পাহারে নির্বাচনের হাওয়া
বান্দরবান আলীকদমে দ্বারে দ্বারে সম্ভাব্য প্রার্থীরা
০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২২ এএম
মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা নৈসর্গিক ও সবুজ পাহাড়ে ঘেরা বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় নির্বাচনী উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা কিংবা দলগুলোর প্রচারণা শুরু না হলেও চার ইউনিয়নজুড়ে এখন আগাম ভোটের হাওয়া। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হাটে-বাজারে, চায়ের দোকানে, পাড়া-মহল্লায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই আলোচনা—কার হাতে উঠছে আগামী দিনের স্থানীয় নেতৃত্বের বাগডোর? সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলীয় সমর্থন আদায়ের পাশাপাশি কড়া নাড়ছেন সাধারণ ভোটারদের দ্বারে, নিচ্ছেন হালচাল এবং অংশ নিচ্ছেন নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে দলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে প্রতিটি দলের নিজস্ব কোন্দল ও একাধিক শক্তিশালী প্রার্থীর উপস্থিতি মুখ্য হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে চার ইউনিয়নেই বিএনপির একাধিক হেভিওয়েট নেতা চেয়ারম্যান পদের জন্য আগ্রহ দেখানোয় আলোচনায় রয়েছে দলটি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না করায় নির্বাচনী মাঠের পুরোটাই আপাতত বিএনপির অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা ও সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াচ্ছে আলীকদম সদর ইউনিয়নে। এখানে বিএনপির অর্ধডজনেরও বেশি নেতার নাম আলোচনায় আসছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপিপন্থী সাংবাদিক ও পেশাজীবী নেতা মুহাম্মদ ইসমাইল হাসান, উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ইউনূচ মিয়া, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আবুল কালাম, যুবদলের সদস্যসচিব মো. মারুফ উদ্দিন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেতা সাইফুল ইসলাম রিমন। মাঠে সক্রিয় থাকা প্রার্থী মুহাম্মদ ইসমাইল হাসান নিজের সামাজিক ভূমিকা দিয়ে ইতিবাচক আলোচনা তৈরি করলেও নির্বাচনের বিষয়ে এখনো কিছুটা সংযত অবস্থান ধরে রেখেছেন। অপরদিকে আবুল কালাম ও মো. মারুফ উদ্দিন জানিয়েছেন, দলীয় মনোনয়ন না পেলেও তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।
চৈক্ষ্যং ইউনিয়নেও শুরু হয়েছে বহুমাত্রিক সমীকরণ। এখানে বর্তমান চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা জয়নাল আবেদীন ছাড়াও মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন উপজেলা বিএনপি নেতা অংহ্লাচিং মার্মা, হাজী মঞ্জুরুল ইসলাম চৌধুরী, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি নুরুল আমিন এবং যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মীর কাসেম ছোট্টো। দুর্গম এ অঞ্চলে প্রার্থীদের দলীয় পরিচয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও অতীত জনসেবাই জয়ের মূল চাবিকাঠি হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
নয়াপাড়া ও কুরুকপাতা ইউনিয়নেও প্রার্থীরা নীরবে তাঁদের অবস্থান শক্ত করতে ব্যস্ত। নয়াপাড়া ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আনসার আহমেদ, বিএনপি নেতা আনোয়ারুল ইসলাম মনু এবং ফরিদ আহমেদের নাম জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। অন্যদিকে সীমান্তঘেঁষা কুরুকপাতা ইউনিয়নে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি সাকনাও ম্রো এবং বর্তমান চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা ক্রাতপুং স্রে।
এরই মধ্যে সদর ইউনিয়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেতা সাইফুল ইসলাম রিমন ও জামায়াতে ইসলামীর উপজেলা আমির মাসুক এলাহীকে ঘিরে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমঝোতা বা জোটের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে উভয় নেতাই এই তথ্যকে অসত্য ও স্রেফ ‘ধোঁয়াশা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। জামায়াত আমির মাসুক এলাহী স্পষ্ট করেছেন, চার ইউনিয়নেই তাঁদের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা স্থানীয় পর্যায় থেকে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং জেলা পর্যায় থেকে চূড়ান্ত অনুমোদনের পর তা প্রকাশ করা হবে। সমান্তরালভাবে এনসিপি নেতারাও প্রার্থী নির্বাচনের প্রক্রিয়া নীরবে চালিয়ে যাচ্ছেন।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আলীকদমের প্রতিটি দলেই এখন সবচেয়ে বড় সংকট দলীয় কোন্দল ও একাধিক প্রার্থী নিয়ন্ত্রণ করা। অসন্তোষের কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা বাড়লে ভোট বিভাজনের চরম ঝুঁকি তৈরি হবে, যা পুরো ফলকেই অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার প্রান্তিক ভোটারদের কাছে শেষ পর্যন্ত দলের প্রতীকের চেয়ে ব্যক্তিসম্পর্ক, বিপদে পাশে থাকা এবং সার্বিক গ্রহণযোগ্যতাই জয়-পরাজয় নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা রাখবে।

















