স্বাধীনতার ৪৮ বছর; প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির খতিয়ান
৩১ মার্চ ২০১৯, ০৩:৫৩ পিএম
মুক্তিযুদ্ধের ৪৮তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করছে বাংলাদেশ। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে যে সমাজ বা রাষ্ট্র চেয়েছিলেন তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের মানুষেরা - তার প্রায় পাঁচ দশক পেরিয়ে এখন কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ?
কোন কোন ক্ষেত্রে এগিয়েছে? আর কোন দিকে পিছিয়ে আছে? এ প্রশ্ন নিয়ে কথা প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খাই আমরা।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় শুধুমাত্র ধর্মীয় মিলের কারনে দুটি ভূখন্ড মিলে পাকিস্তান হয়েছিলো, কিন্তু শাসনভার পূর্ব পাকিস্তানের হাতে ন্যস্ত থাকায় রাষ্ট্রনীতির সর্বত্র বঞ্চিত ছিলো পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশের মানুষ।
পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ,জুলুম ও নির্যাতনের হাত থেকে বাংলার মানুুষের মুক্তির জন্য, শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ মানচিত্রে নিজেদের অবস্থান করে নিতে সক্ষম হয়।এবং একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে পরিচিতি পায়।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে রাষ্ট্রের তিনটি আদর্শিক ভিত্তি ঘোষণা করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার কর্তৃক জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করণার্থে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্ররূপে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করিলাম।’ এর অর্থ দাঁড়ায় এই যে এ তিনটিই হচ্ছে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আদর্শিক ভিত্তি।
কিন্তু স্বাধীনতার কতটুকু সুফল ভোগ করতে পেরেছি এই ৪৮ বছরে এটাই এখন প্রশ্ন?
স্বাধীনতার পর পরই একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে বঙ্গবন্ধু যে স-ুদূরদৃষ্টি সম্পন্ন দৃষ্টুভঙ্গির মাধ্যমে দেশ বিনির্মানের পরিকল্পনা হাতে নিয়ে ছিলেন পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধকে হত্যার মাধ্যমে সেই বাস্তবায়নযোগ্য উন্নয়ন পরিকল্পনা ধুলিসাৎ করে দেয়া হয়।
থমকে যায় বাংলাদেশ নামক সদ্য ভূমিষ্ট রাষ্ট্র।
এরপর বহু চড়াই- উৎড়াই পেরিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির নানাবিধ হিসাব বুকে নিয়ে।
বাংলাদেশ গঠনের এই ৪৮ বছরে এদেশের কিছু কিছু উন্নয়ন অবশ্যই লক্ষণীয়।বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে দেশের আধুনিকায়ন,প্রযুক্তিগত উন্নয়ন,রাস্তাঘাট ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উন্নীত করুন ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি অনস্বীকার্য।
কিন্তু অপ্রাপ্তি হিসেব খুললে এইসব অগ্রগতি হতাশায় রূপ নিতে থাকে।
একটা দেশের উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে তরুণ ও যুবসমাজ।আমাদের দেশে শিক্ষিত তরুণ ও যুবসমাজের মুষ্টিমেয় অংশের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারছেন না সরকার।
বেকারত্ব দূর করতে না পারলে এইসব যব সমাজই দেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।বিভিন্ন সময় বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য বিভিন্ন সরকারের আশ্বাস কেবল বক্তৃতার মঞ্চ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ,এর কোনো বাস্তবায়ন আমরা লক্ষ্য করছি না।
আমাদের সড়ক ও পরিবহন যেন মৃত্যু ফাঁদ।
প্রতিনিয়ত সারাদেশে কোনো না কোন সড়ক দূর্ঘটনায় হারিয়ে যাচ্ছে শত সহস্র তাজা প্রাণ।
সড়ক ও পরিবহন খাতে জিম্মি হয়ে আছে গোটা দেশ এমনকি সরকার নিজেও।ট্রাফিক ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন ও এই খাতে যুগ যুগ ধরে চলে আসা দুর্নীতে সমূলে উচ্ছেদ করতে না পারলে অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়নকে আমরা শোকের মতো সুখ বলে উল্লেখ করতে পারি।
সম্প্রতি আমরা থমকে গেলাম পর পর মর্মান্তিক দুটো অগ্নিকান্ডের মধ্য দিয়ে।
যদিও অহরহ ঘটেই যাচ্ছে অগ্নিকান্ড,তথাপি পুরাণ ঢাকার চকবাজারে ও বনানীর এফআর টাওয়ারের অগ্নিকান্ড দেখে পুরো জাতি স্তব্দ আজ।
সেই নিমতলীর ঘটনা থেকে শিক্ষা নিলে আমাদের হয়তো আজকের এই দিনটি দেখতে হতো না।
এই সব কিছুর মূলে আমরা দুর্নীতিকেই দায়ী করতে পারি। আমাদের স্বাধীনতার অন্যতম একটি উদ্দেশ্য দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়া।
কিন্তু আজ কোথায় নেই দুর্নীতি।প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহল হতে অতিনিম্ন পর্যায়ে চোখ রাখলে সুস্পষ্ট দুর্নীতির ছাপ দেখতে পাই আমরা।
বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারীর পদে থাকা ব্যক্তিটিকেও যখন বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ির মালিক হতে দেখা যায়,তখন আমাদের এইসব খাতের দুর্নীতির কথা নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না।
ঘুষ ও দুর্নীতর কবলেই বেকারত্ব বাড়ছে,সড়ক দূর্ঘটনা বাড়ছে,অগ্নি দূর্ঘটনাসহ সকল অপরাধ ও বিধ্বস্তী কর্মকান্ড চলছে আমাদের দেশে।
এই কি তবে স্বাধীন দেশ হিসেবে আমাদের অগ্রগতি?
