ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন : আমার দেশে আমি-ই নিরাপত্তাহীন?
৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৪:১৫ পিএম
সম্প্রতি বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামে নতুন একটি আইন জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছে। কিন্তু এই আইনটি পাস করার মাধ্যমে দেশের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এটি বহুমাত্রিক বির্তকেরও জন্ম দিয়েছে। এই আইনে অপরাধীকে নয় বরং অপরাধ কার্যের সাক্ষীকেই অপরাধী বানানো হয়েছে। এছাড়া সাজা ও জরিমানা নিয়ে রয়েছে নানা অসঙ্গতি। এই আইন নিয়ে শুধু দেশের মানুষ নয়, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অতঃএব নিঃসন্দেহে বলা যায়, আর্ন্তজাতিক মহলে বাংলাদেশ ও বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই বিষয়ে আইন প্রণেতাদের কিংবা ক্ষমতাসীন সরকারের বোধদয় ঘটেছে কী না তা আমি জানি না। এ প্রসঙ্গে আর্ন্তজাতিক বিষয়টি না হয় বাদই দিলাম, দেশের মানুষের প্রতিবন্ধকতা বিবেচনায় আইনটির কী পরিবর্তন সাধন করা যায় না? আমার দেশে আমি-ই নিরাপত্তাহীন হয়ে থাকব! বিষয়টি ভাবতেই যেন অবাক লাগে!
আমাদের দেশে ক্রমশ সাইবার অপরাধ বাড়ছে। তাই এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সাইবার অপরাধ দমনে ভূমিকা রাখবে। এবং এটিই আমাদের দেশের জন্য যেমন নতুন একটি পদক্ষেপ; তেমনই অন্যান্য দেশও পরবর্তীতে এই আইনকে অনুসরণ করে তাদের দেশে আইন তৈরি করবে, এর ইঙ্গিত কিঞ্চিৎ হলেও আমরা পাই। আইনটি ‘ট্রায়াল ভার্সন’ হিসাবে দেখতে অনেক দেশই প্রস্তুত। তাই অনেক আর্ন্তজাতিক সংস্থাও এতে ‘নাক গলাচ্ছে’। এটা আমাদের দেশের জন্য মঙ্গলজনকই বলা চলে। কেননা, আইনটি হতে পারে সারা বিশ্বের দৃষ্টান্তস্বরুপ। কিন্তু সে আশায় ‘গুড়ে বালি’ দেখছি। বরং আইনটির গুণগত মান ও নৈতিক দিক নিয়ে দেশে-বিদেশে প্রশ্ন উঠেছে। এর থেকে লজ্জ্বাজনক বিষয় জাতির জন্য কী-বা হতে পারে! এ প্রসঙ্গে এই গল্পটা মানায়- একজন ছাত্র যখন গোল্ডেন এ প্লাস পায়, তখন প্রতিবেশী তার সন্তানের জন্য ঐ ছাত্রকে অনুকরণ করার চেষ্টা চালায়। আর বিপরীতটা হলে তথা ভাল ছাত্র হয়েও খারাপ ফলাফল করলে মূখের ওপর কটু কথা বলতে ভয় করে না। বরং বলার সুযোগ পায়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়েও দেশে তাই হতে চলেছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এটি তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গেই যে সাংঘর্ষিক তাই নয়, সংবিধানের মূল নীতিরও পরিপন্থী। সরকারের ভাষ্য, দেশের সরকারী অফিস, আদালত, প্রতিষ্ঠান হতে দুর্নীতি কমিয়ে আনতে সরকার সর্বদা অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু আইনের ভাষা বলছে অন্য কথা। ‘দাপ্তরিক গোপনীয়তা লঙ্ঘন শাস্তিযোগ্য’ বলে বিবেচিত হলে ক্ষমতাসীনদের কিংবা সরকারের দুর্নীতির প্রসঙ্গ জনসমক্ষে আসবে কেমন করে? না কি আইনটি পাস হলে কোনো সরকারই দুর্নীতি করবে না! এ আইনটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করা সংবাদকর্মীদের পক্ষে একটি কাঁটা স্বরুপ। আজকাল সাংবাদিকরা সাধারণ সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েও হয়রানির শিকার হয়। যখন আইনটির কার্যকারীতা শুরু হবে, তখন শুধু হয়রানি নয় ‘কিশঘুষির’ সম্মুখীন হবে। সাংবাদিকরা মারমূখি পরিস্থিতিতে পড়লে সরকারের আর জবাবদিহি করা লাগবে না! এই যদি হয় আইনটির মূল উদ্দেশ্য তাহলে আমরা কোনো সময়ই দুর্নীতি বিরোধী সরকার পাব না। সব সরকারই হবে দুর্নীতিবান্ধব সরকার।
