বাল্যবিবাহ ও যৌতুক বিষয়ে কঠোর হতে হবে

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০১:৫২ এএম


বাল্যবিবাহ ও যৌতুক বিষয়ে কঠোর হতে হবে

আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশের বিবাহ রেজিস্ট্রারকারী কাজীগণ কাজ করে থাকে। সারাদেশে নিয়োগপ্রাপ্ত কয়েক হাজার বিবাহ রেজিস্ট্রার হিসেবে মুসলিম সমাজে দায়িত্ব পালন করছে। কাজীদের এ পেশাটি এক সময় মুসলিম সমাজে মর্যাদাপূর্ণ ছিল। তাদেরকে আলাদাভাবে সম্মানের চোঁখে দেখা হতো। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে বিবাহ রেজিস্ট্রার কাজীগণ তাদের সেই ঐতিহ্য গৌরব হারাতে বসছে। লোভনীয় এ পেশাটি পেতেও  লাখ লাখ টাকা লেনদেনের কথা শোনা যায়। অনেক দেনদরবার রাজনৈতিক তদবিরের মাধ্যমে এ পেশা যোগ্য অযোগ্য বিচার বিবেচনা ব্যাতিরেকে অনেকেই পেশাটি গ্রহণ করতে পেরেছে। আবার কোথাও কোথাও একজন কাজী অন্যজনের বিরোদ্ধে আইনী মামলায় জড়িয়ে পেশাটি ধরে রেখেছে। সরেজমিনে বেশকিছু এলাকা ও কাজীদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, মুসলিম সমাজে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবাহ রেজিস্ট্রেরী রক্ষণাবেক্ষণ অনেকেই সূচারুরূপে করছে না। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে তাদেরকে প্রচলিত আইন অনুসরণের কঠোরভাবে নির্দেশ দেয়া হলেও অনেকেই এ বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে অর্থের লোভে বয়সকে গুরুত্ব না দিয়ে অপ্রাপ্ত যুবক ও কুমারীদের বিবাহ রেজিস্ট্রার করতে দেখা যায়। বয়সের জন্য যা প্রমাণ হিসেবে ছেলে মেয়েকে প্রদর্শন করতে হয়, সেখানে অনেক ধরনের গুজামিল ও দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হয়। এসবের সাথে অনৈতিক অর্থ এবং কাজী ও তার সহকর্মীরা জড়িত। অনৈতিকভাবে ছেলে মেয়ে গোপনে উভয় পরিবারের সম্মতি ব্যাতিরেকে যেসব বিবাহ কাজী অফিসে সম্পন্ন হয় সেখানে নানা ধরনের অনিয়ম ও অর্থের লেনদেন হয়ে থাকে। অনিয়মের সবকিছু সংশ্লিষ্ট কাজী ও কাজী অফিস করে থাকে। যুবক যুবতিরা স্বল্প সময়ে  বুঝতে না পারলেও মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এসব বিবাহ বন্ধন প্রায় ভেঙ্গে যায়। তখন  একে অপরের বিরোদ্ধে নিজেরাই মামলায় জড়িয়ে যায়। এসব মামলায় প্রায় সংশ্লিষ্ট কাজীকেও আসামী করা হয়। বাংলাদেশে এ ধরনের হাজার হাজার মামলা কোর্টে পাওয়া যাবে। এসব মামলার কয়েকটি কারণের মধ্যে কিছু কারণ হলো যৌতুক, উভয় পরিবারে মেনে না নেয়া, আর সময়পযোগি  কাবিন না হওয়া। এসব কারণে পরিবার বিচ্ছিন্ন কাজী অফিস ও কোর্ট বিল্ডিংয়ের  আইনজীবি ভিত্তিক বিবাহগুলো লাস্টিং করে না। এসব বিষয়ে যখন যুবক যুবতীরা কাজী অফিস এবং আইনজীবির চেম্বারে যায়, তখন তারা ঠিকই বুঝতে পারে এ জাতীয় বিবাহ নিবন্ধন বেশিদিন ঠিকবে না। তবুও অর্থ লোভে গোপনে উভয় পরিবারের সম্মতি ছাড়া নিরবে এসব বিবাহে সহযোগীতা করে যাচ্ছে। এর জন্য সুনির্দিষ্টভাবে সংশ্লিষ্ট কাজীদের দায়ী করছে অভিজ্ঞ মহল। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এসব বিবাহের বিচ্ছেদ অহরহ দেখা যায়, এবং উভয় পরিবারের মধ্যে মামলার হিড়িক পড়ে যায়। শুরু হয় সাংসারিক, পারিবারিক ও সামাজিক অশান্তি। শুরু হয় উভয় পরিবারে মামলা আর পাল্টা মামলা। সিটি কর্পোরেশন থেকে মফস্বল পর্যন্ত এ ধরনের মামলার অভাব নেই। এখানে বেনিফিসারী হলো কাজী আর তার সংশ্লিষ্ট মানুষগুলো। অনৈতিক অর্থের লোভে কতিপয় কাজী কখনো কোনো বিবাহ নিবন্ধনকে না বলে ফেরত দিতে দেখা যায় না। কারণ একটা বিবাহ নিবন্ধন রেজিস্ট্রারী হলেই কয়েক হাজার টাকা পকেটে ঢুকবে। তাদের অনেক দালাল রয়েছে। যারা কাজীর দালাল হিসেবে বিবাহ নিবন্ধনের জন্য  যুবক যুবতীদের খবর নিতে থাকে। কখন কার সন্তান আর মেয়ের বিবাহ রেজিস্ট্রার হবে সেদিকেই তাদের দৃষ্টি থাকে। নানাভাবে দেখা যায়, এসব কাজীরা ভিআইপি এলাকা, হোটেল রেস্তোরা, উকিল চেম্বার, পাড়া মহল্লায় অনেক এজেন্ট বসিয়ে রেখেছে। তাদের মাধ্যমে বিবাহ রেজিস্ট্রারের জন্য খবর রাখে। আর তাদেরকে কাজী মোটা অঙ্কের কমিশন দেয়। বিভিন্ন এলাকার বিবাহ রেজিস্ট্রারের জন্য একাধিক রেজিস্ট্রার বালাম ব্যবহার হয়। অনেক সময় সঠিকভাবে রেজিস্ট্রার বালামে সঠিক তথ্য লিপিবদ্ধ হয় না। বয়স, কাবিন, নাম নানাভাবে ঘষা মাজা ও কারচুপি করতেও দেখা যায়। কাজী অফিসের এসব বিবাহ সংক্রান্ত কার্যক্রমকে কোনোভাবে সঠিক ও সচ্ছ বলে মনে হয় না। কিছু কিছু কাজী ছাড়া দেখা যায়, অনেকেই নিয়ম বহির্ভূত পথে  বিবাহের কাজ সম্পন্ন করে। তাদের কারণেই মূলত বাল্যবিবাহ, যৌতুক প্রথা বন্ধ করা যাচ্ছে না। সরেজমিনে দেখা যায়, পারিবারিক, সামাজিকভাবে যেসব বিবাহ বন্ধন ঠিকছে না, সেখানে দেখা যাবে কোনো না কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিবাহটা হয়েছে। এসবের পেছনে অবশ্যই কাজী ও কাজী অফিস জড়িত। বাংলাদেশ সরকার যতই যৌতুক ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের কার্যক্রম জোরদার করছে, তার মধ্যেও কোনোভাবেই বাল্যবিবাহ থেমে নেই। এর পেছনে সমাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজীদের ভূমিকা প্রথমে দেখা যায়। এরপর যৌতুক এটা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। মেয়ে সন্তানের পক্ষ থেকে যেভাবেই হোক যৌতুক ছেলে পক্ষকে দিতেই হবে। দেশে অনেকগুলো যৌতুক বিরোধী আইন ধারা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ সমাজ দেখছে না। যৌতুক প্রথা বন্ধ করতে হলে পরিবার ও সমাজপতিদের আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। উভয় পরিবারের সম্মতি আর সামাজিক কথাবার্তা ছাড়া কখনো যৌতুকের লেনদেন হয় না। এ জায়গায় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ হলে যৌতুকের অভিশাপ থেকে কিছুটা হলেও সমাজ নিস্তার পাবে। আর নিরব ও গোপনে বিবাহ বন্ধন প্রক্রিয়া রেজিস্ট্রারে কাজীরা যদি একটু দায়িত্বশীল ও সচেতন হয় তাহলে যেনোতেনো ভাবে বিবাহ রেজিস্ট্রারি হবে না। তখন আর নারী নির্যাতন অথবা যৌতুকের জন্য আদালতে হাজার হাজার মামলাও থাকবে না। পারিবারিক, সামাজিক অস্থিরতা অনেকাংশে কমে আসবে। এজন্য সমাজে নিয়োগপ্রাপ্ত বিবাহ রেজিস্ট্রার কাজীদের কঠোরভাবে আইন প্রয়োগে বাধ্য করতে হবে। তাদের রেজিস্ট্রার বই পর্যবেক্ষণ অতীব জরুরী। এসব বিষয়ে দায়িত্বশীল অফিসকে কাজী ও কাজী অফিসকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার দায়িত্ব পালন করতে হবে। অন্যথায়, রাষ্ট্রের যে যৌতুক বাল্যবিবাহ নিয়ন্ত্রণের সুফল সমাজ সঠিকভাবে পাবে না। নিজের স্বার্থে দেশের জন্য আসুন বাল্যবিবাহ ও যৌতুককে না বলুন।

লেখক: মাহমুদুল হক আনসারী

Ads