দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চীন- পর্ব-০১
৩১ জানুয়ারি ২০১৮, ০৫:৩২ পিএম
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উদ্ভব হয়েছিল তিনটি ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থানের মাধ্যমে। দেশ তিনটি হল জার্মানী ইটালী এবং জাপান। তারা বিশ্বে নিজেদের আধিপত্য বাড়ানোর রাজনীতিতে মেতে উঠেছিল। কিন্তু এই ফ্যাসিজমের পাশাপাশি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিজিত শক্তিসমূহের সমসাময়িক ক্ষমতার রাজনীতিতে আধিপত্যবাদ এর সাথে সংযুক্ত হয়। প্রথম মহাযুদ্ধের পর ১৯১৯ সালে প্যারিসে যে কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয় তাতে অতীতে বিদ্যমান সা¤্রাজ্যবাদী নীতিসমূহ রয়ে যায় এবং ক্ষুদ্র ও দুর্বল জাতিসমূহ এবং যুদ্ধে পরাজিত জাতিসমূহের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি অনুষ্ঠিত হয়। বিজিত রাষ্ট্রগুলির শক্তি ও দুর্বলতার উপর ভিত্তি করে যুদ্ধের ফলাফল রচিত হয়। এধরনের নৈতিকতাহীন পদক্ষেপ ফ্যাসিজমের দ্রুত বিস্তার লাভেরই সহায়ক হয় এবং ক্ষমতা ও ভায়োলেন্সের এক সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হয়।
পরিস্থিতি বিশ্বময় দানবীয় রাষ্ট্রীয় চরিত্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, উগ্রজাতীয়তাবাদের উদ্ভব সমাজতন্ত্র ও গনতন্ত্রের বিরুদ্ধে সা¤্রাজ্যাবাদী আঘাত, রাষ্ট্রীয়শক্তি ক্রমাগত একনায়কতন্ত্রের দিকে এবং রাষ্ট্রের সামরিক চরিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছিল। ইটালীতে ১৯২২ সালে মুসোলিনির ‘ব্ল্যাক সার্টস’ সশস্ত্র বাহিনী রোম দখল করে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহন করে। ইটালীতে প্রথম ফ্যাসিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠার পর জার্মানীতে নাজীরা এবং জাপানে সামরিকতন্ত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে-এরা সকলেই ছিল উগ্র সম্প্রসারনবাদী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা।
ফ্যাসিজম সমন্বিতভাবে তাদের রাষ্ট্রীয় এলাকা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা গ্রহন করে। শুরু থেকেই জার্মানী ইটালী ও জাপানের ফ্যাসিস্ট বাহিনী তাদের বৃহত্তর জার্মানী, বৃহত্তর জাপান এবং রোমান সা¤্রাজ্যের পুণঃনির্মানের স্বপ্ন দেখে-এর সবটাই ছিল ‘রাষ্ট্রীয় সীমানা সম্প্রসারন’ করে নতুন ইউরোপ ও নতুন এশিয়া সৃষ্টির উন্মাদনা। জাপানের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল উত্তর পূর্ব চীনের ভূমি দখল করে নেয়া। কিছু কিছু জায়গা দখল করে বাঁধা না পাওয়ায় জাপান সহসা ১৯৩১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর চীনের উত্তর পূর্বাঞ্চলের তিনটি প্রদেশে প্রবেশ করে এবং সেখানে তথাকথিত ‘মাঞ্চুকু সা¤্রাজ্য’ স্থাপন করে এবং জাপান সরকারের নিয়ন্ত্রনে এক পুতুল সরকার কায়েম করে। চীনের উক্ত তিনটি প্রদেশ দখল করে যা ছিল জাপানের প্রায় চারগুন আয়তন বিশিষ্ট, সেখানে জাপানী উপনিবেশ স্থাপন করে।
