জুলাই স্মৃতিকথা: শ্বাসরুদ্ধকর ২১০ মিনিট
২৩ আগস্ট ২০২৫, ১০:৩৫ পিএম
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জনের পরে দেশের প্রথম প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ জুলাই ২৪ এর আন্দোলনে সরব ও সতর্ক ছিলেন। ছাত্র জনতার নেতৃত্বে আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। সেই সময় শিক্ষার্থীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মহাসড়কে সক্রিয় অবস্থান নেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এই অবিনাশী চেতনা স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে সংকলিত “জুলাই স্মৃতিকথা” নামে একটি স্মারক প্রকাশিত হয়েছে। যার— সম্পাদনায় ছিলেন, অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হাসান, অধ্যাপক ড. মো. ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. রশিদুজ্জামান, জুলাই যোদ্ধা এস এম সুইট, সাদিক আহমদ, ইমতিয়াজ আহমেদ ইমন ও চয়ন হোসেন।
‘জুলাই স্মৃতিকথা’ স্মারকে ৫৩টি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর লেখা স্থান পেয়েছে। তন্মধ্যে আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষক ও ইউট্যাবের শাখা সভাপতি অধ্যাপক ড. তোজাম্মেল হোসেনের লেখা ‘শ্বাসরুদ্ধকর ২১০ মিনিট’ পাঠকদের সুবিধার্থে ইবি প্রতিনিধি আশরাফুল ইসলাম হুবহু তুলে ধরেছেন।
_২৯ জুলাই ২০২৪ সোমবার দিবাগত রাত্রি আনুমানিক বারোটার কিছু পর আমি ঘুমোতে যাব। ঠিক এমন সময় কলিংবেলের আওয়াজ শুনে একটু আতঙ্কিত হয়ে দরজা খুলতেই দেখি আমার বিভাগের দুই প্রিয় ও কৃতি ছাত্র বর্তমানে কলিগ অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হাসান ও অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম। ড্রয়িং রুমের আলো জ্বালিয়ে বসতে দিলাম। তারা কিছু বলার আগেই তাদের চেহারায় ভয়ের ছাপ আমার আতঙ্ক আরো বাড়িয়ে দিল। তাদের দুজনের কাছ থেকে জানতে পারলাম— ২৯ জুলাই বিকেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের কর্মসূচি থেকে অনেক ছাত্রকে কুষ্টিয়ার পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তারা এখনো কুষ্টিয়া সদরে অবস্থিত মডেল থানায় আটক রয়েছে। রাতের মধ্যে ছাড়াতে না পারলে তাদের নামে মামলা হবে এবং কোর্টে চালান দিয়ে দিবে। আমরা গিয়ে রিকুয়েস্ট করলে হয়তো তাদেরকে ছেড়েও দিতে পারে, এই বলে তারা আমার রুম থেকে বের হতে চাচ্ছিল; কিন্তু আমি তাদের চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ দেখে মুহূর্তের মধ্যেই আমি বলে উঠলাম, “একটু বস আমিও তোমাদের সাথে থানায় যাব।” কয়েক মিনিটের মধ্যেই রেডি হয়ে তাদের সাথে বের হলাম। রাস্তায় কোন যানবাহন নেই এ সময় ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল বারীকে মোটরসাইকেলসহ পেলাম এবং সে বলল, "স্যার আপনি আমার বাইকে ওঠেন, সামনে রিকশা-ভ্যান কিছু পেলে ওদের জন্য পাঠিয়ে দেবো"। বজলুর মোড়ের কাছাকাছি একটি রিকশা পেলাম, তাকে অনেক অনুরোধ করে পাঠালাম আর আমরাও পেছনে পেছনে এসে ওদের দুজনকে সে রিকশায় উঠিয়ে থানার পথে আগালাম। রাস্তায় জানতে পারলাম থানা-মোড়ে আমাদের অপেক্ষায় রয়েছেন— আল-হাদিস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আকতার হোসেন এবং দাওয়া এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাসউদ আল মাহদী। থানার গেটে একত্রিত হয়ে আমরা মোট ছয় জন শিক্ষক একসাথে থানায় প্রবেশ করি। সে সময় থানায় ওসি সাহেব ছিলেন না। তার অনুপস্থিতিতে ২-৩ জন এসআই পদমর্যাদার পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছিল। আমরা ওসি সাহেবের রুমে বসি। দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের আচরণ ছিল খুবই রূক্ষ এবং উগ্র।
আমাদের সাথে তারা একজন আসামির মত আচরণ করে। ছাত্রদের ছাড়ার ব্যাপারে নানা রকম নাটক সাজায় এবং বিভিন্ন রকম ফরমালিটিজ দেখাতে থাকে। তাদের এহেন আচরণে আমরা প্রত্যেকেই বিব্রত বোধ করছিলাম। আমি তাদেরকে বললাম দেখেন, আমি কখনোই আমার কোন কাজে এ ওসির রুমে আসিনি। কোন প্রয়োজন হলে এসপি'র সাথে কথা বলেই কাজ সেরেছি। কুষ্টিয়ার অনেক এসপি'র সাথেই আমার জানাশোনা এবং কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাছাড়া পুলিশের বর্তমান একজন এডিশনাল আইজিপি কিন্তু আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমি তাঁর নাম বলায় তারা তাঁকে চিনতে পারে এবার তাদের আচরণ কিছুটা স্বাভাবিক হয়। ইতোমধ্যে রাত্রি প্রায় তিনটা বেজে গেছে। এরপর নানা রকম কথাবার্তা বলে ১৭ জন ছাত্রকে আমাদের সামনে এনে ফ্যাসিস্ট সরকারের পক্ষে অনেক গুণ গান করে ছাত্রদেরকে চরমভাবে শাসায়। পরে আমাদেরসহ ছাত্রদের অনেকগুলো ছবি তুলে। যেন এই ছাত্ররা পরে কোন আন্দোলনে নামলে আমাদের ধরতে পারে। এরপর ছাত্রদের পক্ষে আমাদের সকলের স্বাক্ষর নিয়ে সকল ফর্মালিটিজ শেষ করে তাদেরকে ছেড়ে দেয়। আমরা ভয়ে ভয়ে রাত্রি সাড়ে তিনটায় বাসায় ফিরি। এভাবে ২১০ মিনিটের শ্বাস রুদ্ধকর অবস্থার আপাতত অবসান ঘটে। আমরা ছয় জন ভয়ে ছিলাম কখন যেন আমাদের কোন কেসে ফাঁসিয়ে এরেস্ট করে। এজন্য আমাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হয়েছে।
একদিন পর আগস্টের ১ তারিখেও আমি নিজে মুচলেকা দিয়ে একজন ছাত্রকে কুষ্টিয়া মডেল থানা থেকে এসপির সহযোগিতায় সকাল ১০.৩০ মিনিটে ছাড়িয়ে এনেছি।
৩ আগস্ট ২০২৪ শনিবার 'নিপীডন ও বৈষম্য বিরোধী সচেতন শিক্ষক সমাজ' এর ব্যানারে আমার নেতৃত্বে ইউট্যাব, জিয়া পরিষদ ও গ্রীন ফোরামের অর্ধ শতাধিক শিক্ষক আনুষ্ঠানিকভাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সাথে সংহতি প্রকাশ করে। আমাদের র্যালি বৃষ্টি উপেক্ষা করে অনুষদ ভবনের সামনে থেকে মেইন গেটে পৌঁছালে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীরা বিপুল করতালি আর স্লোগানের মাধ্যমে আমাদের বরণ করে নেয়। পরে মেইন গেটে একই মঞ্চ থেকে শিক্ষার্থীদের সাথে আমরাও স্লোগান দেই এবং আমিসহ অনেক শিক্ষক ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন চেয়ে কঠোর ভাষায় বক্তব্য প্রদান করেন। এ প্রোগ্রামের ব্যানারটি বানাতেও আমাদের কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করতে হয়েছে এবং এটি ক্যাম্পাসে নিয়ে যাওয়া এবং রক্ষণাবেক্ষণ প্রতিটি কাজে আমাকে সহযোগিতা করেছেন অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম ও অধ্যাপক ড. মো. রশিদুজ্জামান।
বৈষম্য বিরোধী শিক্ষার্থীদের সাথে সংহতি প্রকাশের কারণে পরদিন ৪ আগস্ট ইবি'র ফ্যাসিস্ট প্রশাসন, আওয়ামীপন্থী শিক্ষক নেতৃবৃন্দ ও সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ আমাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা রুজু করা এবং চাকরিচ্যুত করার জন্য অবৈধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট একটি তালিকা প্রেরণ করে। এই তালিকায় বিএনপিপন্থী শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. এমতাজ হোসেন, অধ্যাপক ড. মোহা: তোজাম্মেল হোসেন ও অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমানসহ ১৬ জন এবং জামাতপন্থী শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমান, অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল বারী ও অধ্যাপক ড. ওলীউল্লাহসহ ১২ জনের নাম দৈনিক ইনকিলাবসহ বিভিন্ন পত্রিকার মাধ্যমে জানা গেছে। 'রাখে আল্লাহ মারে কে' ৫ জুলাই ছাত্র-জনতার সফল বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের সকল ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে যায়।
বিশ্বের সর্বপ্রথম ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন ইতালির ব্যানিটো মুসোলিনি ১৯১২ সালে। মুসোলিনির ফ্যাসিবাদ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে অ্যাডলফ হিটলার ১৯৩৩ সালে জার্মানিতে ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেন। এরই ধারাবাহিকতায় স্পেনে ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো ১৯৩৯ থেকে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা চালিয়ে যান।
বিশ্বের উপর্যুক্ত কুখ্যাত ফ্যাসিবাদী শাসকদের নামের পাশে স্থান করে নিয়েছেন বাংলাদেশের স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা। তিনি তার বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় বাকশাল এবং স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট এরশাদকেও হার মানিয়েছেন ও বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ হাসিনার মত এত নিষ্ঠুর ও প্রতিশোধ পরায়ণ স্বৈরশাসক অতীতের কয়েক শতাব্দীতেও খুঁজে পাওয়া ভার। তার সাড়ে পনেরো বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে তার দলের নেতাকর্মী ছাড়া দেশের কোন শ্রেণি পেশার নাগরিক নিরাপদ ছিল না। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও তিনি চরমভাবে হেনস্থা করেছেন।
আমরা স্বৈরাচারী শেখ হাসিনাসহ তার সকল সহযোগীর শান্তি চাই। বাংলাদেশে আর কখনো যেন স্বৈরাচারী শাসক তৈরি হতে না পারে সেজন্য গণতন্ত্রকামি, স্বৈরাচার বিরোধী সকল রাজনৈতিক শক্তির ঐক্যমত্য প্রয়োজন। জুলাইয়ের সকল শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনা করছি এবং আহতদের সু-চিকিৎসার দাবি জানাচ্ছি। শহীদ পরিবার এবং আহত পঙ্গু পরিবার যেন সমাজে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে পারে এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানাচ্ছি। ২৪'র জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনা বাস্তবায়িত হোক। আমরা বাংলাদেশকে একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত সকলের জন্য বাসযোগ্য সুখী-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে দেখতে চাই। এই হোক জুলাই ২৫ এর প্রতিজ্ঞা।
লেখক স্বত্ব: ড. মো. তোজাম্মেল হোসেন, অধ্যাপক আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
































