ঘুষ সামাজিক ব্যাধি

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

২৪ জুন ২০১৯, ০৩:৪৪ পিএম


ঘুষ সামাজিক ব্যাধি

ঘুষ সেটা শুধুমাত্র ঘুষ নয়, এটা মারাত্মকভাবে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে সমাজকে আক্রান্ত করছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র ঘুষ প্রথার কারণে আক্রান্ত। ঘুষ গ্রহণ যেভাবে অনৈতিক দেয়াও একইভাবে অনৈতিক। ঘুষ দেয়া নেয়া অনেকটা প্রকাশ্য না হলেও গোপনে এর প্রচলন মারাত্মকভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। এ বিষয়টা এখন রাষ্ট্রের বিশেষত সরকারি প্রতিষ্ঠানে একেবারে প্রচলিত একটি প্রতিষ্ঠিত অপরাধ। হাতেগোনা কিছু প্রতিষ্ঠান ও কিছু ব্যক্তিকে অবশ্যই এ অপরাধের বাইরে রাখতে হবে। সরকারি সব প্রতিষ্ঠানের সকলেই যে এ অনৈতিক ঘুষ গ্রহণের মধ্যে আছে, আমি সে কথা বলব না। অনেক ভালো ভালো সৎ ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা এ বিষয়টা ঘৃণা করেন যদিও বা তাদের পক্ষে এর বিরোদ্ধে প্রতিরোধ করে তোলা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক সেনা, নৌ, বিমান বাহিনীর মতো  বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্যে কোনো ঘুষ প্রথার কথা স্পষ্ট করে শোনা যায়নি। এসব বাহিনীর প্রতি জনগণের যথেষ্ঠ আস্থা রয়েছে। ফলে তাদের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় যেকোনো উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড অত্যন্ত সচ্ছতার সাথে হয় বলে দেখা যায়। তারাও এদেশের মানুষ। দেশের নাগরিক। রক্তে মাংসে ও আলো বাতাসে এদেশেরই সন্তান। তাদের পক্ষে দুর্নীতি ও ঘুষের মতো অপরাধ ছাড়া এতো বড় বিশাল বিশাল বাহিনীতে কাজ করা সম্ভব হলে, বাংলাদেশের অপরাপর রাষ্ট্রীয় সেক্টরগুলোতে কেনো দুর্নীতি ও ঘুষ প্রথা বন্ধ করা যায় না, সেখানেই জনগণের চিন্তার শেষ নেই। রাজনীতির জন্য গণতন্ত্র আর গণতন্ত্রের জন্য রাজনীতি। রাজনীতির মাধ্যমে সরকার গঠন আর সরকার গঠন করে প্রশাসন পরিচালিত হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামের এ দেশটা এভাবে স্বাধীনতার পর থেকে চলে আসছে। শুনেছি স্বাধীনতার পূর্বে এভাবে ঘুষ প্রথা চালু ছিল না। দেশ স্বাধীন হওয়ার সাথে সাথে ধীরে ধীরে ঘুষ প্রথা সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। গোপনে গোপনে এ অপরাধটি খুবই বিস্তৃতি অর্জন করেছে, রাষ্ট্রের সবগুলো সেক্টরে। কতিপয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত স্বল্প সংখ্যক হলেও তারা এসব অনৈতিক ঘুষের বিরোদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে ঘৃণার চোখে নিন্দা জানায়। স্বল্প সংখ্যক এসব সরকারি কর্মকর্তাগণ আসলে বিশাল দুর্নীতি ও ঘুষ অপরাধিদের হাতে সমাজের অন্যান্যদের সাথে তারাও জিম্মি। ঘুষ নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে বক্তব্য আসছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি বক্তব্যে ঘুষ দাতা গ্রহীতা দুজনকেই অপরাধী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। উভয়ের বিচারের কথা তিনি বলেছেন। তিনি