‘তারুণ্যের উন্মাদনা’
০৬ অক্টোবর ২০১৬, ০৬:১১ পিএম
।। প্রতিদিনের চিত্র ডেস্ক ।। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে অনেক আগেই আন্তর্জাতিক সঙ্গীতাঙ্গনে পা রেখেছেন নগর বাউলের প্রধান ভোকালিস্ট জেমস। নজরুলকে যদি বলা হয় প্রেম ও দ্রোহের কবি, তবে শিল্পী হিসেবে জেমসকে ‘তারুণ্যের উন্মাদনা’ বললে মোটেও বাড়িয়ে বলা হবে না।
ক্যারিয়ারের শুরু থেকে এ পর্যন্ত অসংখ্য জনপ্রিয় গান শ্রোতাদের উপহার দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও রয়েছে তার অগণিত ভক্ত। ২০০৪ সালে প্রথম ‘গ্যাংস্টার’ ছবির মাধ্যমে বলিউড মাত করেন দেশের এ লিজেন্ড ব্যান্ড তারকা। দেশ-বিদেশ মিলিয়ে জেমস যেন এক বিস্ময়ের প্রতিচ্ছবি। সম্প্রতি তার জন্মদিন উপলক্ষে এক অন্তরঙ্গ আড্ডায় এই ব্যান্ড গুরু জানিয়েছেন না বলা অনেক কথা।
ডেটলাইন ২ অক্টোবর। শহর জুড়ে এক ভক্তের উন্মাদনা। গুরুর জন্মদিনে ১২ ফুট দৈর্ঘ্য-প্রস্থের এক বিশালাকায় কেক নিয়ে শহরময় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পথচারীদের চোখ আটকে গেছে ধাঁধায়। হঠাৎ কী হল! একটু কাছে আসতেই খুলে যায় রহস্যের জট। প্রিয় তারকাকে শ্রদ্ধা জানাতে একটি সুসজ্জিত ট্রাকে বিশাল কেক নিয়ে পথচারীদের কেক-মুখ করাচ্ছেন ভক্ত প্রিন্স মোহাম্মদ। ইন্টারনেটের কল্যাণে বিশ্বব্যাপী খবর রটে যেতে খুব বেশি সময় লাগেনি। সেই রটনা গুরুর কানে গিয়েও ঠেকে। বিস্মিত বিশ্ববাসী! বিস্মিত জেমস! এত্তো ভালোবাসা! কীভাবে সম্ভব? বুকের পাঁজরে কতটা জড়িয়ে থাকলে কোনো ভক্ত এভাবে শহরময় ভালোবাসার উন্মাদনায় মেতে উঠতে পারে? শুরুতেই প্রশ্নটা জেমসের দিকে ছুঁড়ে দিতে কিছুটা যেন অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন গুরু। ভক্তের ভালোবাসায় আপ্লুত। মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না। তবুও স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্য ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন, ‘এটাই ভালোবাসা। আমিও ভালোবাসি। সবাইকে। কেউ পর নয়। সবাই আপন। যে ভালোবাসে সেও, আবার যে ভালোবাসে না সেও।’
সত্যিই তাই। ভালোবাসার অপর নাম যেন জেমস। আর তরুণ প্রজন্মের কাছে নগরবাউল আর জেমস মানেই অন্যরকম উন্মাদনা। সেই আশির দশক থেকে শুরু। এ সময়ের অনেকেই তার গান শুনে তরুণ থেকে প্রবীণ হয়েছেন। তবুও মনের গহীনে এখনও বেজে উঠে- আমি জেল থেকে বলছি, কবিতা তুমি স্বপ্নচারিণী হয়ে খবর নিও না, ভালোবেসে চলে যেও না, কিছু ভুল ছিল তোমার, তুমি জানলে না, সাদাকালোসহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান। তাই কিংবদন্তীর জন্মদিনে ব্যতিক্রম কিছু ঘটবে- এটাই স্বাভাবিক।
জন্মদিনের আয়োজনের রেশ কাটিয়ে কর্মযজ্ঞে ফিরতে বেশিক্ষণ সময় লাগলো না। তাগাদা দিলেন জেমস নিজেই। কিছুদিন হল নতুন অ্যালবামের কাজ শুরু করেছেন। কাজের অগ্রগতি কতটুকু জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি রবি ইউন্ডাসের সঙ্গে অ্যালবামের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছি। এর মধ্যে কিছু কাজ করা হয়েছে। তবে সেটি খুব বেশি নয়। কারণ সময়ের অভাবে স্টুডিওতে যাওয়া হচ্ছে না। স্টেজ শোতে সময় অনেক বেশি দিতে হচ্ছে। তাই কাজ বেশিদূর এগুতে পারিনি।’
একসময় অ্যালবাম প্রকাশে নিয়মিত হলেও এখন সেটা কমে গেছে এই ব্যান্ড গুরুর। অ্যালবাম প্রকাশে দীর্ঘ বিরতি কেন? এটা কী সঙ্গীতাঙ্গনের অস্থিরতার কারণে নাকি অন্য কিছু?
