শিক্ষায় নৈতিক শিক্ষা
০৭ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:৪০ পিএম
শিক্ষায় নৈতিক শিক্ষার কী অবস্থা তা পর্যালোচনা দরকার। সমাজে এখন নৈতিক শিক্ষার চরম অভাব লক্ষ্যনীয়। শিক্ষায় মানুষ ও সমাজকে আলোকিত করার কথা। শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো নৈতিক চরিত্র তৈরী। নৈতিক শিক্ষা বলতে যা বুঝায় তা হলো, মানুষের মননে অন্তরে আদর্শিক গুনাগুন তৈরী হওয়া। মানুষের প্রতি ভালোবাসা জাগ্রত করা। অন্যের প্রতি সম্মান স্নেহ শ্রদ্ধাসৃষ্টি করা। সৃষ্টি ও মানুষের প্রতি দয়া মানবতা দেখানো। অন্যের মতের চিন্তা চেতনায় উদারতা দেখানো। অপরের সুখ শান্তি আপদে বিপদে কাছে থাকা। শিক্ষা মানুষকে মানুষের প্রতি ভালোবাসা দেখাতে জাগ্রত করে। মানুষ ও পশুর চরিত্রের মধ্যে ডিবাইড করে শিক্ষা। পশু যা করে মানুষ তা করেনা। পশু যা খায় আর ত্যাগ করে মানুষ সেভাবে করেনা। মানুষ কতগুলো মানবীয় গুনাগুন নিয়ে চলতে শিখে। পশুর চরিত্রে তা পাওয়া যায়না। পশুর মধ্যে পঞ্চ ইন্দ্রীয় নেই। মানুষের মধ্যে তা আছে। মানুষ কিছু একটা করার পূর্বে তার জ্ঞান বিবেক দিয়ে চিন্তা করে। পশুর চরিত্রে তা থাকেনা। পশুর জন্য কোনো একাডেমিক শিক্ষার ব্যবস্থা নেই। মানুষ তৈরীর জন্য স্কুল কলেজ বিদ্যালয় আছে। পশুর কোনো মান সম্মান নেই। মানুষের মান ইজ্জত আছে। মানুষকে মানুষ হিসেবে তৈরী করার উদ্দেশ্যে হাজার ধরনের মানুষ তৈরীর কারখানা আছে। যেখানে শিশুকাল হতে তার হাতে কলমে শিক্ষার ব্যবস্থা থাকে। সে বিদ্যালয় ও কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে মানুষ গড়ার কারিগর আছে। তাদের নাম শিক্ষক, প্রফেসর, অধ্যাপক, মাস্টার ইত্যাদি। দেশে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, ভার্সিটির অভাব নেই। প্রতিদিন শত শত স্কুল প্রতিষ্টা হচ্ছে। নামী দামী স্কুল কলেজ, নামী দামী পরিবার পরিজনের ছেলেরা সেখানে ভর্তি হচ্ছে। বই ব্যাগ, শিক্ষা সামগ্রীর ব্যবহার সেখানে দেখা যায়। স্কুল ড্রেস আর বাহারী সেজে স্কুল কলেজে যায় শিক্ষার্থীরা। ভোর হতে শুরু হওয়া এসব আধুনিক স্কুল, কলেজ, বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, ক্যাডেট স্কুলে ভর্তি করতে অভিভাবকদের মাথার ঘাম পায়ে পড়ে। হাজার হাজার লাখ লাখ টাকা খরচ করে প্রিয় ছেলে সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করান। টাকার কথা চিন্তা করা হয়না। সামর্থনুযায়ী স্কুলে ভর্তি করে থাকে সন্তানদের মানুষ হিসেবে তৈরী করার জন্য। সে ক্ষেত্রে অভিভাবকদের পরিশ্রমের সীমা থাকেনা। স্কুল কর্তৃপক্ষকে সাধ্যমত বেতন ভাতা সমস্ত খরচ দিয়ে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলার উদ্দ্যেশ্যেই সন্তানের পিছনে এতগুলো ত্যাগ আর ভালোবাসা। যে