আর কত আগুন সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব দেখব?
২৯ মার্চ ২০১৯, ০৩:৪৭ পিএম
সড়ক দূর্ঘটনা, ভবন ধস, কিংবা ধর্ষণ, জঙ্গি হামলার মতই দুর্বিষহভাবে প্রতিনিয়ত শহর কিংবা শহর থেকে দূরে, নিকটে উঁচুউঁচু দালান, বস্তি, মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহ ঘটনা ঘটছে। অগ্নিকাণ্ডের এসব ঘটনা যেন নিছক দূর্ঘটনা নয়, দুর্বিষহ হামলা, হত্যাযজ্ঞ! যেন ইচ্ছা প্রণোদিতভাবে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে আমার ভাই-বোন-আত্নীয়-স্বজনকে, দেশের নিরহ মানুষকে, হাজারও মানুষের স্বপ্নকে! আগুন দিয়ে ঘটানো এই সন্ত্রাসী ধ্বংসযজ্ঞ কোনক্রমেই নিরাপদ থাকতে দিচ্ছে না দেশের জনগণকে। ভয়ের ত্রাস সবাইকে তাড়া করে ফিরছে সর্বদা। এক সপ্তাহ, মাস পাড় হতে না হতেই, মানুষের শরীরে পোড়ার ক্ষত নিবারিত হওয়ার আগেই আবারও ঘটছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। এসব ঘটনায় কাকে দায়ী করব? অগ্নিকাণ্ড থামাতে কেউই কি তৎপর নয়? প্রতিবারই কি সরকার এর দায়ভার নিবে? ব্যক্তি-মালিকরা কি প্রতিবারই মুক্তি পেয়ে যাবে? যারা দেশের মানুষের নিরাপত্তা দেওয়ার কাজে নিবেদিত, তারাই বা কি করে?
আমি মনে করি, অগ্নিকাণ্ডসহ জনদূর্ঘটনার দায়ভার সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিতে হবে। প্রথমেই দায়ভার চলে আসে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। তারা কি তাদের দায়িত্বের প্রতি আস্থাবান? আমাদের এতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে এবং এটা স্বাভাবিক। উঁচুনিচু ভবনে, কারখানায় আগুন লাগার আগে ফায়ার সার্ভিসের জনবল ভবন পরিদর্শনে আসে না এবং এমন দৃশ্য কখনও দেখিনি! আগুন লাগলে তারা বীরত্ব দেখাতে আসে মাত্র। আগুন লাগলে তাদের ব্যবসা বাড়ে বৈকি। আইনেই বলা আছে আগুন নেভাতে তাদের টাকা দিয়ে নিতে হবে। তারা কখনই স্বেচ্ছায় ভবন পরিদর্শনের কাজ করে না। নির্মাণের সময়ও খোঁজ নেয় না যে ভবনটিতে আগুন প্রতিরোধে কি কোন ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে? ফায়ার সার্ভিসের কাজ শুধু আগুন নেভানো নয়, আগুন থেকে নিরাপদ থাকতে, আগুন প্রতিরোধে সাধারণ জনগণকে সচেতন করা। নিয়ম মানাতে ভবন মালিকদের বাধ্য করা।
ফায়ার সার্ভিসের পরপরই দায়ভার রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক)। রাজউক চোখ বন্ধ করে ভবন তৈরির অনুমোদন দিয়ে দেয়। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে বেহায়ার মত মিডিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, ‘ভবনটি নিয়ম মেনে তৈরি করা হয়নি। দশ তলার অনুমোদন নিয়ে বিশ তলা করেছে। অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা নেই। ইত্যাদি।’ তারপরই একের দোষ আরেকজনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে খালাস হয়ে যায়। আর ফায়ার সার্ভিসের বাহিনী আগুন লাগলে শুধু পানি নিয়ে ছুটে আসে। তাদের ইউনিট বাড়ছে, বেতন বাড়ছে, বাড়ছে না গাড়ি বহর, বাড়ছে না সরঞ্জামাদি। আগুন নেভানোর নেই কোনো উন্নত প্রযুক্তি। আশ্চর্যের বিষয়, উঁচু ভবন থেকে মানুষ নামাতে সুউচ্চ একটি মইও নেই গুটিকয়েক ক্রেন ছাড়া! প্রতিটি অগ্নিকাণ্ড থেকে জনগণ দেখছে, দেশে আমাদের নিরাপত্তার কতটা ঘাটতি। কেউই নিরাপদ নেয় যে আমি যেখানে রয়েছি, কখন যেন সেখানেও আগুন লেগে পুড়িয়ে ফেলবে জীবন্ত মানুষকে। মুহূর্ত্বেই বইতে পারে অগ্নি-ঝড়।
প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পেছনে অতিলোভী ব্যক্তি-মালিকরা সর্বাংশে দায়ী। অতি ধনী হতে গিয়ে মানুষের জীবন যেন তাদের কাছে কিছুই না। মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি আজ অর্থবৃত্তের বেড়াজালে আবদ্ধ। অতি ধনীরা ভবন তৈরি করছে; কিন্তু কখনই ‘বিল্ডিং কোড’ মেনে ভবন তৈরি করছে না। অগ্নিকাণ্ড, ভবন ধস, ভুমিকম্পের সময় ভবন থেকে দৌঁড়ে নামতে তারা বিকল্প নিরাপত্তা সিঁড়ি তৈরি করছে না। পাশাপাশি ভবনের মাঝে কোনো ফাঁকা জায়গা রাখছে না যাতে দূর্ঘটনার সময় অনায়াসে উদ্ধার তৎপরতা চালানো যায়। আশ্চর্যের বিষয়, যারা এসব ভবনকে ব্যবহার করছে, তারাও যেন অমানবিকতায় পূর্ণ। লিফট নির্ভরতা মানুষকে প্রতিনিয়ত দূর্ঘটনামুখি করছে। ফলে সিঁড়িগুলো কার্টন, বস্তায় ভরপুর থাকছে। একজন মানুষ যে সিঁড়ি বেয়ে ছাঁদে যাবে কিংবা নিচে নামবে, তারও কোনো উপায় নেই। স্বাভাবিকভাবইে প্রশ্ন জাগে, এমন আগুন সন্ত্রাস থেকে বাঁচতে কোনো নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে না কেন? নাকি দেশের মানুষ মারতে কতিপয় ব্যক্তিরা প্রতিনিয়ত নাটক সাজাচ্ছে?
প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা শুধু মানুষের শরীরকে পোড়ায় না, মানুষের মন-মানসিকতাকেও পুড়িয়ে ফেলে। এক অজানা ভয় কাজ করে এই ভেবে যে আমি তো এদেশের কোথাও নিরাপদ নই। তবে আমাকে নিরাপত্তা দেবে কে? এ ক্ষমতা যে রাষ্ট্রের হাতে সমর্পিত। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষরা যদি অনিয়ম, নৈরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে দোষ করে, তবে তাদের বিচার করবে কে? তবে শেষ কথা হল, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দোষী যেই হোক, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আগুন নিভে যাওয়ার আগে, আগুনে পুড়ে মরে যাওয়া ব্যক্তির লাশ দাফনের আগে, আগুনে পুড়ে যাওয়া ক্ষত শুকানোর আগেই আগুন সন্ত্রাসীদের বিচার হোক। আগুন সন্ত্রাসীদের মধ্যে আইন না মানার যে প্রবণতা পরিলক্ষিত, তা দূরীকরণে সরকারকে সচেষ্ট হওয়ার আহ্বান করছি। অগ্নিকাণ্ডসহ যাবতীয় দূর্ঘটনা হতে নিরাপদ রাখা সরকারের দায়িত্ব এবং জনগণ সার্বিক নিরাপত্তা চায়।
মোহাম্মদ অংকন: কলামিস্ট, ঢাকা।























