``টিসিবির পণ্য ও উর্ধ্বগতির পেঁয়াজ``
০২ অক্টোবর ২০১৯, ০৫:২৬ পিএম
ছবি-সংগৃহীত
আশেপাশের বাজার বা দোকানের চেয়ে কিছুটা কমে কেনাকাটা করা যায় বলেই কারওয়ান বাজারে বাজার করতে যাই। অবশ্য ধকলটাও অনেক। আহসান কখনও যায়নি কারওয়ান বাজারে, কারণ উনি মডার্ন হয়েছেন। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখে বর্তমান ম্যানেজার (ছুটা বুয়া) কে সাথে করে যাচ্ছি কারওয়ান বাজারে, পথেই দেখা এক ভাবির সাথে। উনি খামারবাড়ির সামনে যাচ্ছেন পেঁয়াজ কিনতে। কারওয়ান বাজার যাচ্ছি শুনে বললেন, 'কারওয়ান বাজারের চেয়ে ট্রাকে পেঁয়াজের দাম কম। (সরকারের এক কেজি পেঁয়াজের দাম ৪৫ টাকা। তিনি আরো জানালেন, দোকানে দেশী পেঁয়াজের কেজি ৮০ টাকা। ভারতীয় পেঁয়াজের কেজি ৭০ টাকা। কারওয়ান বাজার দেশী পেঁয়াজের কেজি ৭০ টাকা। ভারতীয় পেঁয়াজের কেজি ৬০ টাকা।'
শুনে বললাম, 'যাই ঘুরে আসি।' কারওয়ান বাজার গিয়ে দেখি দেশী পেঁয়াজের পাল্লা(পাঁচ কেজি) ৩৭০ টাকা মানে কেজি ৭৫ টাকা। ভারতীয় পেঁয়াজের পাল্লা(পাঁচ কেজি) ৩৩০ টাকা মানে ৬৫ টাকা কেজি। সাহস পাইনি পেঁয়াজ কেনার। পেঁয়াজের ঝাঁঝ যেন আমায় বাজার থেকে দ্রুত তাড়িয়ে দিলো।
পরেরদিন ২৫ সেপ্টেম্বর গেলাম খামার বাড়ির সামনে ট্রেডিং করপোরেশন বাংলাদেশ (টিসিবি) ট্রাক থেকে পেঁয়াজ কিনতে। তখন বেলা দুইটা বেজে ত্রিশ মিনিট। লাস্ট ক্রেতা হিসাবে পেলাম দুইকেজি পেঁয়াজ। এরপরেও কয়েকজন এসেছেন, পেঁয়াজ না পেয়ে খালি হাতে ফিরেছেন। সেদিন শুধু পেঁয়াজ দিয়েছিল। অদ্য ১লা অক্টোবর কিছু বাজার করতে বের হই। ইন্দিরারোড গিয়ে তো মনটা ভাল হয়ে যায়। কারণ ফুটপাত থেকে সব দোকান তুলে দেয়া হয়েছে। হাঁটতে কেমন স্বাধীন স্বাধীন লাগছে। কিন্তু সমস্যা হয়ে যায় ডাল কিনতে, ফুটপাত থেকেই বিভিন্ন ডাল কেনা হতো। ফুটপাতে দোকান না পেয়ে একটা মুদি দোকানে ঢুকি, চিনি ৮০ টাকা কেজি, মুসুর ডাল ৮০ ও ১১০ টাকা কেজি শুনে মনটা খারাপ হয়। হেঁটে এগিয়ে যাই খামারবাড়ির সামনে। গিয়ে শুনি আজ ট্রেডিং করপোরেশন বাংলাদেশ (টিসিবি) পেঁয়াজ, ডাল, চিনি ও সয়াবিন তেল দিচ্ছে। সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ৮৫ টাকা, চিনি প্রতি কেজি ৫০ টাকা, মসুর ডাল প্রতি কেজি ৫০ টাকা এবং পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৪৫ টাকায়। তখন ঘড়িতে সকাল এগারোটা। টিসিবির ট্রাকের সামনে দুটি লাইন, একটি পুরুষদের একটি মহিলাদের। পুরুষ লাইনে প্রায় ৩৫-৪০ জন দাঁড়ানো আর মহিলাদের লাইনে ২৫-৩০ জন। আমাকে এসব নিতে হলে এই লাইনেই দাঁড়াতে হবে। দাঁড়িয়ে গেলাম, আজ শুধু কিনতেই দাঁড়াইনি, দাঁড়িয়েছি অন্যদের সাথে কথা বলতেও।