প্রশ্ন শুনে উত্তর দিতে মোটেও সময় নেননি। বললেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সময়। অ্যালবাম প্রকাশের জন্য সময় নিয়ে বসতে হয়, গান রেডি করতে হয়। স্টুডিওতে কাজ করার মতো সময় পাই না। বিভিন্ন লাইভ শো, স্টেজ শোর অনেক বেশি চাপ থাকে। যখন ভাবি গানগুলো তৈরি করা দরকার তখনই কোথাও না কোথাও শো করতে চলে যাই। তাই ইচ্ছে থাকলেও সময় মতো অ্যালবাম প্রকাশ করতে পারছি না।
প্রত্যেক মানুষের জীবনে কেউ না কেউ অনুকরণীয় হয়ে থাকেন। সঙ্গীত জীবনে জেমস কী এর থেকে ব্যতিক্রম? শিল্পী হিসেবে কার অনুপ্রেরণায় আপনার বেড়ে উঠা?
এ প্রসঙ্গে জেমস বলেন, ‘আমাদের সময় আমরা যখন ব্যান্ডের সঙ্গে পথ চলা শুরু করি তখন থেকেই বাইরের বেশ কিছু ব্যান্ড দল দেখেই অনুপ্রাণিত হয়েছি। সেসব দলগুলো কাজের ক্ষেত্রে এখনও আমাকে অনুপ্রাণিত করে। এর মধ্যে ছিল জিম মরিসন, মার্ক নফলার, এরিক ক্লাপটন।’
জেমস মানে বিস্ময়। জেমস মানেই তরুণের উচ্ছ্বাস। আশির দশক থেকে শুরু করে নতুন প্রজন্মের অনেকে আপনাকে অনুকরণ এবং অনুসরণ দুটোই করে, বিষয়টি কেমন লাগে?
প্রশ্ন শুনে কোনো ভাবান্তর নেই তার। যেন করতেই পারে। কারণ এটাই জেমস। আÍবিশ্বাসের জায়গা থেকে এটা তার প্রাপ্য। তবুও বলেছেন। কারণ ভালোবাসার বিকল্প কোনো কিছুই নেই। ‘মানুষের ভালোবাসাই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। এটিও একটি ধরনের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। তাদের এমন ভালোবাসা আমাকে কাজের উৎসাহ দেয়। নতুন গান তৈরি করার ক্ষেত্রে অনেক বেশি ভাবায়। তবে সেক্ষেত্রে নিজের দায়িত্ব অনেক বেড়ে যায়। কারণ আমি যা করব ভক্তরা তা অনুকরণ করবে’- বেশ সাবলীল জবাব।
বিশ্বায়নের যুগে গানও আর নিজ দেশে কেন্দ্রিভূত থাকছে না। ইন্টারনেটের কল্যাণে ছড়িয়ে পড়ছে দেশ থেকে দেশান্তরে। বলা যায়, বর্তমান সঙ্গীতাঙ্গন অনেকটাই অনলাইন নির্ভর হয়ে পড়েছে। এ বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন?