যথার্থ বলেছেন, দেরীতে হলেও সমাজের মারাত্মক ব্যাধি ঘুষ, দুর্নীতি এটা উন্নয়নের প্রতিবন্ধক। অঘোষিত ভাবে ঘুষের মাধ্যমে দেশের সব শ্রেণীর মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর্থিক ও ভোগান্তির দুটোই ঘুষের মাধ্যমে ক্ষতি হচ্ছে। ঘুষ নাম পাল্টিয়ে কোনো কোনো সময় সেটার নাম হয়, বখশিশ এবং পার্সেন্টিস। এভাবে এ জিনিসটা সমাজে ব্যাপকভাবে প্রতিষ্টা হয়েছে। কোনো বৈধ ফাইল সরকারি অফিসে ঘুষ প্রদান ছাড়া কাজ হয় না। ঘুষ সব শ্রেণী পেশা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরকেও দিতে হয়। কেউ বেশি, কেউ কম। সবাইকেই ঘুষ দিয়ে কাজ শেষ করতে হয়। বাজারে শোনা যায়, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দপ্তর থেকে নিয়মিতভাবে যে ঘুষ উঠানো হয় তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নিচ থেকে উপরে পর্যন্ত পৌছে যায়। ঘুষের টাকার বিশাল বিশাল অংকের কথা সরকারি দুর্নীতিগ্রস্থ কতিপয় কর্মকর্তাদের যখন হাতেনাতে অথবা তাদের ব্যাংক হিসেব দেখা হয়, তখন দেখা যায় কী পরিমাণ অবৈধ ও ঘুষের টাকার পাহাড় করেছে। এইতো সেদিন পত্রিকায় দেখলাম ডিআইজি মিজানের এক অপ্রাপ্ত আত্মীয়ের ব্যাংক একাউন্টে তেরো কোটি টাকার হিসেব। তাহলে একজনের হিসেবে বিশাল পরিমাণের এতো অবৈধ টাকা আর অন্যান্য সদস্যদের হিসেবে আরো কী পরিমাণ ঘুষের টাকা পাওয়া যাবে তা সময় বলে দেবে। বাংলাদেশে এ ধরনের কী পরিমাণ ডিআইজি মিজানের গল্প রয়েছে তা মাঝেমধ্যে দু’চারজন রাঘব বোয়াল ধরা পড়লে দেখা যায়। সরকারি বড় বড় আমলাদের মধ্যে কতিপয় এসব কর্মকর্তারা দেশ ও জনগণের সম্পদ লুটেপুটে রাতারাতি শত হাজার কোটি টাকার মালিক হচ্ছে। উন্নয়নের অনেকগুলো অর্থ তাদের পকেটে চলে যায়। হিসেবের খাতা ঠিক রেখে সরকারি জনগণের অর্থ এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পকেটে যাওয়া বন্ধ করতে হবে। যেসব অর্থ দুর্নীতি আর ঘুষের মাধ্যমে ওইসব রাঘব বোয়ালরা অর্জন করেছে তাদের বিরোদ্ধে রাষ্ট্রকে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। এসব অর্থ জাতীয় ফান্ডে নিয়ে আসতে হবে। উন্নয়নের জন্য এসব টাকা জনগণের হাতে খরচ করতে হবে। তাদের বিরোদ্ধে রাষ্ট্রের আইনের ধারা ব্যবহার করে কঠোরভাবে শাস্তি দিতে হবে। জনগণের দেশে, জনগণের শাসন প্রতিষ্টা করতে হবে। ঘুষ দুর্নীতিকে প্রশাসন থেকে উচ্ছেদ করতে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বাস্তবায়ন চায় জনগণ। উন্নয়নের সাথে ঘুষ আর দুর্নীতি থাকতে পারবে না। সরকারের উন্নয়নের স্বচ্ছতাকে যেকোনো মূল্যে ঘুষ দুর্নীতি মুক্ত দেখতে চায় দেশের মানুষ। সামাজিকভাবে ঘুষের বিরোদ্ধে প্রতিরোধ করতে হবে। ঘুষকে না বলতে হবে, উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে হবে। পরিবার ও সমাজকে ঘুষ দুর্নীতি মুক্ত করতে অপরাধিদের প্রতি ঘৃণা জানাতে হবে। রাষ্ট্রকে প্রয়োজনে তাদের বিরোদ্ধে কঠোর শাস্তি জনসম্মুখে দেখাতে হবে। যেকোনো মূল্যে রাষ্ট্রের নিকট জনগণের দাবি ঘুষকে বন্ধ করুন।

লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক

 

Ads