ট্রাম্প এবং কিম এর মশকরা অতঃপর কুড়াল যুদ্ধের কাহিনী

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

০২ আগস্ট ২০১৭, ০৯:৪২ পিএম


ট্রাম্প এবং কিম এর মশকরা অতঃপর কুড়াল যুদ্ধের কাহিনী

বিশ্বে বর্তমানে কমপক্ষে দুজন রসিক প্রেসিডেন্ট রয়েছেন। তাঁদের  একজন হলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর অন্যজন হলেন আমাদের এতদঞ্চলের উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন । তাঁরা দুজনেই প্রায় প্রতিদিন হাসি তামাসায় লিপ্ত হচ্ছেন। পরমানু বোমা দিয়ে প্রায় প্রতিদিনই একে অন্যকে ধ্বংস করার কথা বলছেন। আর আমরা হাবাগবা নিরূপদ্রব মানুষেরা প্রতিনিয়ত একবার এই মহামান্য ব্যক্তিদের কথায় হাসছি, আবার কখনও বা চিন্তায় কপাল কূচকে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকছি; এই বুঝি পারমানবিক বোমা উড়ে যাচ্ছে। এটা অনেকটা দুষ্ট বালক নিরীহ ভেকদের কাহিনীর মত।

এরই মধ্যে কিম একের পর এক ক্ষেপানাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। গত ২৯ জুলাই কিম ঘোষনা করেছেন বর্তমানে পরীক্ষিত আইসিবিএম দিয়ে উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের যে কোন স্থানে আঘাত হানতে সক্ষম।

অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার এই বেপরোয়া ক্ষেপানাস্ত্র পরীক্ষা ঝুকির্পূন ও বিপদজ্জনক বলে আখ্যায়িত করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর মতে এ ধরনের অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা উত্তর কোরিয়াকে (১) একঘরে করে দিবে (২) অর্থনৈতিকভাবে র্দুবল করে দিবে (৩) দেশটির জনগনকে অন্যান্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত করবে।

ট্রাম্প সাহেব মেক্সিকো, ইরান, সিরিয়া কিংবা অভিবাসী সমস্যা নিয়ে যত না গাল ভরা কঠিন কঠিন ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন, তত কঠিন শব্দ তিনি চীন, রাশিয়া কিংবা উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ব্যবহার করতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে তিনি উত্তর কোরিয়ার জনগনের জন্য খুব ‘ফিল’ করেন। কিন্তু ইয়েমেনের শিশুদের গন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার খবর, সিরিয়া কিংবা প্যালাষ্টাইনের জনগনের দূর্দশার খবর, আফ্রিকার হাড্ডিসার শিশুদের ছবি নিয়ে ট্রাম্প কিংবা তার দেশ যুক্তরাষ্ট্র ততটা চিন্তিত করে না।

আর অন্যদিকে কিম সাহেব ? ১৯৮৪ সালে জন্ম নেয়া মি: কিম মাত্র ২৭ বৎসর বয়সে বনে যান উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা। একাধারে মাত্র কয়েক মিনিটেই তিনি বনে যান চেয়ারম্যান অব দি ওয়ার্কারস পার্টি অব কোরিয়া, চেয়ারম্যান অব সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন, চেয়ারম্যান অব ষ্টেট এফেয়ার্স কমিশন এবং সুপ্রিম কমান্ডার অব কোরিয়ান পিপলস আর্মি। ১৮ জুলাই ২০১২ সালে মাত্র ২৮ বৎসর বয়সে তিনি নিজেই নিজেকে মার্শাল পদবিতে  ভূষিত করেন।

ক্ষমতা গ্রহন করেই অনেকটা বাসর রাতে বিড়াল মারার মত তিনি কিছু কর্মকান্ড ঘটিয়ে দিলেন। প্রথমটি হল ১২ ডিসেম্বর ২০১৩ সালে তথাকথিত বিশ্বাসঘাতকতার জন্য তিনি তাঁর আপন চাচা জেং সং-থেক কে প্রানদন্ড দিয়ে দেন। শুধু তা-ই নয় ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে তিনি তাঁর আপন ভাই কিম জং-নামকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেন।

এবার দেখে আসি কি হালচাল উত্তর কোরিয়ার আপামর জনসাধারনের। মি: কিম তাঁর জনগনকে যেখানে মানুষ বলেই মনে করেন না, সেখানে তাদের মানবধিকার নিয়ে চিল্লা চিল্লি করা বাতুলতা মাত্র। উত্তর কোরিয়ার বর্তমান জনসংখ্যা দুই কোটি চুয়ান্ন লক্ষের একটু বেশী। সেখানে রয়েছে বলপূর্বক শ্রম, কথায় কথায় মৃত্যুদন্ড এবং ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। কিন্তু তারই মাঝে রয়েছে প্রেসিডেন্ট অবিশ্বাস্য বিলাসবহুল জীবন। তাঁর ফুর্তির জন্য তো রয়েছে কিপ্পুমযো বা “প্লেজার স্কোয়াড”।

ঐদিকে আধুনিক ক্ষেপানাস্ত্র আঘাতের এত বড় কথা বলা হলেও ১৯৭৬ সালে মাত্র একটি গাছের মাথা কাটা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার সৈন্যদের মাঝে কুড়াল, গেতি, বেলচা দিয়ে হাতাহাতির যুদ্ধ হয়েছিল। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৮ আগষ্ট ১৯৭৬ সালে। ইতিহাসে এটাকে অভিহিত করা হয় “এক্স মার্ডার ইনসিভেন্ট” বা “হ্যাচেট মার্ডার ইনসিডেন্ট” নামে।

কোরীয় উপদ্বীপ পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত, যা পুর্বে জাপান সাগর এবং পশ্চিমে হলুদ সাগর দ্বারা বেষ্টিত। এই উপদ্বীপের ঠিক মাঝামাঝি কোরীয় অসামরিকীকৃত অঞ্চল বা ডিএমজেড অবস্থিত। এই ডিএমজেড বর্তমানে উত্তর কোরীয়া ও দক্ষিণ কোরীয়ার মধ্যে বাফার জোন হিসাবে কাজ করছে। ডিএমজেড এর দৈর্ঘ ২৫০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ৪ কিলোমিটার। যদিও জোনটি উভয় পক্ষের পৃথক অসামরিকীকৃত এলাকা হিসেবে বিবেচিত, তবুও এটা বিশ্বের সবচেয়ে ব্যাপক সামরিক উপস্থিতির এলাকা হিসেবে পরিগণিত। এই ডিএমজেড এর পশ্চিম অংশে দু‘দেশের নিরাপত্তা বাহনিীর প্রয়োজনে আলাপ আলোচনার জন্য একটি জয়েন্ট সিকিউরিটি এরিয়া বা জেএসএ আছে।

জেএসএতে একটি পুল রয়েছে যাকে বলা হয়“ব্রিজ অব নো রিটার্ন”। এই পুলটি ১৯৫৩ সালে কোরিয়ান যুদ্ধের পর নির্মান করা হয় এই পুল দিয়ে যুদ্ধ বন্দি বিনিময় হত। বন্দি বিনিময়ের সময় তাকে অপসন দেয়া হত যে সে যে কোন দেশেই বসবাস করতে পারে। কিন্তু একবার ব্রিজ পার হলে আর ফেরৎ আসা যাবে না। আর সে জন্যই এই ব্রিজের নামকরন করা হয় ‘ব্রিজ অব নো রিটার্ন’। 

এই ব্রিজের পাশেই ১০০ ফুট লম্বা একটি গাছ ছিল। এই গাছের ফলে জাতিসংঘ কমান্ড চেক পয়েন্ট ৩ থেকে পর্যবেক্ষন পোষ্ট ৫ কে দেখা যেত না। এই তুচ্ছ কারনে ১৯৭৬ সালের ১৮ আগষ্ট যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর   ক্যাপ্টেন আর্থার বনিফাস, প্লাটুন লিডার ল্যাফটেন্যান্ট মার্ক ব্যারেট ও দক্ষিন কোরীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন কিম এর নেতৃতে¦ ১১ সদস্যের সৈন্যবাহিনী কুড়াল নিয়ে ঐ গাছটি কাটতে যায়।

আর তখনই সেখানে উপস্থিত হন উত্তর কোরীয় সেনাবাহিনীর অফিসার ল্যাফটেন্যান্ট পাক চুল। সাথে ১৫ জন সৈন্য। পাক চুলের মতে এটা তাঁর নেতা কিম ওও সাং এই গাছ লাগিয়েছেন, প্রতিদিন পানি দিচ্ছেন এবং তার তত্ত্বাবধানেই এটা বড় হচ্ছে। এক পর্যায়ে লেফটেন্যান্ট পাক চুল হঠাৎ করে বলে উঠেন “মার শালাদের”। শুরু হয় গেতি, বেলচা ও কুড়াল দিয়ে হাতাহাতি, মারামারি। ফলে সংঘর্ষে দু’জন যুক্তরাষ্ট্রের অফিসার নিহত হন। এই কর্মকান্ডের প্রতিশোধ হিসাবে আমেরিকানরা ২১ আগষ্ট ১৯৭৯ সালে “অপারেশন পাউল বুনইয়ান” পরিচালনা করে। পুরো দক্ষিন কোরিয়া, জাপান ও প্রশান্ত মহাসাগরের সকল আর্মি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। মানে মশা মারতে কামান দাগানোর মত। প্রায় ১০০ জন দক্ষিন কোরিয় সৈন্য একযোগে গাছের মাথাটি কেটে ফেলে। জয়ের হাসি হেসে ভি চিহ্ন দেখিয়ে ব্যারাকে ফিরে আসে। তারপরই যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। আর এমনি করেই এতদঅঞ্চলে পরাশক্তিগুলো কান্ডজ্ঞানহীন কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়, যা তারা এখনও করছে।

লেখক: বর্তমানে এআইবিএ, সিলেটে কর্মরত।

Ads