সাম্প্রতিক সময়ে অগ্নিকান্ড ও ক্যামিক্যাল কারখানা
৩০ মার্চ ২০১৯, ০৬:১৬ পিএম
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে আগুনের ভয়াবহতা দেখে জনমনে শঙ্কা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঢাকার চকবাজার চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ৩৬ দিনের মাথায় আগুনে পুড়ল অভিজাত এলাকা বনানীর বহুতল ভবন ফারুক রূপায়ন টাওয়ার। এসব এলাকার আগুনের লেলিহানে গোটা দেশবাসী হতবম্ব হয়ে যায়। ২৮ মার্চ দুপুর বেলায় সংঘটিত অগ্নিকান্ডে ২৫জনের জীবন প্রদীপ নিভে যায়। ৬০জনের অধিক বিভিন্ন হাসপাতালে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন আছে বলে ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়। এ ভবনে থাকা বাণিজ্যিক ব্যবসা প্রতিষ্টানের কয়েক হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হঠাৎ করে দেশের বিভিন্ন শহরে উদ্দেশ্যমূলক এসব অগ্নিকান্ডে জনগণ উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করছে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত এসব অগ্নিকান্ড সংঘটিত হতে দেখা যাচ্ছে। মাস খানেক পূর্বে চট্টগ্রামের চাকতাই ভেড়া মার্কেটে উদ্দেশ্যমূলক আগুনে প্রাণহানীসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব মার্কেট ও ভবনে আগুন লাগার পেছনে যতটা এক্সিডেন্ট, তার চেয়ে বেশি ভূমি দখল জবর দখলের প্রশ্নটা উঠে আসে। সরকারি খাসজমি দখল করে এক শ্রেণীর ভূমিদস্যু বাড়িঘর নির্মাণ ব্যবসা প্রতিষ্টান গড়ে তুলে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলা গাছ হচ্ছে। এসব খাসজমি ভূমিদস্যুদের মাঝে আন্তকোন্দলের মাধ্যমে অনেক সময় অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত বলে বিভিন্ন সূত্র বলছে। খাসজমি পরিত্যাক্ত খাল বিল জোর জবরদস্তি করে দখলে রাখা এক শ্রেণীর শাসক গোষ্ঠীর ক্যাডার বাহিনী এসব অপকর্মের সাথে জড়িত থাকার কথা উঠে আসে। মর্মান্তিক অপরাধ এসব অমানবিক কর্মকান্ডে সাধারণ মানুষের মনে ভয় ভীতি জন্ম নিচ্ছে। শান্তিপ্রিয় অসহায় জনগণ জীবন জীবিকার তাগাদায় গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে রোজগার করে জীবিকা নির্বাহ করতে চায়। স্বল্পমূল্যে তারা যেখানেই মাথা গুজাবার ঠাই পায় সেখানেই রাত যাপন করে। কিন্তু দেখা যায় মোড়লবাজ সুবিধাবাদী ভূমিদস্যু ক্ষমতাসীন দলের চত্রছায়ায় থেকে যেকোনো প্রকারের অপকর্ম করতে দ্বিধা করে না। প্রশাসনকে এসব বিষয় খতিয়ে দেখে জননিরাপত্তায় কঠোর হতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে অব্যাহত আগুন লাগার সঠিক কারণ নির্ণয় করতে হবে। আবাসিক এলাকায় ব্যবসা প্রতিষ্টান অনুমোদন বন্ধ করতে হবে। বিশেষত প্লাস্টিক তৈল দাহ্যজাতীয় প্রতিষ্টানের অনুমোদন কোনো অবস্থায় আবাসিক এলাকায় দেয়া যাবে না। রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে হাজার হাজার বিভিন্ন প্রকারের ছোট বড় কারখানা বাসা বাড়ির আঙিনায় গড়ে তোলে ব্যবসা করতে দেখা যায়। এসব কারখানা কীভাবে অনুমোদন পায় সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে। বিল্ডিং কোড, সিডিএ, সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদন ব্যাতি রেখে বহু বিল্ডিং তৈরী হয়েছে। এসব বিল্ডিং কীভাবে অনুমোদন ছাড়া তৈরী হয় সেটাও বোধগম্য নয়। বিল্ডিংয়ের নকশা অনুমোদন সব ঠিকঠাক রেখে বিল্ডিং ঘর বাড়ি না করার অভিযোগ অনেক পাওয়া যায়। এসব