আটটি প্রশ্নে থিতু বাংলাদেশের জঙ্গি তৎপরতা

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

২১ মে ২০১৭, ১১:৫৪ পিএম


আটটি প্রশ্নে থিতু বাংলাদেশের জঙ্গি তৎপরতা

আমি যখন  এ লেখা লিখছি তখন ১৭ মে ২০১৭ তারিখে ঝিনাইদহে জঙ্গি আস্তানায় দ্বিতীয় দিনের অভিযান চলছে। এর ০৬দিন আগেই গত ১১ মে ২০১৭ তারিখে শেষ হল রাজশাহী গোদাগাড়ি উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়নের বেনীপুর গ্রামের জঙ্গি বিরোধী অভিযান “অপারেশন সান ডেভিল”। বলতে গেলে ২০১৬ সালের ০১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান থেকে জঙ্গিরা সম্পূর্ন নবরুপে আত্মপ্রকাশ করে। আর সে জন্যই ২০১৬ সাল কে বলা হয় জঙ্গি হামলা আর অভিযানের বছর। সে থেকে ঝিনাইদহ হামলা পর্যন্ত জেএমবি ও জেএমবি’র ৭০জন জঙ্গি নিহত হয়েছে।

২০১৭ সালের মাঝা-মাঝি এসে আমরা যদি এর মূল্যায়ন করি তাহলে বিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসে পড়ে। যেমন-  (১)  জঙ্গিরা মানসিক দক্ষতা ও অস্ত্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আগের চেয়েও বেশী দক্ষ,  (২) জঙ্গিদের অস্ত্র সম্ভার  আধুনিক ও রনকৌশলে তারা এগিয়ে,  (৩) জঙ্গি বিরোধী অভিযানে আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী ক্ষেত্রবিশেষ সফল হলেও নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখ করারমত। গুলশান হলি আর্টিজন থেকেই আমাদের বাহিনীর সদস্যরা মৃত্যুবরণ করছে। এ ধরনের অপারেশনে হতাহতের ঘটনা থাকবেই। কিন্তু টপওয়ার্কিং সদস্যদের মৃত্যু এবং সর্বশেষ গোদাগাড়ি হামলায়  ফায়ার ব্রিগেডের একজন সদস্যের মৃত্যু কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আর এর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হল অপারেশনের সময় সমন্বয়হীনতা।
 

আর এজন্যই আজবদি নয়টি প্রশ্নে থিতু হয়েছে বাংলাদেশে জঙ্গি বিরোধী অভিযান। এই প্রশ্নগুলো একটি একটি করে আলোচনা করা যাক।
(১) জঙ্গিদের পরিচিতিঃ বাংলাদেশে বিভিন্ন অপারেশনে জড়িত জঙ্গিরা আইএস এর সদস্য কিনা সে প্রশ্নের সঠিক ও সুনির্দিষ্ট উত্তর আমরা এখনও পাইনি। অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন তারা সরাসরি আইএস এরসদস্য নাহলেও তারা আইএস এর মদদ পুষ্ট নূতন জেএমবি’র সদস্য। এদের সংগে আবার যোগ হয়েছে এবিটি’র সদস্যরা।


(২) জঙ্গিদের প্রশিক্ষনঃ জঙ্গিদের ধারাবাহিক আচরণ বিশ্লেষন করলে দেখা যায় তারা অস্ত্র চালনা ও রনকৌশলগত আচরণের অনেক উন্নতি স্বাধনকরেছে। এতে প্রশ্ন জাগে তারা তাহলে প্রশিক্ষিত কেন? কারাইবা তাদের এই প্রশিক্ষন দিচ্ছে? বিষয়টি এখনও আমাদের নিকট পরিস্কার নয়।

(৩) জঙ্গিদের অস্ত্রেরউৎসঃ আমি আমার আর একটি লেখায় লিখেছিলাম গুলশানের হলি আর্টিজান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গিদের ব্যবহৃত অস্ত্র ও অন্যান্য অভিযানে ব্যবহৃত প্রায় সকল অস্ত্রই প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আসছে। যেমন পয়েন্ট ২২ রাইফেল, সুইসাইডাল বেল্ট, ডিনামাইট, দেশীয় বোমা ও গ্রেনেড। এসব কিছুই উৎস হতে পারে পাকিস্তানের আফগান সীমান্ত। এমনকি এসব অস্ত্র গুলোর অরিজিনাল ভার্সন নকল করেও তারা সে সকল অস্ত্র বানাতে সক্ষম। গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন যে প্রায় সকল অস্ত্রই আসছে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম ও পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে। তাহলে এর বিরুদ্ধে কি অ্যাকশন আমাদের সরকার নিয়েছে তা আমাদের জানা নেই।