এরই মাঝে মিডিয়ার ক্যামেরা এসে হাজির কয়েকটা। যতদুর মনে পড়ে ছিলেন, ইন্ডিপেনডেন্ট টিভি, দেশ টিভি, my TV ও RTV ক্যামেরা ও গণমাধ্যম কর্মীরা। গণমাধ্যমের ক্যামেরা দেখেই মহিলারা সবাই একটু ইতস্ত বোধ করছেন। কেউ মাথার কাপড় (ঘোমটা লম্বা করছেন) কেউ মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়াছেন। তবে লাইনে দাঁড়ানো পুরুষরা ক্যামেরা দেখে কিছুই বলেন নি বা ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। মিডিয়া কর্মীরা মহিলা পুরুষ দুই পক্ষের সাথেই কথা বলতে চাচ্ছেন। আজকের বিষয় নিয়ে জানতেও চাচ্ছেন। কিন্তু মহিলারা তেমন কিছুই বলতে চান না। সর্বপ্রথম ইন্ডিপেনডেন্ট টিভির কর্মী আমার সাথে কথা বলতে আসে, আমি কিছু কথা বলি। কিন্তু আমি এটাও জানি আমার বক্তব্য তিনি দেখাবেন না। কারণ সত্যের মা মরে গেছে এই দেশে।
ইন্ডিপেনডেন্ট টিভিতে কথা বলছি দেখে অন্য টিভির ক্যামেরাও এদিকে। আরো দুটো ক্যামেরায় কথা বলি, RTV লাইভে যায় পরপর দুইবার। এখানকার ডিলার ও তখন উপস্থিত ছিলেন। কথা হয়েছে উনার সাথেও। তিনি জানালেন, প্রতিটি ট্রাকে ৪০০ থেকে ১ হাজার কেজি করে পেঁয়াজ দেওয়া হচ্ছে প্রতিদিন, তবে শুক্রবার বন্ধ থাকে। একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই কেজি করে পেঁয়াজ কিনতে পারছেন। সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত বিক্রি করার কথা। কিন্তু সময়ের আগেই বিক্রি শেষ হয়ে যায়। অনেক ক্রেতাকে পেঁয়াজ দিতে পারিনা, ক্রেতারা খালি হাতে ফিরে যায় তখন খুব খারাপ লাগে। এই কেন্দ্রে প্রতিদিন যদি দুই হাজার কেজি পেঁয়াজ পেতাম তাহলে ক্রেতাদের সন্তুষ্ট করতে পারতাম।'
কথা হয় অনেক মহিলাদের সাথে, কয়েকজন মা এসেছেন বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে। তারা চাচ্ছেন দ্রুত পণ্য কিনে বাচ্চার স্কুলে যেতে, কারণ ছুটির সময় হয়ে গেছে। অন্য পণ্য ইচ্ছে হলে নিচ্ছে তবে এখানকার সবাই বিশেষ করে পেঁয়াজের জন্যেই এসেছে। কয়েকজন মা স্কুল থেকে সন্তানকে নিয়ে ফেরার পথেই এসে দাঁড়িয়েছেন পণ্য কিনতে। দুইজন মা একটু আগে লাইনে ছিলেন, বাচ্চার স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ায় উনারা বাচ্চাকে আনতে গেলেন। এখন বাচ্চা নিয়ে আসার পর উনারা আর আগের লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য নিতে পারছেন না। এই নিয়ে শুরু হয় কথা কাটাকাটি। বাধ্য হয়ে উনারা আবার সিরিয়াল ধরলেন।
মিডিয়ার ক্যামেরা দেখে মাথা লুকাচ্ছেন মধ্য বয়সি একজন নারী। কথা বলতেই বলছেন,' টিভিতে আত্মীয়স্বজনরা দেখলে সমস্যা আছে। সরকারি ট্রাক থেকে পণ্য নিতে আসছে দেখলে মন্দ কথা বলবে।' তিন বছরের সন্তান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক মা ঠিক আমার সামনেই। উনার সাথে কথা বলতে গেলে বলেন, 'প্রথমে এসে দাঁড়াতে খারাপ লেগেছে, পরে অনেককে দেখে আর খারাপ লাগেনি।' টিভিতে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে মধ্যবয়সি এক নারী বলেন,'গত তিনদিন পেঁয়াজ ছাড়া রান্না করেছি। আজ শুনলাম এখানে কম দামে পেঁয়াজ দিচ্ছে তাই আসলাম। এখন তো লম্বা লাইন, কখন যে পেঁয়াজ নিয়ে বাসায় যাব আর রান্না করবো। দুইভাগে দিলে কিছু উপকার হতো। যদি আজ দুইকেজি নিতে পারি অর্ধেক অর্ধেক পেঁয়াজ দিয়ে তরকারি রান্না করবো তবুও আর আসবো না।'
