একক পরিবারেই বিবাহ বিচ্ছেদের প্রধান কারণ

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

২৪ নভেম্বর ২০১৮, ০৫:৩৫ পিএম


একক পরিবারেই বিবাহ বিচ্ছেদের প্রধান কারণ

পরিবার মানেই হাসি কান্না, ছোট ছোট মান অভিমান খুনসুটি আর হৈহুল্লো। পরিবার মানেই মা বাবা সন্তান, ভাইবোন মিলে এক বন্ধন। কিন্তু এখনকার পরিবারগুলো আর আগের মতো নেই। যৌথ পরিবার খুব একটা চোখেই পড়েনা। কিছুটা বাধ্য হয়ে কিছুটা বাস্তবতার বেড়াজালে গড়ে উঠছে একক পরিবার। যদি পক্ষ বিপক্ষে দাড় করানো হয় যৌথ ও একক পরিবারকে, মনে হয়না কেউ জিততে পারবে। কারণ একক পরিবারের সুবিধা অসুবিধা যেমন আছে, তেমনি যৌথ পরিবারেও রয়েছে সুবিধা অসুবিধা। আজ থেকে কুঁড়ি বছর আগেও চাকরীজীবী মেয়েদের সংখ্যা ছিলো খুব কম। এখন বেড়েছে অনেক, নারীরা শিক্ষিত হচ্ছে, হচ্ছে স্বাবলম্বী। একদিকে পরিবার হচ্ছে একক, অন্যদিকে মায়েরা হচ্ছেন চাকুরীজীবী। দুইদিক সামাল দিতে হুঁশ হারিয়ে দুজনের বনিবনা না হয়ে হচ্ছে বিবাহ বিচ্ছেদ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, গত সাত বছরে বিবাহ বিচ্ছেদের প্রবণতা বেড়েছে ৩৪ শতাংশ। অল্প শিক্ষিত দম্পতিদের চেয়ে শিক্ষিত দম্পতিদের মাঝে বিবাহ বিচ্ছেদ হচ্ছে বেশি। এজন্যে অনেকে শিক্ষিত নারীর জীবিকাকে দোষারোপ করছেন অনেকে, কিন্তু এর পেছনের গল্প অনেকেই খুঁজতে চাননা। একজন চাকুরীজীবী পুরুষ তার মহিলা সহকর্মীর সাথে ঘুরতে পারেন, খেতে যেতে পারেন। কিন্তু একজন কর্মজীবী নারী যখনিই তার সহকর্মীর সাথে বাইরে যান, খেতে যান, ঘুরতে যান, তখনিই এই নিয়ে শুরু হয় অশান্তি, যার পরিনাম বিবাহ বিচ্ছেদ। এই বিচ্ছেদের ফলে তারা নতুন জীবন বেছে নিলেই তাদের সন্তানদের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। 

মতের অমিল, সমঝোতার অভাব, শ্রদ্ধাবোধের ঘাটতি,

পুরুষের আদিপত্য, পরকিয়া মুলতো এসব কারণেই বেশি বিবাহ বিচ্ছেদ হচ্ছে। তবে শারীরিক দুর্বলতা, প্রত্যাশা পূরণের অভাব, পরিবারের সদস্যদের অনধিকার চর্চা, ধৈর্যের অভাব, ক্যারিয়ার নিয়ে সমস্যা হবার ফলেও বিবাহ বিচ্ছেদ হচ্ছে অনেক। আসল কারণ হলো যৌথ পরিবার ভেঙ্গে একক পরিবার হওয়া। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিবাহ বিচ্ছেদের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সন্তানের ওপর।

দিলারা ও তারিকের ১৬/১৭ বছরের সংসার। প্রথম কয়েকবছর ভালো গেলেও তারিকের নতুন সম্পর্ক গড়ে উঠে বাইরে, এই নিয়েই শুরু। বাইরে সম্পর্ক আর ঘরে এসে বিবাহিত বউয়ের উপর অত্যাচার। নুন থেকে চুন খসলেই শারীরিক নির্যাতন, বোনাস হিসাবে মানসিক নির্যাতন তো আছেই। কিছু হলেই তারিক সন্তানদের ডেকে ওদের সামনে শুরু করে কথা কাটাকাটি। দিলারা সন্তানদের ডাকতে নিষেধ করলে তারিক বলে, 'ওদের ও শুনা দরকার।' এরপর থেকে ঘরে জোরে কোন কথা হলেই সন্তানরা ভয় পেতে থাকে, ভাবে এই বুঝি তাদের ডাকতে আসবে। এই ধরনের পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এর সহযোগী অধ্যাপক, হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন--

