চিপস তৈরি করে স্বাবলম্বী শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামের ৪শত পরিবার

চৈতন্য চ্যাটার্জী

০৩ মে ২০২৫, ০৪:১৫ পিএম


চিপস তৈরি করে স্বাবলম্বী শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামের ৪শত পরিবার

জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামে আলুর চিপস তৈরিতে ব্যস্তসময় পার করছে এক নারী। ছবি- প্রতিদিনেরচিত্র বিডি

 

কেউ পাতলা ভাবে গোলাকার করে আলু কাটছেন, আবার কেউ আলু সেদ্ধ করছেন, কেউ কেউ সেদ্ধ আলু রোদে পাটিতে শুকাতে দিচ্ছেন। অন্যদিকে শুকানো আলু ভেজে চিপস তৈরি করে বিক্রি করছেন অনেকে। এভাবেই আলু থেকে চিপস তৈরি করে সংসার চালান জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌরসভার শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামের অনেক বাসিন্দারা। আলুর চিপস তৈরি ও বিক্রি করেই স্বাবলম্বী ওই গ্রামের প্রায় ৪০০ পরিবার। তাই গ্রামটি এখন আলুর চিপসের গ্রাম নামে পরিচিতি পেয়েছে। গ্রামের লোকজন এখন আর বলতে পারেন না, ঠিক কবে থেকে তারা এ পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন। তাবে অনেকেই বলছেন, বাপ-দাদার আমল থেকেই এ কাজ করেন তারা।

মূলত ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত আলুর চিপস তৈরির কাজ করেন তারা। এ সময় গ্রামের শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা কারও যেন দম ফেলার ফুসরত নেই। এটি তাদের সারা বছরের আয়-রোজগারের একমাত্র অবলম্বন। আলুর চিপস তৈরির মাধ্যমে এসব পরিবারের অভাব দূর হয়েছে। হাতে তৈরি করা আলুর চিপস বা আলুর পাপড়ের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব চিপস রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।

সরেজমিনে শ্রীকৃষ্টপুরসহ পার্শ্ববর্তী গ্রাম ভদ্রকালি, কেশবপুর, চুকাইবাড়ি চকরঘুনাথ, গ্রামগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে বাড়িতে কেউ আলু সেদ্ধ করছেন, আবার কেউ সেদ্ধ আলু ঝুরি-ঝুরি করে কাটছেন। এরপর কাটা আলুগুলো তুলসীগঙ্গা নদীর পাড়ে, বাঁধ, রাস্তা, পুকুরপাড়ে রোদে শুকাচ্ছেন। কয়েকজন গ্রামবাসী জানান, তাদের গ্রামে ৪০০ পরিবার বসবাস করে। এর মধ্যে ১০-১২টি পরিবার বাদে সবাই আলুর চিপস তৈরি করে। মৌসুমি এ ব্যবসার আয়ে সারা বছর সংসার চলে। প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার মণ আলু সেদ্ধ করা হয়। এই চিপস তৈরি করতে একটু পরিশ্রম হয়। যেসব ব্যবসায়ীর পুঁজি বেশি, তারা বেশি করে আলু কিনে চিপস তৈরি করে সংরক্ষণ করেন। তারাই বেশি লাভ করেন। তারা আরও জানান, আলুর চিপস তৈরির জন্য এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে আলু কিনতে হয়। সরকার যদি ছোট ব্যবসায়ীদের স্বল্প সুদে ঋণ দিত, তাহলে তারা উপকৃত হতেন।