জেমস বলেন, অবশ্যই এটি সঙ্গীতের একটি ভালো দিক। কারণ গান তৈরি হচ্ছে, প্রকাশ পাচ্ছে, এটিই বড় বিষয়। কোন মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে সেটি বড় নয়। প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে তাল রেখেই এমন কিছু করা হচ্ছে। ভালো মানের গান হলে এটি শ্রোতাদের কাছে কোনো না কোনো মাধ্যমে পৌঁছাবেই। কাজেই অনলাইন মাধ্যমে গান প্রকাশের ক্ষেত্রে আমার কোনো দ্বিমত নেই।
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বর্তমানে অনেক ব্যান্ড দল তৈরি হচ্ছে। এরমধ্যে অনেকে স্বপ্ন নিয়ে আসলেও হারিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠা নামক শব্দটি তাদের কাছে একেবারেই অধরা। আবার কেউ কেউ পেলেও সেটার স্থায়ীত্ব একেবারেই কম। এমনটি কেন হচ্ছে? কিংবা বিষয়টি নিয়ে কী ভাবছেন জেমস?
উত্তরে জেমস বলেন, ‘সবার আগে একটি বিষয় বলব, হয়তো তাদের মধ্যে মেধার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। সে কারণে ব্যান্ড দল তৈরি হচ্ছে কিন্তু লাইমলাইটে আসতে পারছে না। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, যদি কেউ ভালো গান করেন, তবে আগেও যেমন প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, এখনও পাবেন। ভবিষ্যতে এমন কী ২০৫০ সালেও গান প্রকাশ করেন তখনও শ্রোতারা তাকে গ্রহণ করবেন। মূল বিষয় হচ্ছে শ্রোতার কাছে পৌঁছানো।’
মেধার ঘাটতি থাকলে কেনইবা তারা এই লাইনে আসছে? অথবা এটা দূর করার উপায় কী?
জেমস বলেন, ‘সেটা আমি কি করে বলবো? যে যার মতো নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে। সে বিষয় আমার কিছু বলার নেই। কারণ এত গভীরভাবে এসব বিষয় নিয়ে আমি ভাবিও না।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও তুমুল জনপ্রিয় এ শিল্পী। বিশেষ করে ভারতে তার জনপ্রিয় তুঙ্গে। বলিউডের ছবিতে গানের সুবাদে জেমসের নাম ছড়িয়ে পড়েছে লোক-লোকান্তরে। এ জনপ্রিয় কীভাবে উপভোগ করছেন?
এমন প্রশ্নে কোনো ভাবান্তর নেই তার। তবুও বলেন, ‘ভক্তরা আমার গান পছন্দ করেন, আমাকে ভালোবাসেন, সেটা ভালো লাগাটাইতো স্বাভাবিক। তাদের এই ভালোবাসার জন্যই আমি নতুন নতুন গান করার উৎসাহ পাই।’
শুধু অগণিত ভক্ত নয়, ক্যারিয়ারে তার ঝুলিতে জমা পড়েছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও। প্রথমবারের মতো এমন প্রাপ্তি কেমন লাগছে? কিংবা সেটি কাজের ওপর কতোটা প্রভাব ফেলেছে?
ভাবান্তরহীন উত্তর, ‘প্রভাব তো একটি পড়েছেই। ভক্তদের সঙ্গে সঙ্গে সবার প্রতি দায়িত্ব বেড়েছে। তবে কোনো রকমের চাপ নিচ্ছি না। দায়িত্ব ঠিক কিন্তু নিজের মন মতোই কাজ করে যাচ্ছি। সে দায়িত্বের জন্যই নিজের বিরুদ্ধে কিছু করছি না। নিজের গতিতে কাজ করে যাচ্ছি।’
কথার পিঠে কথার মালা গেঁথে সময় গড়িয়ে বিকাল থেকে সন্ধ্যা হয়ে এল। এর মধ্যে তার স্টুডিওতে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে ভিড় করছে ভক্তরা। যাদের ভালোবাসায় বেঁচে আছেন জেমস। থাকবেন আজীবন। ভক্ত হৃদয়ে, শ্রোতার হৃদয়ে।


