আমাদের স্বাধীনতার সুফল উপভোগ করতে পারিনি বলেই এখনো কিছু সাধারণ মানুষ ক্ষোভের বশে এদেশকে পাকিস্তানই ভালো ছিলো বলতেও দ্বিধা করেন না।
আমাদের স্বাধীনতা কেবল গুটিকয়েক মানুষের জন্য,দেশের বিরাট অংশ আজ স্বাধীনতার সংজ্ঞা ভুলতে বসেছে।
স্বাধীনতা বলতে কি বুঝানো হয়?
শুধুমাত্র সংবিধানে স্বাধীনতা শব্দের সংযোজনেই একটা দেশ স্বাধীনতার সুফল পায় না।
একটা দেশ স্বাধীন হওয়া মানে সেই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক,সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত মুক্তি।
আমরা এখন নিজেদের দিয়ে নিজেরাই বিবেচনা করতে পারি আমরা কতোটুকু স্বাধীন।
বাংলাদেশকে একটা স্বাধীনত সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে পরিচয় দিই আমরা। কিন্তু রাজনৈতিক কিংবা গণতান্ত্রিক কতোটুকু স্বাধীন বাংলাদেশ?
এদেশের রাজনীতি শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন,প্রভাবশালী ও বিত্তবানদের জন্য। এখানে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ মনে হয়।
অথচ বিত্তবান দুর্নীতিবাজরা রাজনীতিতে এসে কলুষিত করে চলেছে রাজনৈতিক পরিবেশ। আর গণতন্ত্র তো এখন হাতের মোয়া।ইচ্ছে হলেই ক্ষমতাসীন রা ইহা ব্যবহার করতে পারেন না হলে নাই।
বিরুধী দলকে নানাভাবে হয়রানি,ভোটাধিকার হরণ,হামলা-মামলা,শোষণ নির্যাতনের অপর নাম রাজনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের দেশে।অথচ গণতন্ত্রে সকল জনগণের রাজনৈতিক চর্চা কিংবা কথা বলার অধিকার আছে।
কিন্তু আমাদের স্বাধীনতার নাম কর্তার ইচ্ছাই কর্ম। অর্থনৈতিকভাবেও আমরা স্বাধীনতা পাইনি। আমাদের অর্থনীতির বৈষম্য দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। অথচ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- সকল ধরনের বৈষম্যহীন একটি রাষ্ট্র গঠন করা হবে।
কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক বৈষম্য এতোটাই প্রবল যে এক শ্রেণীর মানুষ বিত্তের পরে বিত্তের পাহাড় গড়ে তুলছে আর আর শ্রেণীর মানুষ অর্থনৈতিক শোষণ যাতাকলে পিষ্ট হয়ে নাভিশ্বাস ছেড়ে বাঁচতে চাইছে।
এর মধ্যে আবার দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতি নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের জীবনযাত্রাকে দারুণভাবে ব্যাহত করছে।
এইসব মুক্তি না পেলে স্বাধীনতাকে নিছক শব্দ ছাড়া কিছুই মনে করতে পারবো না আমরা। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও শেকল পড়ানো স্বাধীনতার পায়। স্বাধীনতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন পাওয়া হতে পারতো বাক স্বাধীনতা বা কথা বলার স্বাধীনতা।
কিন্তু হতাশাজনক সত্য এটাই যে আমাদের বাক স্বাধীনতা বলতে কোনো স্বাধীনতা নেই।আমাদের উপর মহল হদে শুরু করে কেউ নিজস্ব মতামত প্রকাশে স্বাধীন নয়।কোনো ক্ষমতার লাগাম আমাদের মুখে আটকে থাকে,আমরা বলতে পারি না আমরা অন্ন চাই, বাঁচতে চাই আমরা স্বাধীনতা চাই।
আমাদের লাগাম টেনে ধরেন ক্ষমতাসীন মহল। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা মিডিয়াগুলোও জিম্মি ক্ষমতার কাছে।
তাহলে কোন অর্থে আমরা স্বাধীন?