'মা-বাবার বিবাহবিচ্ছেদ হলে বা একই সঙ্গে থেকেও বনিবনা না হলে তার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে সন্তানের ওপর। মা-বাবা যদি সন্তানের সামনে ঝগড়া করেন বা পরস্পরকে দোষারোপ করতে থাকেন, তাহলে সন্তানের ব্যক্তিত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। সব সময় অতি উৎকণ্ঠায় থাকে সেসব সন্তান। সন্তান যখন বড় হয়, তার ব্যক্তিজীবনেও এই প্রভাব পড়ে। তখন পরিবার গঠন করার সময় মা-বাবার আচরণের প্রতিফলন ঘটাতে পারে। যারা নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বড় হয়, দেখা যায়, তাদের আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তা কম থাকে। সন্তান জন্মদানের পর দায়িত্ববান হতে হবে। মা-বাবার আচরণ সংবেদনশীল না হলে সন্তানও অসংবেদনশীল আচরণ করবে। সেটা মাথায় রেখে দাম্পত্য জীবনে আচরণ-কথাবার্তায় সচেতন হতে হবে।'

কান্তা গ্রাম থেকে শহরে এসে স্কুলে ভর্তি হয়েছে। স্কুলের খাতায় বাবা ও মায়ের দুজনের মোবাইল নাম্বারের জায়গায় কান্তা মায়ের নাম্বার দেয়। কারণ ওর বাবা ওদের ছেড়ে চলে গেছে অন্য জায়গায়, তিনি আবার বিয়ে করেছেন। কান্তার মা সন্তানদের কথা ভেবেই আর বিয়ে করেন নি। আমাদের সমাজে মেয়েদের পায়ে পায়ে বিপদ, মা পরে আবার বিয়ে করলে মায়ের পরের স্বামী কখনও মেয়ের বাবা হয় না। বরং মেয়ের জীবন অতিষ্ঠ হয় তাকে দিকে। অবশ্য এর ব্যতিক্রম ও আছে। কান্তার বাবা কখনও স্কুলে আসেনি, ওর বন্ধুরা আস্তে আস্তে জানতে পারে ওর বাবা নেই, বন্ধুরা খুবই ভালো তাই ওকে এমন প্রশ্নও করে না কেউ। কিন্তু অবচেতন মনে কান্তা ঠিক বাবাকে মনে করে।

বিবাহ বিচ্ছেদে সন্তানদের উপর কি ধরণের প্রভাব পড়ে এ বিষয়ে সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরীন বলেন-

'সমাজে বিবাহবিচ্ছেদ যে হারে বাড়ছে, সেভাবে মানসিকতার পরিবর্তন আসেনি আমাদের। আমরা মানসিকভাবে সমাজের পরিবর্তন নিতে প্রস্তুত হইনি। যে কারণে মা-বাবার সম্পর্কে কোনো সমস্যা হলে সেই পরিবারের সন্তানকে কিংবা ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তানকে কেউ কেউ হেয় করে কথা বলে। এই দোষ সন্তানের নয়। অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবা একটু সহনশীল হলে বা সন্তানের প্রয়োজনে ছাড় দিতে হলে সন্তানের মনের কষ্ট কিছুটা কমানো যায়। সন্তানের চাওয়া মা-বাবাকে গুরুত্ব দিতে হবে। নিজেদের মতামত সন্তানের ওপর চাপানো যাবে না। পারিবারিক সমঝোতা, পরিবারের গুরুত্ব—এগুলো সন্তানকে শেখানোর আগে মা-বাবাকে বিষয়গুলোর গুরুত্ব বুঝতে হবে। মা-বাবা ছাড়াও চারপাশের অন্যান্য মানুষ, কাছের মানুষ ও আত্মীয়দের সহনশীল হতে হবে। তাঁরা বুঝে না বুঝে মনে আঘাত দিয়ে কথা বলেন। এমন কোনো আচরণ করেন, যা সন্তানের মন ছোট করে দেয়। মা-বাবা কারও নামেই কোনো সমালোচনা সন্তানের সামনে করা উচিত নয়।'

পরিবারই সবার প্রথম শিক্ষার জায়গা। একটা শিশু বড় হতে হতে ভালো মন্দ শিখে পরিবার থেকে। পরিবার ওকে ভালো পরিবেশ দিতে পারলে সে সেই মানসিকতায় বড় হয়। পরিবারে ছোটরা বড়দের সম্মান করে দেখলে সেও সম্মান করতে শিখে। বড়রা ছোটদের স্নেহ করতে দেখলে তারাও তাই করতে শিখে। সর্বপ্রথম কথা হলো পরিবারে বাবা মায়ের সম্পর্কের মাঝে শ্রদ্ধাবোধ দেখলে তারাও তা করতে শিখে। বাবা মা দুজনের প্রতি দুজনের সন্দেহ অশ্রদ্ধা তিরস্কার দেখলে সন্তানরা সেভাবেই বড় হয়, তার বা তাদের মাথায় সে ধরণের ভাবনা নিয়েই বড় হয়। যা ভবিষ্যতের জন্যে খুবই খারাপ, এক সময় সে সহপাঠীকে সম্মান করে না, প্রেমিকাকে সম্মান করে না, এমনকি উপযুক্ত বয়সে বিয়ে করা স্ত্রীকেও। অনেক সময় বাবা মায়ের কঠিন সিদ্ধান্তের জন্যে সন্তানের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। একসময় কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন সন্তান, বাবা মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদের পর সন্তান কার কাছে থাকবে। একটি সন্তানের ভবিষ্যত গড়ে তুলতে বাবা মা দুজনেরই প্রয়োজন। কিন্তু আদালত তখন রায় দেন সন্তানের ভাল যেখানে হয় সেখানে থাকার।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানজীব উল আলম বলেন-