প্রথম মহাযুদ্ধের পর থেকেই বিভিন্ন দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল এবং শক্তিশালী জাতি কর্তৃক দুর্বল জাতির উপর দমন শোষন ও নীপিড়ণের বহু ঘটনা ঘটছিল। কিন্তু জাপান কর্তৃক অপর জাতির এক বিশাল আয়তনের ভূমি দখল করে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়াস ছিল বিশ্বে প্রথম। লীগ অফ নেশন্স কর্র্তৃক বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার যে চেষ্টা চলছিল, জাপান কর্তৃক এই অপরাধমূলক আগ্রাসন ছিল বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতি এক ভয়াবহ হুমকি। বৃটেন ও ফ্রান্স এর নেতৃত্বে পরিচালিত লীগ অফ নেশানস এ ব্যাপারে কোন ত্বরিৎ ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়নি। এর পরিবর্তে তারা ‘লিটন কমিশন’ নামে একটি অনুসন্ধান গ্রুপ নির্বাচন করে । এই গ্রুপ ৫ জাতি-বৃটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানী এং ইটালীর প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত হয়।
জাপানী সমরবাদ কর্তৃক ৩টি প্রদেশ দখল করায় চীনের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হওয়া সত্ত্বেও, শক্তিশালী রাষ্ট্রসমূহ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে লিটন কমিশন জাপানী আগ্রাসনের প্রতি নমনীয় ভূমিকা পালন করে, বলা যায় পরোক্ষভাবে সমর্থন দান করে। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের দ্বিমুখী ভূমিকার ফলে অন্যান্য শক্তিসমূহ জাপানকে চীনের আরো বেশী এলাকা দখল না করার পরামর্শ দেয়। এমনকি লিটন কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে লীগঅফ নেশনস কোন সিদ্ধান্ত গ্রহনের পূর্বেই জাপান চীনের মহাú্রাচীর অতিক্রম করে এবং আরো বেশী স্থান দখলের উদ্দেশ্যে চীনের দক্ষিনাংশের দিকে অগ্রসর হয়। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লীগ অফ নেশন একটি প্রস্তাব পাশ করে যে, যে সকল এলাকা ইতি মধ্যে জাপান দখল করে নিয়েছে, সেখান থেকে যেন সরে যায় এবং আরো ব্যক্ত করে যে তারা উত্তর পূর্ব চীনে গঠিত ‘মাঞ্চুকু সরকার’ কে স্বীকৃতি দেবে না। এমনকি প্রস্তাবে বলা হয় চীন যেন জাপানের দ্বারা চীনের প্রতি উত্তর পূর্বাংশে অর্থনৈতিক সুবিধাসহ উন্নত রাষ্ট্র হিসাবে জাপানী প্রভাব মেনে নেয়। জাপান এর প্রতিক্রিয়ার কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করে এবং লীগ অফ নেশান থেকে সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নেয়।
আন্তর্জাতিক মহল থেকে কোন বাঁধা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না পেয়ে জাপান আরো বেপরোয়া হয়ে পরে এবং ক্রমাগতই চীনের এলাকা গ্রাস করতে থাকে। এর দেখাদেখি ইউরোপে ফ্যাসিস্ট শক্তি জার্মানী ও ইটালী সম্প্রসারণবাদী পরিকল্পনা করতে থাকে। ১৯৩৩ সালের প্রথম দিকে এডলফ হিটলার জার্মানীর ক্ষমতায় আসে এবং লীগ অফ নেশান থেকে পদত্যাগ করে। এর পর হিটলার ভার্সাই চুক্তি মানতে অস্বীকৃতি জানায় এবং সামরিক শক্তি ব্যাúক বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দেয়। ১৯৩৫ সালের পর তিনটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র জার্মানী ইটালী এবং জাপান একই তালে সবদিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহন করতে থাকে। অক্টোবর মাসে পূর্ববর্তী আগ্রাসনের পথ ধরে উত্তর চীনের মোট ৫টি প্রদেশকে আয়ত্তে আনার উদ্দেশ্যে পিকিং এবং তিয়ানজিন এলাকার দিকে অগ্রসর হয়। একই সময় ইটালী উত্তর আফ্রিকার ইথিওপিয়া দখল করে নেয়। লীগ অফ নেশন এর প্রতিবাদ জানায়, কিন্তু কোন সিদ্ধান্তে আসতে না পারায় ইটালীর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়নি। একটি সদস্য রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও জুন ১৯৩৬ সালে ইটালিয়ান সৈন্যেরা ইথিওপিয়া দখল করে নেয়। জার্মানী এবং ইটালী জেনারেল ফ্রাঙ্কোর সমর্থনে প্রকাশ্যে স্পেনে সৈন্য প্রেরণ করে যিনি দেশের বামপস্থী সরকারের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধের সূচনা করেছিলেন। প্রথমবারের মত যুদ্ধের অগ্নিশিখা বৃটেন ও ফ্রান্সের সীমানার কাছে চলে আসে। কিন্তু বৃটিশ ও ফরাসী সরকার পূর্বের কার্যকলাপের মতই এসকল বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি গ্রহন করে। ফলে এই তিনটি ফ্যাসিস্ট-নেশন কোন প্রকার বাঁধা বিপত্তি ছাড়াই পররাজ্য গ্রাস করার জন্য অগ্রসর হতে থাকে। ১৯৩৬ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে এই তিনটি দেশ একত্রে কাজ করার উদ্দেশ্যে সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষর করে। শীঘ্রই ইটালীও লীগঅফ নেশন্স থেকে পদত্যাগ কর। ফ্যাসিস্ট শক্তিসমূহ এবং শান্তি ও গনতন্ত্রী পন্থীরা তখন ছিল সম্পূর্ন বিপরীতমুখী। মহাযুদ্ধে শুরু হওয়ার সবগুলি লক্ষণই তখন পরিস্ফুট হয়ে উঠছিল।
চীনের জাপানবিরোধী প্রতিরোধ যুদ্ধ
ইথিওপিয়ার উপর ইটালীর সহজ বিজয় জাপানী ফ্যাসিস্টদের চীনে আরও শক্ত ঘাটি করার ব্যাপারে উৎসাহ যোগায়, যাতে তারা এশিয়া মহাদেশে প্রভুত্ব করতে পারে। ১৯৩৭ সালের ৭ জুলাই জাপান উত্তর চীনে এক বড় আকারের সমরাভিযান চালায়। সেই সাথে চীনের জাপান বিরোধী প্রতিরোধযুদ্ধে শুরু হয়। আগষ্ট মাসের ১৩ তারিখ জাপানী নৌবাহিনী পূর্ব চীনের সাংহাই আক্রমন করে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রথম থেকেই জাপানী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা বলে আসছিল। জাপানের অব্যাহত আক্রমনের মুখে এবং চীন জাপানের উপনিবেশে পরিণত হতে পারে এই আশঙ্কায় চীনা কমিউনিস্ট পার্টি জাপান বিরোধী সর্বাত্মক যুদ্ধের আহবান করে। ১৪ আগষ্ট চীন সরকার নিজস্ব শক্তিতে প্রতিরোধ যুদ্ধের ঘোষণা দেয়। দুর্যোগ কবলিত চীনা জনগণ তাদের প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে, জীবন বাজি রেখে তারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে, শুধু তাদের নিজেদের মুক্তির জন্য নয়, বিশ্বের সকল শান্তিকামী মানুষ, যারা আগ্রাসী শক্তির দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে তাদের জন্যও। এই ন্যায়ের যুদ্ধ নি:সন্দেহে বিশ্বব্যাপী ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছিল।
জাপানের বিরুদ্ধে চীনা জনগনের এই যুদ্ধ দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের এক উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। এটা ছিল এক বিরাট দেশপ্রেমের নজীর যেখানে চীনের বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও পথের লোকদের একতাবদ্ধ করেছিল। সম্পূর্ণ ভিন্নমতের রাজনৈতিক গ্রুপও দেশের এই সংকটলগ্নে একত্রীভূত হয়েছিল এই শর্তে যে, ‘গৃহে ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া থাকতে পারে, কিন্তু তারা যখন বাইরের শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয় তাদের একত্রে তা প্রতিরোধ করতে হবে’। এমনকি কমিউনিস্ট এবং কুওমিনটাং যারা বিগত ১০ বছর যাবৎ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত ছিল তারাও প্রতিরোধ যুদ্ধে একে অপরকে সহযোগিতা করে। এর ফলে চীনের প্রতিরোধ যুদ্ধ যথেষ্ট শক্তি অর্জন করে এবং জাপানের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে সমর্থ হয়।
লেখক একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক নির্বাহী (জনতা ব্যাংক লিমিটেড)
































