঁতের মর্ম বুঝিনা তেমনি মহান ব্যাক্তিদেরকে জীবিত থাকতে আমরা কখনোই মুল্যায়ন করতে পারিনা। এটা ইনসানদের একটি দুর্বলতা। আজ হয়ত আমরা বুঝবো যে কি মুরব্বি হারালাম আমরা। আমরা কেহই ভুলের উর্ধে নই, জীবনের পরতে পরতে আমাদের ভুল লেগেই আছে। আল্লামা শাহ আহমদ শফী সাহেব হুজুর মা. জি. আ. জীবনের প্রতিটি মুহুর্তই ইসলামের কল্যানে ব্যায় করেছেন, আমার মতো নালায়েক বান্দার আল্লামা শাহ আহমদ শফী সাহেব হুজুর মা. জি. আ. সঠিক মুল্যায়ন করা অপরিণামদর্শীতার শামীল হবে। তবে এক বাক্যে বলবো হুজুর ছিলেন মানবতার হুজুর, হুজুর ছিলেন জনতার হুজুর, হুজুর ছিলেন বাতিলের আতংক, বামপন্থী নাস্তিকদের রক্তচক্ষু। বার্ধক্য জীবনের গত ১০ টি বছর এই মহান সাধককে প্রতিদিন নতুন নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে চলতে হয়েছে। আওয়ামী বাকশালীরা হুজুরকে স্বাধীন ভাবে চলতে ফিরতে দেননি। তাকে একবাক্যে কোনঠাসা করে রেখেছিলো বাকশালীরা। কিন্তু আল্লামা শাহ আহমদ শফী সাহেব হুজুর মা. জি. আ. বাংলার ১৭ কুটি মানুষের অন্তরে জায়গা করে নিয়েছেন।

আল্লাহপাক মহান অলিকে সম্মানীত করে দুনিয়া থেকে নিয়ে গেছেন। আমরা হয়তো তার যথাযথ মুল্যায়ন করতে পারিনি। মহান রব তুমি আমাদেরকে মাফ করে দিও।

কায়েদ পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা শোকাহত! শোকাহত কোটি কোটি ভক্তের কাছে একটিই অনুরোধ আর তা হচ্ছে আমরা হুজুরের সঠিক আদর্শগুলো চর্চা করি ও জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অর্পন করি।

 

লেখক- ডক্টর ফয়জুল হক
পোষ্ট ডক্টোরাল ফেলো
আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মালয়শিয়া।

Ads