স্বৈরাচার সরকারের রেখে যাওয়া ঋণ শোধ কীভাবে?

নয়ন তারা

২৫ আগস্ট ২০২৪, ১২:২৭ পিএম


স্বৈরাচার সরকারের রেখে যাওয়া ঋণ শোধ কীভাবে?


ড়বাদী চার্বাক দর্শনে একটি প্রবাদ আছে ‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ, যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ। ’অর্থাৎ ‘ঋণ করে হলেও ঘি খাও, যত দিন বাঁচো সুখে বাঁচো।’ এই প্রবাদ বাক্যটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর শাসনামলে যথার্থভাবে প্রয়োগ করে গেছেন।

গত ৫ই আগস্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচার শাসক শেখ হাসিনা সাড়ে ১৫ বছরে নজির বিহীন যে লুটপাট, অর্থপাচার এবং দুর্নীতি হয়েছে তারই স্বাক্ষী হিসেবে রেখে গেছে ১৮ লাখ ৩৬ কোটি টাকা ঋণ, যার দায়ভার এখন এই জাতিকে এবং বর্তমান অর্ন্তবর্তীকালিন সরকারকে বহন করতে হবে। তথাকথিত উন্নয়নের নামে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা থেকে দেশের জন্য ঋণ করেছে এই স্বৈরাচারী শাসক। বর্তমানে দেশের জনগণের মাথাপিছু ঋণ দেড় লক্ষ টাকা। আজকে যে শিশুটি এদেশে জন্ম নিবে তার মাথার উপরও এখন দেড় লক্ষ টাকা ঋণের বোঝা। জন্মের পরই তাকে এই দায়ভার বহন করে বেড়ে উঠতে হবে। এর অন্যতম কারণ একটি সরকারের অপরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ এবং ও লুটপাত। আর এ ঋণের বড় অংশই নেওয়া হয়েছে দেশি উৎস থেকে। এর মধ্যে আবার বেশিভাগ ঋণ গ্রহণ হয়েছে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থাপনা থেকে। এর ফলশ্রুতিতে ব্যাংকিং খাত আজ দেউলিয়ার দাড়প্রান্তে। এর সত্যতা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে দেশি-বিদেশি ঋণের তথ্য বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে। স্বৈরাচার সরকারের যথাযথ ঋণ ব্যবস্থাপনা না থাকায় দেশি উৎস থেকে বেশি পরিমাণে ঋণ নেওয়া হয়েছে। যদিও বৈদেশিক মুদ্রায় বিদেশি ঋণ নেওয়াকে সব সময় স্বাগত জানান অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। গত ১৫ বছরে অনেক বিদেশি ঋণও নেওয়া হয়েছে। তবে এসব ঋণের বেশির ভাগই নেওয়া হয়েছে দর–কষাকষি ও বাছবিচারহীনভাবে, যা সরকারের দায়দেনা পরিস্থিতিতে চাপ বাড়িয়েছে। সামনে আসছে এই ঋণ পরিশোধের চাপ। এত অপরিকল্পিত ও প্রায় দর-কষাকষিহীনভাবে বৈদেশিক মুদ্রায় সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট নেওয়া হয়েছে, তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাবে চলমান সরকার ও এদেশের জনগন। ইতমধ্যে অর্থ বিভাগ গত ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশি-বিদেশি ঋণের প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে। তাতে মোট ঋণের স্থিতি দেখানো হয়েছে ১৬ লাখ ৫৯ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। সাধারনত ঋণের হিসাব হালনাগাদ করা হয় তিন মাস পরপর। মার্চ ও জুনের হিসাব আরও কিছুদিন পর তৈরি করা হবে। অর্থ বিভাগ ধারণা করছে, চলতি বছরের জুন শেষে দেশি-বিদেশি ঋণ স্থিতি দাঁড়াবে ১৮ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার মতো। এর মধ্যে দেশি অংশ হবে ১০ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা আর বিদেশি অংশ ৮ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা।