'সন্তানের সামনে পরস্পরকে ছোট করা উচিত নয়। এই ধরনের পরিস্থিতিতে সন্তানই মূলত ভিকটিম হয়ে থাকে। বিবাহবিচ্ছেদে দেখি মা-বাবা পরস্পর পরস্পরকে অনেক ছোট করে অসম্মানজনক কথা বলেন। সেটি সন্তানের মনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমরা দেখি সন্তানের হেফাজত পাওয়ার জন্য মা-বাবা মিথ্যা কথার আশ্রয় নেন। সন্তানকেও সেগুলো শেখাতে থাকেন। যা খুবই অনুচিত। সন্তান যাঁর কাছে থাকলে ভালো থাকবে, আদালত সেই সিদ্ধান্তই নেন। যাঁর হেফাজতেই সন্তান থাকুক না কেন, সন্তানকে এটা বোঝাতে হবে মা-বাবা দুজনেই তার সঙ্গে আছে। মা-বাবা সব সন্তানের কাছে আদর্শ। পরস্পরের বিরুদ্ধে এমন কোনো কথা বলা উচিত নয়, যাতে সন্তান মা বা বাবা কাউকে ভুল বোঝে।'

একসঙ্গে থাকতে না পারলে সন্তানকে বলতে হবে, ‘স্বামী-স্ত্রী হিসেবে আমাদের আদর্শগত মিল হয়নি। তাই থাকিনি। কিন্তু তোমার পাশে থাকব।’ সন্তান যার কাছেই থাকুক, তাকে মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়াটা জরুরি। এটাও ঠিক, একজনের কাছ থেকে সঠিক শিক্ষা পেয়েও সন্তান মানুষ হতে পারে। সন্তানের সঙ্গে দেখা করা নিয়েও কোনো সমস্যা করা ঠিক নয়। সন্তান যখন যাঁর সঙ্গে থাকতে চাইবে, দেখা করতে চাইবে, সেটি তাঁকে করতে দিতে হবে। মা বা বাবা যদি সন্তানকে দেখতে চান, সেটিও প্রাধান্য দিতে হবে।'

ঢাকা সিটি করপোরেশনের তথ্যানুযায়ী, ২০১০-২০১৬ সাল পর্যন্ত রাজধানীতে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় বায়ান্ন হাজার। হিসাবে মাসে গড়ে ৭৩৬ টি, দিনে ২৪ টির বেশি এবং ঘণ্টায় একটি তালাকের আবেদন করা হচ্ছে। বিচ্ছেদের যেসব আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে তার মধ্যে ৮৭ শতাংশ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে পরকীয়ার জের ধরে। কোনো ক্ষেত্রে স্বামীর পরকীয়া, কোনো ক্ষেত্রে স্ত্রীর পরকিয়া হলেও তথ্য বলছে বিবাহ বিচ্ছেদে নারীরা এগিয়ে আছে। জরিপে দেখা গেছে, ৭০.৮৫ ভাগ বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন  করছেন নারী আর ২৯.১৫ ভাগ বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন দিচ্ছেন পুরুষ। নারীদের হার বেশি হবার পেছনে মনোবিজ্ঞানীরা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। আমাদের বারবার ভাবতে হবে, মা বাবা কেই ভাবতে হবে সন্তানদের কথা। নিজেদের সুখের জন্যে ওদের ভবিষ্যত নষ্ট নয়। একান্তই যদি বিবাহ বিচ্ছেদে যেতে হয় সন্তানদের কথা ভেবে ওদেরকে দুজনের সাথে চলতে দেয়ার দুটি পরিবারের সাথে মিশতে দেবার ব্যবস্থা করতে হবে রাখতে হবে। বিশেষ দিনে সন্তানকে নিয়ে কিছু সময় কাটানোর ব্যবস্থা করে ওর ভবিষ্যত যতটা সম্ভব ভালো করতে হবে। সন্তানদেরকে যৌথ পরিবারের গল্প বলতে হবে, যৌথ পরিবারের সাথে চলতে দিতে হবে। 

লেখক - সাহিত্যিক কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।

Ads