এতোগুলো পরাধীনতার শৃঙ্খল পড়ে নিজেদের স্বাধীন বলতে দ্বিধান্বিত আমরা।
তারপরও বলতে পারি-"স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরে এসে আমরা একটা ভালো অবস্থানে আছি । একেবারে কাঙ্খিত অবস্থায় এসেছি তা বলা যাবে না। তবে বলা যায় আমরা সেই পথেই এগোচ্ছি"।
বাংলাদেশের নারীরা যেভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ কাজে অংশ নিচ্ছে সেভাবে আমাদের মত অন্য দেশগুলো অনেক পিছিয়ে রয়েছে"।
যদিও "অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সূচকে আমরা এগিয়েছি কিন্তু রাজনৈতিক সূচকে আমরা পিছিয়েছি।"
"কৃষি, রপ্তানি, গার্মেন্টস, প্রবাসী আয় এগুলোতে মোটামুটি চলছে। যদিও আমাদের এগোনোর কথা ছিল, রাজনৈতিক স্বচ্ছতা বিনির্মাণে আমরা ব্যর্থ হয়েছি"।
"গণতন্ত্র এখনো সংকটাপন্ন। রাজনৈতিক সহনশীলতা তৈরিতেও ব্যর্থ। সংসদ এখনো অকেজো"।
চরম দারিদ্র্য না থাকলেও, অথবা শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, মাথাপিছু রোজগার ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নতি হলেও, অর্থ-বিত্তের দিক থেকে মানুষের মাঝে বৈষম্য কিংবা শহর গ্রামের ফারাক আজও প্রকট।
আবার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মানুষের অশংগ্রহণ কেবল নির্দিষ্ট শ্রেণীর মাঝে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাজনৈতিক সহনশীলতার অভাব বড় ধরনের সংকট তৈরি করছে।
"রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সৌহার্দ্যের অভাব। হিংসা এবং প্রতিহিংসা তাদের মধ্যে। এটা একটি কঠিন অবস্থা আমাদের জন্য।
সার্বিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় মৌলিক প্রশ্নের ক্ষেত্রে তাদের মতামত অনেকটাই অভিন্ন। হত্যা, গুম মানুষের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে।
শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে ঠিকই তবে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। দুর্নীতির বিষয়টিও স্থান পায় তাদের বক্তব্যে। সামাজিক নিারপত্তা নিশ্চিত করার কথাও এসেছে।
সুতরাং প্রায় পাঁচ দশক পরে এসেও কাঙ্খিত লক্ষ্য কিংবা উদ্দেশ্য অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এখনো অনেকটাই পথ পাড়ি দিতে হবে - তেমনটাই প্রতীয়মান হয়।
স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি হিসেবে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার কাছে আমরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, মতা প্রকাশের স্বাধীনতা পুনর্বহালের দাবি করতেই পারি।
না হলে দেশের সামগ্রিক অন্যান্য উন্নয়ন নিরর্থক হয়ে দাঁড়াবে।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের দেশ,এই বাংলাদেশ ছিলো না।
তিনি মানুষের মধ্যে যে একতার বীজ বুনেছিলেন, সেই বীজ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেছে।
শ্রেনী বিভাজন ও রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক বৈষম্য হতে বেরিয়ে এসে স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে সরকারকেও ভূমিকা রাখতে হবে।
আমরা চাই একটি গণতান্ত্রিক সুষ্ঠু ও সুন্দর স্বদেশ। তবেই স্বাধীনতা বাঙালীর জীবনে অর্থবহ হয়ে উঠব।
___________
লেখক:কবি ও কলামিষ্ট
