ইআরডি তথ্য অনুযায়ী, জুন মাস শেষে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৭৯০ কোটি মার্কিন ডলার।প্রতি ডলার (১ ডলার= ১১৮ টাকা) দরে হিসাব করলে তা ৮ লাখ ১ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। গত ডিসেম্বর শেষে বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৫ হাজার ৫২০ কোটি টাকা।গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের যে স্থিতি ছিল, তা দেশের তিনটি বাজেটের মোট অর্থ বরাদ্দের সমান।হাছিনার ১৫ বছরে ঋন বেড়েছে সাড়ে ৬ গুন। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের যে স্থিতি ছিল, তা দেশের তিনটি বাজেটের মোট অর্থ বরাদ্দের সমান। এসব ঋণ সরকারি ও সার্বভৌম নিরাপত্তাপ্রাপ্ত ঋণ হিসেবে পরিচিত। ঋণ নেওয়া, ঋণের সুদ দেওয়া, আসল পরিশোধ করা, আবার ঋণ নেওয়া—বিষয়টি এভাবে চলতে থাকে। স্থিতি হিসেবে উল্লেখ থাকা অর্থ ভবিষ্যতে পরিশোধযোগ্য। ডিসেম্বর শেষে ৯ লাখ ৫৩ হাজার ৮১৪ কোটি টাকার দেশি ঋণের মধ্যে শুধু ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নেওয়া ঋণের স্থিতিই ছিল ৫ লাখ ২৫ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। বাকি ঋণ নেওয়া হয়েছে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের বিপরীতে। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্র ও সাধারণ ভবিষ্য তহবিলের বিপরীতেও আছে বড় অঙ্কের ঋণ। বিদেশি ঋনের এক তৃতীয়াংশ চলে যায় পুর্বের সুদ আর আসল পরিশোধে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে ২০০১ সালে বিএনপি ও চার দলীয় জোট যখন ক্ষ্মতায় আসে তখন বাংলাদেশের ঋনের পরিমান ছিল ১৪.৯৮ বিলিয়ন ডলার বা ১৩০৩.১৬ বিলিয়ন টাকা (১ ডলার=৮৭ টাকা) আর মাথা পিছু ঋনের পরিমান  ছিল ১৩,৬৩১ টাকা এবং ২০০৬ সালে জোট সরকার যখন ক্ষমতা  ছাড়ে ঋণের পরিমান ছিল ২০.১৬ বিলিয়ন ডলার বা ১৭৫৪ বিলিয়ন টাকা (১ ডলার=৮৭ টাকা) আর তখন মাথাপিছু ঋনের পরিমান ছিল ১৬,২৭৫ টাকা। বর্তমানে মাথাপিছু ঋনের পরিমান দের লক্ষ টাকা.এর  মধ্যে ঋণের পরিমান প্রায় ১২গুন বৃদ্বি পেয়েছে। ২০০৯ সালে  ৬ জানুয়ারী শেখ হাসিনার মহাজোট সরকার যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে তখন দেশি-বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা।এমন কি ২০১৭ সালের ডিসেম্বরেও দেশি ঋণের স্থিতি ছিল ৩ লাখ ২০ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। আর গত সাত বছরে এই ঋণ ৩ গুণ বেড়ে ছাড়িয়েছে ১৮লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে শুধু এই ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে দেশি ঋণের সুদই ৯৩ হাজার কোটি টাকা।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই ঋণ আমরা পরিশোধ করব কেমন করে? সব ঋণ হয়তো পরিশোধ করা যায় না যাবে না। কিন্তু ১৮ লাখ কোটি টাকার এই ঋণ তো পরিশোধ করতেই হবে। যিনি ঋণ করে ঘি খেয়েছেন তিনি জনগনের উপর এই ঋনের দায়বার চাপিয়ে পালিয়েছেন।এখন আমাদের তো তা পরিশোধ করতে হবে। ঋণ পরিশোধের এই ধরনের ক্ষেত্রে নিজেদের ও বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতাকে আমরা কাজে লাগাতে পারি এবং এই ক্ষেত্রে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে।