সকল বিদ্যালয়ে সন্তানরা পড়ালেখা করে সেখানে প্রায় সব শিক্ষক-ই নিজ নিজ পেশায় দক্ষ। তাদের দক্ষ পরিচালনা আর শিক্ষার গুনগতমান অর্জন করার জন্য এতো কষ্ট আর ত্যাগের অর্থ দিয়ে শিক্ষার্থীদের সেখানে ভর্তি করা হয়। শিক্ষকের সার্টিফিকেট যোগ্যতা নিয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। শিক্ষক সেখানে তার যোগ্যতা বলে শিক্ষক হয়েছেন। তাকে নিযোগ করা হয়েছে। তার নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকতা সব ঠিক আছে। এ শিক্ষকসমাজের পিছনে রাষ্ট্র ও সমাজের লাখ লাখ কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। দেশের স্বাশকগোষ্টী শিক্ষকসমাজের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে তাদের গুরুত্বপূর্ন সমস্ত দাবী দাওয়া পূরণ করে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রের অন্যসব সেক্টরের চেয়ে অধিক হারে সুযোগ সুবিধা দিয়ে, শিক্ষকদের প্রতি সম্মান দেখাচ্ছে বলে সমাজ দেখছে। এতো সব সুযোগ সুবিধা দেয়ার পরও শিক্ষকমন্ডলী আমাদের ছেলে সন্তানদের কী দিচ্ছেন সেটায় এখন সমাজ সচেতন অভিবাক মহল ভাবছেন। এ বিষয়ে অভিভাবকদের ভাবনা আর চিন্তার শেষ নেই এ জায়গায়। একজন সন্তানের পিছনে লাখ লাখ টাকা খরচ করে নামী দামী স্কুলে ভর্তি করে যে সন্তান ডিগ্রি নিয়ে ঘরে ফিরে আসে তখন সন্তান পরিবার সমাজ ও রাষ্টের জন্য কী নিয়ে আসছে। সন্তান কী শিখলো তার স্কুল, বিদ্যালয় খেকে। কী নিয়ে আসলো সমাজের জন্য। পরিবার পরিজন মাতা পিতা ভাইবোন সহকর্মীর উদ্দেশ্যে ব্যবহারিক কী শিক্ষা পেলো স্কুল থেকে এসব কয়েকটি বিষয় কখনো কী সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র চিন্তা করছে? তার চাল-চলনে, ভাষায়-কথায় কী ধরনের পরিবর্তন হলো, সে কী বাস্তবে নীতি নৈতিকতাসম্পন্ন কোনো জ্ঞান পেলো কিনা। তার আচার ব্যবহারে কোনো আদর্শিক পরিবর্তন হলো কী না। শিক্ষার্থী বাস্তব জীবনে তার চরিত্র গঠনে স্কুল থেকে কোনো আদর্শ পেয়েছে কিনা। পরিবার ও সমাজ তাকে উন্নত চরিত্র নৈতিকতা অর্জনে কোনো শিক্ষা দিচ্ছে কিনা এসব বিষয় এখন বেশী করে ভাবভার সময় এসেছে বলে মনে হয়। নির্দিষ্ট ভাবে কতিপয় গতানুগতিক বই আর সিলেবাস দিয়ে স্কুল জীবনের পাঠ্য কার্যক্রম শেষ করে মানুষ তৈরী করা যাবেনা। মানুষ হিসেবে সন্তানদের তৈরী করতে হলে প্রথমে বই পুস্তক আর সিলেবাসে নৈতিক শিক্ষায় গুরুত্ব থাকতে হবে। সিলেবাসে নৈতিক শিক্ষার অধ্যায় থাকতে হবে। শিক্ষকদের নিকট নৈতিক শিক্ষা ও আদর্শের অনুশীলন চর্চা ও বাস্তবায়ন থাকতে হবে। এ ধরনের শিক্ষা আদান প্রদান না থাকলে গতানুগতিক সিলেবাস আর বই পড়ে সে ডাক্তার হবে, ইন্জিনিয়ার হবে, রাজনীতিবীদ হবে, কিন্তু নৈতিকতা সম্পন্ন হিতাহিত জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ তৈরী হবেনা। মানবতার কল্যাণে সমাজকে আলোকিত করতে হলে আলোকিত মানুষ তৈরীর কারখানা তৈরী করতে হবে। আলোকিত সমাজের জন্য আলোকিত শিক্ষক থাকা চাই। নৈতিক আদর্শ শিক্ষা বিস্তারে আদর্শিক শিক্ষক থাকা চাই। শিক্ষায় নীতি ও গুনগত পরিবর্তন থাকতে হবে। মাত্র এক যুগ দুই যুগ আগেও এতো ধরনের বই আর খাতা স্কুল ভার্সিটি ছিলোনা। তখন শিক্ষা আর কোন মন্ত্রে মানুষ আলোকিত শিক্ষা পেয়েছিলো, কোন মন্ত্রে শিক্ষার্থী নৈতিক শিক্ষা অর্জন করেছিলো, আধুনিক যুগে আধুনিক শিক্ষা বিস্তারে কেনো নৈতিক চরিত্র হারিয়ে যাবে সেটা অভিবাকদের মাথায় আসছেনা। শিক্ষা যতই উন্নত হচ্ছে ততই নৈতিক চরিত্রের অধপতন লক্ষ্যনীয়। শিক্ষার গুনমান ছাত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেনা। তার ক্রোধ লালসা চিন্তা চেতনায় পরিবর্তন হচ্ছেনা। যত বেশী শিক্ষিত আর জ্ঞানী ডিগ্রী অর্জন করছে তার মধ্যে লোভ আর লালসা দানা বাঁধছে। লোভ আর লালসার কোনো গতি থামছেনা। শিক্ষার উদ্দেশ্য কি অর্থ আর লালসা অর্জন করা! যদি অর্থ আর লালসা কাম ক্রোধ অর্জনের জন্য শিক্ষা হয়ে থাকে তাহলে আজকের শিক্ষার উদ্দেশ্য ও ফসল ঠিকই আছে। আর যদি তার বিপরীত হয়ে থাকে তাহলে শিক্ষাকে করতে হবে নৈতিকতা সম্পন্ন শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষায় থাকতে হবে নৈতিক গুনাবলী সম্পন্ন শিক্ষা। মানবতা পরমত সহিংষুতা মানবীয় গুনাবলী সম্পন্ন শিক্ষা। শিক্ষার নৈতিক গুনাবালী সম্পন্ কার্যক্রম যতদিন না চালু হবে, সে পর্যন্ত আজকের গতানুগতিক শিক্ষা থেকে কোনো নৈতিক গুনাগুন পাওয়া যাবে বলে মনে হয়না। শিক্ষার প্রধান উদ্ধেশ্য হওয়া দরকার নৈতিকতা অর্জন। নৈতিক শিক্ষা বিস্তারে শিক্ষক অভিভাবক সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। ছাত্রের কাছে খাতা কলমের পরিবর্তে অস্ত্র, ইয়াবা, মাদক যেনো স্থান করে নিতে না পারে। নব যৌবন শিশুকে মানুষ হওয়ার জন্য মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষাপ্রতিষ্টান শিক্ষক ও বিদ্যালয়ে দেয়া হয়। সে যেনো সেখান থেকে ভয়ংকর চরিত্রের হিংস্র পশু হয়ে না আসে, সে শিক্ষায় চায় অভিভাবকসমাজ ও রাষ্ট্র। সেই নৈতিক শিক্ষার প্রসার ও বাস্তবায়ন চাই। এ শিক্ষার প্রসার ঘটাতে দেরী হলে শিক্ষক শিক্ষককে, শিক্ষার্থী শিক্ষার্থীকে, সতির্থ সতির্থকে মারা মারি আর খুনা খুনীর চরিত্রই দেখাবে পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রকে। আসুন নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষা কার্যক্রমকে উন্নত করি। আগামী দিনের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নৈতিক শিক্ষায় গড়ে তুলি।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক























