কাপাসিয়ার ধাঁধার চর সম্ভাবনাময় একটি পর্যটক কেন্দ্র
৩০ অক্টোবর ২০১৮, ০৫:৩২ পিএম
ছবি-সংগৃহীত
শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্র নদের মোহনায় বিন্দু বিন্দু বালু জমতে জমতে তৈরি হয়েছে মনোলোভা এক ভূখণ্ড। যার নাম ‘ধাঁধার চর’। সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা সবুজে ঘেরা ধাঁধার চর দৈর্ঘ্যে সাড়ে ৪ কিলোমিটার। বর্ষাকালে নদীর বিশাল ঢেউ দেখলে মনে হয় এ যেন আরেক কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত। বর্ষাকালে শুধু এই ঢেউ দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন পর্যটকরা। আড়াইশ বছর আগে গাজীপুর ও নরসিংদী জেলার সীমানা বেষ্টিত শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্র নদের তারাগঞ্জ, রাণীগঞ্জ, লাখপুর, চরসিন্দুর এলাকায় নদীর মাঝখানে ২৫০ একর আয়তনের এ চরকে অনেকে বলে মাইঝ্যার চর বা মাঝের চর। কারণ চারটি চারটি গ্রামের মাঝখানে এর অবস্থান। দূর থেকে দেখলে চরটিকে কারও কারও মনে হতে পারে এ যেন ডুবে যাওয়া টাইটানিক জেগে উঠছে। চরের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম চারদিকেই শীতলক্ষ্যা নদী, উত্তর- পূর্ব কোনায় ব্রহ্মপুত্র নদ। চরের পূর্ব পাশে শিবপুর-মনোহরদী ও পশ্চিম পাশে কাপাসিয়া-কালিগঞ্জ উপজেলা। দুই পাশে দুই জেলা গাজীপুর ও নরসিংদী। বর্ষা মৌসুমে দুটি নদীই পানিতে থৈ থৈ করে। শীতকালে এটি হয়ে ওঠে আরও মনোলোভা। এই চরে রয়েছে বড় বড় পেয়ারার বাগান, আমগাছ, কাঁঠাল গাছ, কলাবাগান ও বিভিন্ন জাতের ফসলি ক্ষেত। ধান হয় প্রচুর। ধাঁধার চরে বাতাসে দোল খাওয়া কাশফুলগুলো যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে ‘আয় আয়, মুছে দিই তোর যত গ্লানি’। পাখির কিচিরমিচির শুনে ইচ্ছা হবে পাখি হয়ে গান গেয়ে গেয়ে উড়ে যাই চরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। চরের সূচনালগ্নে এর মালিকানা নিয়ে ভাওয়ালের রাজা ও বার ভূঁইয়াদের এক ভূঁইয়া মহেষ উদ্দীনের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। বিরোধ মেটাতে এগিয়ে এলেন স্থানীয় মাতব্বররা। তারা একটি কলসি নদীতে ভাসিয়ে দিলেন। বললেন, কলসিটি নদীর যে পাড়ে গিয়ে ভিড়বে চরের দখল পাবেন সেই পাড়ের লোকজন। কলসিটি নদীর পশ্চিম পাড়ে অর্থাৎ ভাওয়াল রাজার এলাকায় (বর্তমানে গাজীপুরের কাপাসিয়া) এসে ভিড়ে। তারপর থেকেই ধাঁধার চরটি পশ্চিমপাড়ের ভাওয়াল রাজা পরগনার (বর্তমানে গাজীপুরের কাপাসিয়া) দখলে। হিন্দু কৃষকরা ভাওয়ালের রাজাকে খাজনা দিয়ে চাষাবাদ শুরু করেন। ১৮১৬-১৮১৯ সালে ব্রিটিশ সরকার চরের জরিপ করে কৃষকদের বৈধ মালিকানা দেয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর হিন্দুরা চরের জমি বিক্রি করে ভারতে পাড়ি জমান। এখন পুরো চরের মালিকানা মুসলিম কৃষকদের হাতে। এই চরের মাটি খুবই উর্বর। রোপণ করলে হয় না, এমন কোনো ফল-ফসল নেই। এক সময় চরে প্রচুর আখ হতো। এখন সবচেয়ে বেশি আলু চাষ হয়। মাটি অতি ফলনশীল। সারবিহীন ফসল সুস্বাদু। ১৯৬০, ১৯৮৮, ১৯৯৮ সালের বন্যায় এ চরটি তলিয়ে গিয়েছিল। ১৯৬০ সালের বন্যার পর চরে কোমর পর্যন্ত পানি জমে যায়। ফলে মাটির উর্বরাশক্তি আরও বাড়তে থাকে। ২০০৬ সালের সার্ক সম্মেলনে ধাঁধার চরটিকে গ্রামীণ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে চর থেকে অনেকে মাটি নিয়ে যাচ্ছে তাছাড়া ময়লা আবর্জনা ফেলে আশেপাশের পরিবেশ নষ্ট করছে। যথার্থ কোন রক্ষক না থাকায় চর থেকে বড় বড় বিভিন্ন গাছ-পালা কেটে বন উজার করছে স্থানীয় কিছু লোকজন। এমন অবস্থায় এ সম্ভাবনাময় পর্যটক কেন্দ্রে রাষ্ট্রীয় ভাবে নজরদারি করা অতি জরুরি। তা না হলে কাপাসিয়াবাসী হারাবে সম্ভাবনাময় পর্যটক কেন্দ্রটি।
আপনি যেভাবন যাবেন চরে : ঢাকা থেকে সড়কপথে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে ধাঁধার চর। যেতে লাগে মাত্র ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। সড়কপথে ঢাকার গুলিস্তান বা মহাখালী থেকে বাসে চড়ে সরাসরি কাপাসিয়া এসে রাণীগঞ্জ যেতে হয়। বাস ভাড়া ১০০ টাকা। ওখানে গেলেই দেখা যাবে শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্র দুই নদীর মোহনায় নৌকার মতো ভেসে আছে এই ধাঁধার চর।





