কারণেও অগ্নিকান্ডের ফলে প্রাণহানী বেশি হচ্ছে। একটা বিল্ডিং থেকে আরেকটা বিল্ডিংয়ের দূরত্ব, রাস্তা, গাড়ি চলাচলের প্রয়োজনীয় রাস্তা রাখা এসব বিল্ডিং কোডে বিবেচনা ও শর্ত দেয়া থাকলেও অনেকাংশে তা মানা হচ্ছে না। ফলে অগ্নিকান্ডের সাথে সাথে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক আকার ধারণ করছে। গত ১০ বছরে দেশে ১৬ হাজার অগ্নিকান্ডে ১৫‘শ ৯০ জনের প্রাণহানী হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এ তথ্য দিয়েছেন। ২০১০ সালে পুরান ঢাকার নিমতলীতে অগ্নিকান্ডে ১২৪ জনের প্রাণহানী ঘটে। সে ঘটনায় একই পরিবারের ১১ ব্যাক্তি মারা যান। এ ঘটনার পর সরকারি তদন্ত কমিটি অগ্নিকান্ডের জন্য রাসয়নিক মওজুদকে দুর্ঘটনার জন্য চিহ্নিত করে এবং পুরান ঢাকার সব আবাসিক ভবন থেকে রাসয়নিক দোকান কারখানা গুদাম সরিয়ে ফেলার সুপারিশ করে। ২৮ তারিখ রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অগ্নিঝুঁকিমুক্ত ও নিরাপদ পুরান ঢাকা শীর্ষক গণ শুনানিতে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এসব কথা বলেন। গণশুনানির আয়োজন করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র, বেলা, রাসট, ব্রাক, বাংলাদেশ স্থপতি ইনিস্টিটিউট, এএলআরডি এবং নিজেরা করি নামক সংগঠন। শুনানিতে অংশ নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি মেয়র সাইদ কোখন। বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের নগর ও পরিবেশ সম্পাদক ডক্টর ফরিদা নিলুফা। বুয়েটের কেমিকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া, মানবাধিকার কর্মী এডভোকেট সুলতানা কামালের সভাপতিত্বে অগ্নিঝুঁকিমুক্ত ও নিরাপদ পুরান ঢাকা শীর্ষক গণশুনানিতে উপস্থিত ছিলেন এসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম এন্ড ডেবলাপমেন্ট-এর নির্বাহী পরিচালক শামছুল হুদা, আসকের নির্বাহী পরিচালক শিপা হাফিজ, রাসট-এর নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহা পরিচালক ডক্টর সুলতানা আহমেদ, এফবিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক আব্দুল সালামসহ ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পুরান ঢাকার জনগণ উপস্থিত ছিলেন। বক্তাগণ উল্লেখ করেছেন রাসয়নিক পদার্থ দাহ্য ক্যামিকেল কারখানা কোনো অবস্থায় আবাসিক এলাকায় রাখা যাবে না। যত দ্রæত সম্ভব এসব কারখানা নির্দিষ্ট স্থানে পুন:স্থাপন করতে হবে। বার বার সারা দেশে যেসব অগ্নি দুর্ঘটনা হচ্ছে সেগুলো কোনো অবস্থায় গ্রহণযোগ্য নয়। এসব দুর্ঘটনা মানব সৃষ্ট অসচেতনতামূলক হিসেবে দেখতে হবে। আগুন দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে বাসা বাড়ি বিল্ডিং সব ধরনের ক্যামিকেল পদার্থ থেকে মুক্ত রাখতে হবে। তাহলে প্রাণহানী রক্ষা পাবে। অগ্নিকান্ডের ফলে গঠিত সবগুলো তদন্ত কমিটির সুপারিশ পর্যালোচনা করে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। আলোচনা, শোক প্রকাশ আর তদন্ত রিপোর্ট ফাইল বন্দি রেখে অগ্নি দুর্ঘটনা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব না। অবিলম্বে অগ্নি দুর্ঘটনা থেকে রক্ষায় সব ধরনের ক্যামিকেল পদার্থ আবাসিক এলাকা থেকে সরিয়ে ফেলা এবং ষড়যন্ত্রমূলক অগ্নিকান্ডের কারণ নির্ণয় করে দোষীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও জনগণকে তাদের প্রয়োজনীয় সাহায্য সহযোগীতা দিতে হবে।
লেখক: গবেষক, প্রবন্ধিক


