আমরা কেউই এটা অস্বীকার করতে পারব না যে বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এ নিয়ে আমরা অনায়াসে গর্ব করতে পারি। এ দেশে রয়েছে মানবতা ও ন্যায়-নিষ্ঠা। কখনও মানবাধিকার খর্ব করার মতো বড় কোনো ঘটনা ঘটে না। শুধু তাই নয়, এ দেশে রয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কারণে এসব কিছু পরম্পরা হুমকির মুখে পড়বে। এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় গণতান্ত্রিক সমাজে বাংলাদেশের যে ভাবমূর্তি রয়েছে, সেটি সর্বপ্রথম বিনষ্ট হবে। এই আইন দ্বারা কে কখন কার দ্বারা অকারণে নিগ্রহের শিকার হবে তা ঠিক করে বলা মুশকিল। সরকারপ্রন্থী কিংবা নিরপেক্ষ অনেকেই ডিজিটাল নিরাপত্তাকে আইনকে স্বাগত জানিয়েছে; কিন্তু তারাও যে নিরাপত্তা নামক অনিরাপত্তার ফাঁন্দে পড়ে বগা হয়ে কাঁদবে না তার কোনো নিশ্চয়তা দেখছি না। বিষয়টি এরকম হবে, বাবার চোখের সামনে থেকে ছেলেকে যখন হাজতে নিয়ে যাবে, তখন বাবা ভাববে- আমার ছেলে কাউকে না করল হত্যা, না করল কোনো বড় ধরনের দোষ আর পুলিশ কী না ছেলেকে ধরে নিয়ে যায়! হায় রে দেশের আইন-কানুন! তোর কপালে লাথি মারি!
বাংলাদেশে অনেক গুরুত্বতর বিষয়েও এখনো কোনো আইন নাই। আবার ছোটোখাটো বিষয়েও অনেক আইন আছে। যাইহোক, আইন থাকাটাই ভালো; বরং না থাকাটা মন্দ। আর এসব আইন রাষ্ট্রের সকল মানুষের জন্যই করা হয়। জনগণের জন্য করল আর ক্ষমতাসীনদের জন্য করল না তা কিন্তু নয়। ক্ষমতাসীনরাও দেশের মানুষ, আমরাও (জনগণ) দেশের মানুষ। আইন সকলের জন্যেই প্রণীত এবং আইন সকলের জন্য সমান। কিন্তু বর্তমানে এই ধারণাকে পরিবর্তন করেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কেননা, এই আইনের ধারা শুধু ক্ষমতাসীনদের অবারিত সুযোগ করে দিবে। আমরা সাধারণ জনগণকে ‘হাতে প্রাণ’ নিয়ে এ দেশে কথা বলতে হবে। দু কথা ফেসবুকে লিখবেন তো পুলিশ আপনাকে, আমাকে ঘর থেকে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাবে। পুলিশকে গ্রেপ্তারের সে সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। কোনো গ্রেপ্তারী পরোয়ানা লাগবে না। আর এতে করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার শতভাগ হবে তা এখনই নির্ণয় করা সম্ভব। আর যাদের ছোটোখাটো শত্রু রয়েছে, সেই শত্রুরা এই আইনের সুযোগে সৎকেও জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়বে। কী ভয়াবহ ব্যাপারই না হতে চলেছে দেশে!
আমরা লেখকরা কখনই দেশ-জাতির বিরুদ্ধে নই। কিংবা দেশের আইনের বিরুদ্ধে নই। দেশের মঙ্গলে আমরা গঠনমুলক আলোচনা করব। এটা স্বাভাবিক। দেশে যখন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজন পড়েছে, তখন তা প্রণয়ন করা হোক। আমরা কখনই তার বিরোধীতা করার মনোবল পোষণ করি না। কিন্তু সার্বিক জনগণের কথা বিবেচনা করা হবে না কেন? সেখানেই আমাদের যত প্রশ্ন। একজন সাংবাদিক তার পেশাদারিত্বের বিবেচনায় হোক কিংবা দেশের স্বার্থে হোক, তিনি কী সত্যকে উদঘাটন করতে পারবে না? হ্যাঁ, পারবে। কিন্তু এ আইন প্রণয়নের ফলে সাংবাদিকতায় যে প্রতিবন্ধকতা আসছে, তা প্রতিরোধ করবে কোন আইন? তাই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে মুক্তমনা সকলেই নিরাপত্তা চায়। আমরা আশা করি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি ‘আইন সকলের জন্য সমান’ নীতিকে মান্য করেই প্রণয়ন করা হবে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন করা হবে। আমাদের দেশে আমরা কেউই অনিরাপত্তায় থাকতে চাই না। অতঃএব নিরাপত্তার সড়ক নির্মিত হোক দেশের সকলের জন্য।
লেখক: সাহিত্যিক ও কলামিস্ট, ঢাকা।