কেউ কেউ গাড়ীতে করেও এসেছেন আসা যাওয়ার পথে। হঠাৎ জোরে জোরে কথা শুরু হয়ে যায়। একজন পুরুষ লাইন ছাড়া এসেই পেঁয়াজ নিচ্ছে দেখে লাইনে দাঁড়ানো কয়েকজন ক্ষেপে যায়। এক পর্যায়ে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। অতঃপর অন্যরা পরিস্থিতি সামাল দেয়। হালকা পাতলা গড়নের এক মহিলা কিছুটা কষ্ট শেয়ার করলেন। সম্ভবত তিনি বাসা বাড়িতে ছুটা বুয়ার কাজ করেন। তিনি বলেন, 'দুই খালা পেঁয়াজ নিতে পাঠিয়েছে। কত করে কইলাম দুই ভাগ মানে দুই কেজি দুই কেজি পেঁয়াজ দেন। দিলোই না। একজনের টা দিল, অহন আবার লাইনে দাঁড়াইছি আরেকজনের জন্যে। কালকে আবার আসা যাবে কন।'
আমি লাইন ছেড়ে এদিকওদিক ঘুরি, সবার সাথে কথা বলি। তিন পুরুষ কথা বলছেন, একটা ইংরেজি পত্রিকার নাম ধরেই বলেন সেই পত্রিকার কোন কর্মী পেঁয়াজ চাইছে কয়েক কেজি, কিন্তু কি করে নিবেন তার জন্যে। তাদের সাথে দুটি কথা হল আমার, মিডিয়ার ব্যক্তি বলেই বেশি চাওয়া। যাক এই ফাঁকে একজনের মোবাইলে কল আসে, মোবাইলের ওপর পাশে থাকা ব্যক্তিও গনমাধ্যম কর্মী। উনার জন্যে পাঁচ কেজি পেঁয়াজ রাখতে বলা হয়। ডিলার সাহেব বলেন, 'কি করে রাখবো। যারা লাইনে সবাই পাবে কিনা তাই ভাবছি।'
দেশে প্রতি দিন পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ৬ হাজার ৫৭৫ টন। সেখানে টিসিবি বিক্রি করছে দিনে ২০ টনের মতো। ঘাটতি ঠিক রয়েই যাচ্ছে, আর তা পূরণ করতে হচ্ছে উর্ধ্ব গতির দামের পেঁয়াজ দিয়েই। ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে স্বল্প পরিসরে ৪৫ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করেছে টিসিবি। শুরুর কয়েক দিন ঢাকার পাঁচটি জায়গায় পেঁয়াজ বিক্রি করেছে তারা। পেঁয়াজের দাম আরো বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার ট্রাকসংখ্যা বাড়িয়ে ৩৫টিতে উন্নীত করা হয়েছে। ঢাকায় যেসব স্থানে বিক্রি হচ্ছে পেঁয়াজ সহ টিসিবির অন্যান্য পণ্য:
১. সচিবালয়ের গেইট, ২. প্রেস ক্লাব, ৩. কাপ্তান বাজার, ৪. ভিক্টোরিয়া পার্ক, ৫. সাইন্সল্যাব মোড়, ৬. নিউ মার্কেট/নীলক্ষেত মোড়, ৭. শ্যামলী/কল্যাণপুর, ৮. ঝিগাতলা মোড়, ৯. খামারবাড়ি, ফার্মগেট; ১০. কলমীলতা মোড়, ১১. রজনীগন্ধা সুপার মার্কেট, কচুক্ষেত; ১২. আগারগাঁও তালতলা ও নির্বাচন কমিশন অফিস, ১৩. রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স, উত্তরা; ১৪. মিরপুর-১ নং মাজার রোড, ১৫. শান্তিনগর বাজার, ১৬. মালিবাগ বাজার, ১৭. বাসাবো বাজার, ১৮. আইডিয়াল স্কুল, বনশ্রী; ১৯. বাংলাদেশ ব্যাংক চত্বর, ২০. মহাখালী কাঁচাবাজার, ২১. শেওড়াপাড়া বাজার, ২২. দৈনিক বাংলা মোড়, ২৩. শাহজাহানপুর বাজার, ২৪. ফকিরাপুল বাজার ও আইডিয়াল জোন, ২৫. মতিঝিল বক চত্বর, ২৬. খিলগাঁও তালতলা বাজার, ২৭. রামপুরা বাজার, ২৮. মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বর, ২৯. আশকোনা হাজি ক্যাম্প, ৩০. মোহাম্মদপুর টাউনহল কাঁচাবাজার, ৩১. দিলকুশা, ৩২. মাদারটেক নন্দীপাড়া কৃষি ব্যাংকের সামনে ও পলাশী মোড়ে।
পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছুই নেই বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন। তিনি বলেন, 'এই মুহূর্তে সরকারের কাছে যথেষ্ট পেঁয়াজ মজুদ আছে। মঙ্গলবার (১লা অক্টোবর) থেকে টিসিবি’র মাধ্যমে ৩৫টি ট্রাকে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু হবে। মিয়ানমার থেকে দুইটি জাহাজ নৌবন্দরে এসেছে। একটির পণ্য খালাস হয়েছে। দেশি পেঁয়াজ ও আমদানিকৃত পেঁয়াজ মিলিয়ে মজুদ সন্তোষজনক রয়েছে। মনে করি এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। যারা পেঁয়াজের বাজার দর বাড়ানোর চেষ্টা করছেন, এর কোনো যুক্তি নেই। যারা মজুদ করবেন এবং বাজারকে অস্থির করার চেষ্টা করবেন তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখানে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে যাতে পেঁয়াজ নিয়ে কোনো সমস্যা সৃষ্টি না হয় সেজন্য আমরা কৃষি ও অন্যান্য মন্ত্রণালয় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিচ্ছি। আমাদের ঘাটতি খুব বেশি না। যেহেতু আমরা খাদ্যে স্বয়ঃসম্পন্ন হয়েছি, কাজেই পেঁয়াজ-রসুন-আদা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নিয়েছি। যাতে ভবিষ্যতে আমদানির দিকে তাকিয়ে থাকতে না হয়।" ( তথ্যসূত্রঃ বিবিসি নিউজ)
ভারতের বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখার জন্য সে দেশের সরকার গত রোববার পেঁয়াজ রপ্তানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এই খবর বাংলাদেশে পৌঁছানোর পরপরই দেশের পেঁয়াজের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে ভারত এ কথা প্রচার হতে হতেই মাত্র ১২ ঘন্টায় পেঁয়াজের কেজি প্রতি বেড়েছে ৩০-৪০ টাকা। অথচ গতসপ্তাহে সেপ্টেম্বরের ২২/২৩ তারিখের দিকে টিভি নিউজে শুনি বলা হয়, 'ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি না করে অন্যদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করব, তাতে পেঁয়াজের দাম কমে যাবে।' অথচ ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি করবে না শুনেই লাফিয়ে দাম বেড়ে গেলো, এটা কি বাজার নিয়ন্ত্রণ কমিটি দেখে না। এদিকে পেঁয়াজ রপ্তানির ক্ষেত্রে ভারতের
নিষেধাজ্ঞার পরেই ২০ ঘণ্টায়
দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরের পাইকারি বাজারে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এ বাজারে প্রকারভেদে কেজিতে সর্বনিম্ন ৮০ টাকা ও সর্বোচ্চ ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে পেঁয়াজ। আর খোলা বাজারে প্রতিকেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা দরে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর পেঁয়াজ রপ্তানিতে টনপ্রতি নূন্যতম দাম ৮৫০ ডলারে বেঁধে দেয় ভারত সরকার। এরপর থেকেই বেশি মূল্যে পেঁয়াজ আমদানি করে আসছে হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারকরা। তখন থেকে বাড়তে থাকে পেঁয়াজের দাম। সর্বশেষ গত রোববার পেঁয়াজের উৎপাদন সঙ্কট দেখিয়ে প্রতি বছরের মতো এবারো বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয় ভারত সরকার। আর এর প্রভাব পড়েছে পাইকারি ও খোলা বাজারে।
'সিলেটের ওসমানীনগরের হাটবাজারে ১২০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা প্রতি কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। হঠাৎ এক লাফে পেঁয়াজের দর বৃদ্ধির কারণে সাধারণ জনগণের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ বেড়েছে। হাটবাজারে পেঁয়াজ নিয়ে আলোচনার ঝড় বইছে। পাইকারি বাজারে ১২০ টাকা দরে পেঁয়াজ বিক্রি হওয়ায় এলাকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হাট ও গ্রামের ভেতরের দোকানগুলোতে ১৫০-এর চেয়ে বেশি দরে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পেঁয়াজের লাগাম টেনে ধরতে হাটবাজারগুলোতে ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনার দাবি করছেন অভিজ্ঞমহল। ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণায় অস্থির হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের পেঁয়াজের বাজার। দেশের অন্যতম পাইকারি বাজার। খাতুনগঞ্জে পাইকারিতেই পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছিল প্রতি কেজি ৯০-১০০ টাকা দরে। খুচরা দোকানে তা ১১০ টাকায় ঠেকেছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার বিকল্প হিসেবে মিয়ানমার, তুরস্ক, মিসর ও চায়না থেকে পেঁয়াজ আমদানির চিন্তাভাবনা করছে এবং এরই মধ্যে তিনটি জাহাজে ১৪ কনটেইনার (৪০ ফুট সাইজ) পেঁয়াজ মিসর ও চায়না থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে।' (তথ্যসূত্রঃ নয়াদিগন্ত, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯)
ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা ২৪ লাখ মেট্রিক টন। চাহিদার বিপরীতে দেশের উৎপাদন হয় ১২-১৩ লাখ মেট্রিক টন। বাকি ১০-১১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়, যার অধিকাংশই আসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পেঁয়াজ রপ্তানিকারক দেশ ভারত থেকে। সম্প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় রপ্তানি নীতির সংশোধন করে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ রাখে। পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত সব ধরনের পেঁয়াজ রপ্তানিতে এ নিষেধাজ্ঞা থাকায় বাংলাদেশেও পেঁয়াজের দাম বাড়তে থাকে। কারওয়ান বাজারে পেঁয়াজ কিনতে আসা বীমা কর্মকর্তা পারভীন আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে সংবাদকে বলেন, আমাদের দেশ একটা মগের মুল্লুক মনে হচ্ছে। কারণ গত সপ্তাহে আমি পেঁয়াজ কিনেছি ৫০ টাকায়, আর সেই পেঁয়াজ এখন ১১০ টাকা। এটা কোন স্বাভাবিক কথা?, গতকাল শুনলাম ৭০ টাকা কেজি আর আজ এখন কিনছি ১১০ টাকা কেজি। কর্তৃপক্ষের সঠিক মনিটরিংয়ের অভাবে এমন লাগামহীনভাবে বাড়ছে পেঁয়াজের দাম। ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়েছে। গতকাল ঘোষণা দিল আর আজ ৪০ টাকা দাম বেড়ে গেল? একদিনে এত টাকা কেন বাড়ল? সরকার কেন এটির তদারকি করে না? কোন পণ্যের দাম বাড়লে খরচ বাড়ে আমাদের। কিন্তু আমাদের তো বাড়তি আয় নেই। তাই পণ্যের দাম বাড়লে বিপাকে পড়ি আমরা সাধারণ ভোক্তারা। আমাদের দেখারও কেউ নেই।
"রমজানের সময় দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার এপ্রিল মাসের শেষ দিক থেকে সারাদেশে ট্রাকে ১৮৭টি স্পটে টিসিবি রমজানের খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করে। রাজধানীতে ৩৫টি, চট্টগ্রামে ১০টি, প্রতিটি বিভাগে পাঁচটি এবং প্রতিটি জেলায় একটি করে স্পটে মোট ২ হাজার ৮২৭ জন ডিলার ট্রাকে করে এ পণ্য বিক্রয় করে।রাজধানীতে টিসিবির পণ্য বিক্রয়ের নির্ধারিত স্থানগুলো হলো- সচিবালয় গেট, জাতীয় প্রেস ক্লাব, কাপ্তানবাজার, ভিক্টোরিয়া পার্ক, সাইন্স ল্যাবরেটরি মোড়, নিউমার্কেট-নীলক্ষেত মোড়, শ্যামলী-কল্যাণপুর, ঝিগাতলা মোড়, ফার্মগেট খামারবাড়ি, কলমীতলা বাজার, কচুখেত রজনীগন্ধা সুপার মার্কেট, আগারগাঁও তালতলা এবং নির্বাচন কমিশন অফিস, উত্তরায় রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স, মিরপুর-১ বাজার রোড, শান্তিনগর বাজার, মালিবাগ বাজার, বাসাবো বাজার, বনশ্রীতে আইডিয়াল স্কুল, বাংলাদেশ ব্যাংক চত্বর, মহাখালী কিচেন মার্কেট, শেওড়াপাড়া বাজার, দৈনিক বাংলা মোড়, শাহজাহানপুর বাজার, ফকিরাপুল বাজার এবং আইডিয়াল জোন, মতিঝিল বলাকা চত্বর, খিলগাঁও তালতলা বাজার, রামপুরা বাজার, মিরপুর-১০ নম্বর চত্বর, উত্তরায় আশকোনা হজক্যাম্প, মোহাম্মদপুর টাউন হল কিচেন মার্কেট, দিলকুশা ও মাদারটেক নন্দীপাড়া কৃষি ব্যাংক। ( তথ্যসূত্রঃ বাংলাদেশ জার্নাল, ২৩ এপ্রিল ২০১৯)
কোন দেশই উৎপাদন এর দিক দিয়ে সব পণ্যেই সম্পূর্ণ নয়। যে পণ্যের চাহিদা বেশি অথচ উৎপাদন কম তা আমদানি করতে হয় অন্য দেশ থেকে। শুধু আমাদের দেশ নয়, বিশ্বের সব দেশই তা করে থাকে। যাতায়াত বা খরচ কম হয় যে দেশে সে দেশ থেকেই আমদানি করা হয়। আমাদের পার্শবর্তী দেশ ভারত থেকে পণ্যসামগ্রী আনা নেওয়ায় সুবিধা বলে আমরা ভারত থেকে অনেক পণ্যই আমদানি করি। পেঁয়াজ এমন একটা খাদ্য পণ্য যা মজুত রাখা যায় না বেশি দিন। অল্প দিনেই তা পঁচে যায়। যার ফলে দূরের দেশ থেকে আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। এমন পণ্যের উর্ধ্বগতি ঠেকাতে দেশেই এর উৎপাদন বাড়াতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই। কৃষককে ভাল বীজ দিতে হবে, উৎপাদনে ভর্তুকি কমাতে হবে। সহজ কিস্তিতে ঋণ দিতে হবে তাহলে কৃষক সেসব পণ্য উৎপাদন করতে আগ্রহী হবে। সব চেয়ে বড় কথা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের দেশে আবাদের সময় ফসল ঘরে তুলতে তুলতেই নষ্ট হয় সংরক্ষণ এর অভাবে। সরকারি ও বেসরকারি ভাবে এদিকে খুবই নজর দিতে হবে। তাহলে কৃষক কাজে উৎসাহ পাবে। আমাদের জমিগুলো তিন ফসলি জমি, এই জমি যেন খালি পড়ে না থাকে সেদিকে নজর দিতে হবে।
লেখক- সাহিত্যিক কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।