এক।। মালেশিয়ায় ডঃ মাহাথির মুহাম্মদ যেমন করে একটি সিংগেল একাউণ্টের মাধ্যমে চায়না থেকে ঋণ মুক্তির জন্য সমগ্র মালয় বাসির কাছে উদ্বার্ত আহবান করে, অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন, তেমনি একটি সিংগেল একাউন্টের মাধ্যমে সমগ্র পৃথিবীতে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিকট অর্থ সংগ্রহ করা যেতে পারে। সেক্ষত্রে এই  যে উদ্বুদ্ধকরন সেল থাকবে তাতে সর্বচ্চ ব্যবসায়ী সংগঠন, শুশীল সমাজ ও বৈষম্য বিরুধী ছাত্র প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত রাখতে হবে।

দুই।। ১৯৯৮ (৬জানুয়ারি- ৩০এপ্রিল) সালে ঋণ পরিশোধের দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকদের ‘জাতীয় ঋণ পরিশোধ আন্দোলন’এর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন থেকে যে আহ্বান জানানো হয়েছিল তেমনি আহবান জানানো, যে যার সাধ্যমতো রাষ্ট্রীয় কোষাঘারে সোনা জমা দিলে তা বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করা যেতে পারে।

তিন।। দেশে বর্তমানে রেমিটেন্সের ক্ষেত্রে ২.৫% যে নগদ প্রনোদনা বিদ্যমান আছে তা সাময়িক সময়ের জন্য ৫% করা, যাতে বৈধ চ্যানেলে রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়ে।

চার।।  সাময়িক সময়ের জন্য গাড়ী আমাদানী সম্পুর্ন নিষিদ্ব করা।

পাঁচ।। যাদের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে তাদের কাছে থেকে ঋন পরিশেধের ব্যাপারে গ্রেস পিরিয়ড বাড়িয়ে নেওয়া এবং সুদের ব্যাপারে দরকষাকষি করা।

ছয়।। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি দুতাবাস গুলোর মাধ্যমে যে সব এন আর বি প্রভাবশালী বায়বসায়ীরা রয়েছেন, তাদেরকে বাংলাদেশের বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা।

সাত।। প্রভাবশালী বাংলাদেশীদের জন্য বন্ডের ব্যাবস্থা করা যাতে নিরাপদে বিনিয়োগ করতে পারে।

আট।। যে সব ব্যবসায়ী অর্থ পাচাররের সাথে সম্পৃক্ত তাদের দিয়ে তাদের অর্থ  ফেরত আনার সাপেক্ষে বাংলাদেশে নিরাপদে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া।

নয়।। মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা আন্তর্জাতিক ভাবে একজন গ্রহন যোগ্য ব্যক্তিত্ব, বিদেশী বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার জন্য উনার আন্তর্জাতিক সফর এই মুহুর্তে খুব ই জরুরী।

দশ।। আমাদের মোট জনসংখ্যার ৬৫% ই কর্মক্ষম তাদেরকে স্বল্প মেয়াদী কারিগরি ট্রেনিং দিয়ে বিদেশে শ্রম বাজারে প্রবেশের ব্যবস্থা করা।যাতে রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্বি পায়।

এগার।।  উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ গমনচ্ছুক শিক্ষার্থীদের জন্য অভিভাবকের গ্যারান্টি সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যাংক গ্যারান্টি, নগদ অর্থ ও ডলারের জন্য ৫ থেকে ১০ বছরের মেয়াদে বিনা সুদে ব্যাংক ঋণ প্রদান এবং সংশ্লিষ্ট দেশের দুতাবাসের মাধ্যমে তাদের পড়লেখা নিয়মিত তদারকিকরন।  

 

লেখক : অর্থনৈতিক বিশ্লেষক। 
Email : msislam.sumon@gmail.com

নোট: লেখাটি সম্পূর্ণ লেখকের মতামত।

Ads