শ্রীকৃষ্টপুরের গ্রামের মোঃ বাবলু মন্ডল বলেন, ক্যাডিনাল জাতের আলু চিপসের কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহার করা হয়। অন্য জাতের আলু দিয়ে চিপস তৈরি হলেও তেমন স্বাদ মেলে না । এ ছাড়া ক্রেতাদের চাহিদাও থাকে কম। বাজার থেকে প্রতি মণ ক্যাডিনাল আলু ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় কেনা হয়। সেই আলুগুলো সেদ্ধ করার পর গোলাকার করে কেটে রোদে শুকিয়ে চিপস তৈরি করা হয়। পাঁচ মণ আলুতে এক মণ চিপস হয়। তিনি আরও বলেন,  আজ থেকে ৫০ বছর আগে আলুর চিপস ব্যবসা প্রথমে নিয়ে আসছে আমার বাবা মিরাজ মন্ডল। বাবা চলে যাওয়ার পর আমি হাল ধরেছি। আমাদের দেখাদেখি চিপস তৈরির কার্যক্রম এ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে মহাজনরা এসে আলুর চিপস নিয়ে যান। আবার আমরা নিজেরাও ঢাকা, রাজশাহী, ময়মনসিং, সিলেট, রংপুর, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় আলুর চিপস সরবরাহ করেন। বাব দাদার আমল থেকে এ ব্যবসা করে আমাদের পরিবারে সচ্ছলতাও এসেছে। ছেলেমেয়ে স্কুলে লেখাপড়া করছে। আবার বাড়িঘরেরও উন্নতি হয়েছে।

 

এমনই একজন মোজাম্মেল সরদার তিনি বলেন, ১৩০ মণ আলু কিনে চিপস তৈরি করেছি। এক মণ শুকনো চিপস তৈরি করতে ২ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। সময় লাগে দুই দিন। আর এক মণ চিপস বাজারে পাইকারি বিক্রি হয় ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৫হাজার টাকায়। গত বছর ১০হাজার টাকা পর্য়ন্তও বিক্রি হয়েছে।

একই গ্রামের তিন কন্যা সন্তানের জননী নূর জাহান বেগম বলেন, চিপস ব্যবসায়ীরা আমাদের আলু কিনে দেয়। আগের দিন সেদ্ধ করে পরের দিন পাতলা ও  গোলা করে কাটে রোদে পাটিতে শুকাতে দিতে দেয়। শুকিয়ে গেলে তা প্যাকেট জাত করে পায়কারদের পৌঁছে দিতে হয়। এতে তারা যে অর্থ দেয় আমাদের সংসার ভালোই চলে। দিনে ৩ থেকে ৪ মণ আলু সেদ্ধ করে শুকানো যায়। আলুর চিপস বানিয়ে আমি সংসার চালানোর পাশাপাশি নিজ জমিতে বসবাসের জন্য বাড়ি তৈরি করেছি। এই ব্যবসা করে তিন মেয়েকে ভালো জায়গায় বিয়ে দিয়েছি। তিনি আরও বলেন, আমাদেরকে সরকার যদি এই ব্যবসার জন্য স্বল্প সুদে ঋণ দেয় তাহলে আমরা আলু আরও কিনতে পারব। এই শিল্পটাকে আরও এগিয়ে নেওয়া যাবে।

চিপস ব্যবসায়ী মোঃ রফিক হোসেন বলেন, আমি প্রতি বছরের ন্যায় ছোট ছোট চিপস ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চিপস কিনে থাকি। এই চিপস গুলো আগামী নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বিক্রি করি। এবার আমি প্রায় ৬ লক্ষ টাকার চিপস ক্রয় করেছি।

শ্রীকৃষ্টপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুশান্ত কুমার ঘোষ বলেন, আলুর চিপস এই এলাকার একটি শিল্প। এই মৌসুমে গ্রামজুড়ে আলুর চিপস তৈরির বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। পরিবারের সবাই কাজ করেন। এ কারণে দুই মাস বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার কমে যায়।

আক্কেলপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ইমরান হোসেন বলেন, শ্রীকৃষ্টপুরের গ্রামের কৃষকরা আলু প্রক্রিয়া জাত করণের একটি শিল্প গড়ে তুলেছেন। সামনে এ অঞ্চলে বড় একটি সম্ভাবনার দার খুলবে বলে আশা করছি। আলুর বহুবিধ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে আলুচাষিরাও উৎপাদিত আলুর ন্যায্যমূল্য পাবেন। তিনিও আরও বলেন, আমরা তাদেরকে সবসময় পরামর্শ দিচ্ছি তারা যেন স্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিপসটি তৈরি করে।
 

Ads