(৪) জঙ্গিদের অর্থের উৎসঃ আগে বলা হত বাংলাদেশের বিশেষ একটি ব্যাংক এই জঙ্গি অর্থের মূল উৎস। কিন্তু এখন এই ব্যাংককে সরকারই পরিচালনা করছে। তাহলে কে বা কারা এই অর্থের যোহান দিচ্ছে? বিশ্লষকদের মতে জঙ্গিদের নিকট টাকা আসে হুন্ডির মাধ্যমে। সেটি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। আসলে এ টাকা কোথা থেকে যে আসছে এ রহস্য উদঘাটন এখনো সম্ভব হয়নি।

(৫) জঙ্গিদের বাড়িভাড়াঃ জঙ্গিদের বাড়ী ভাড়া নিয়ে দেখা গেছে তারা অনেক যত্রতত্র অবস্থায় ভাড়া নিয়ে অবস্থান করেছে। আপাত দৃষ্টিতে মনে হয়েছে এর উপর কারোর কোন নিয়ন্ত্রন নেই। সর্বশেষ ১১ মে ২০১৭ তারিখের অপারেশন “অপারেশন সান ডেভিল” এ দেখলাম জঙ্গিরা একেবারে মাঠে উন্মোক্ত স্থানে বাড়ি বানিয়ে বাস করছেন। অথচ কেউ কিছু জানলনা। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগের প্রধান মনিরুল ইসলামের মতে “জঙ্গিরা কোনঠাসা হয়ে পড়েছে বলেই আত্মঘাতি হামলায় যাচ্ছে। আর একটি সময় তারা হিযরত করত, এখন নিজ বাড়িতেই গোলাবারুদ নিয়ে থাকছে। বাড়ীভাড়ার উপর আমরা এখনও তেমন কোন নিয়ন্ত্রন দেখছিনা।

(৬) অপারেশনে সমন্বয়হীনতাঃ গুলশান হামলায় দু’জন পুলিশ অফিসারের মৃত্যু, সিলেটে আতিয়া মহলে একজন লেঃকর্ণেল পদবির অফিসারের মৃত্যু এবং সর্বশেষ “অপারেশন সান ডেভিল” এর সময়ে একেবারে উন্মোক্ত মাঠে কর্তব্যরত একজন ফায়ার ম্যানের মৃত্যু আমাদের অনেক কিছুর সিগ্ন্যাল দেয়। বিশ্লেষণ করে দেখুন, তাহলে দেখা যাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে অসতর্কতা, অপারেশনে প্রপার রন কৌশল ও কাভারিং ফায়ারের ব্যবস্থার অপ্রতুলতা এবং সর্বপরী অপারেশনে বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয় হীনতাই দায়ী। বিভিন্ন অপারেশনে যেখানে জীবন মৃত্যুর  খেলা চলছে, সেখানে সাধারণ জনগন ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাটা চলা দেখলে মনে হয় তারা পার্কে ঘুড়াঘুড়ি করছেন। এসব কর্মকান্ড কেমন করে হচ্ছে তা আমাদের বোধগম্য নয়।
 

(৭) জঙ্গি বিরোধী অভিযানে সঠিক ও আধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জামাদির অভাবঃ এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু না বলে আমি একটা কথা বলতে চাই আমাদের এই শান্তি প্রিয় মানুষের দেশে অশান্তি শুরু হল কিন্তু। আমরা আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া ইত্যাদি দেশের নাম অনবরত বলছি। কিন্তু এখন? তবে কি সেই স্লোগানই সত্য হতে চলল, “আমরা হব তালেবান, বাংলা হবে আফগান”। সুতরাং সাধু সাবধান। যত ধরনের আধুনিক অস্ত্র, সরঞ্জামাদি, প্রশিক্ষন কিংবা মটিভেশন প্রয়োজন হকনা কেন তারই যোগাড় করা এখন সময়ের দাবি। সরকার এ ব্যাপারে কিভাবছে সে প্রশ্নের উত্তর আমরা জানিনা।
(৮) আত্মঘাতি বোমা হামলার সংস্কৃতি চালুঃ এ পর্যন্ত প্রায় সব অভিযানের সময়ই আত্মঘাতি বোমা হামলা করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জঙ্গিরা আত্মঘাতি বোমা হামলার মাধ্যমে নিজেদের শেষ করে দিয়েছে। এটা বড়ইএলার্মিং। এক্ষেত্রে সন্ত্রাস বিরোধী ও জঙ্গি বিরোধী অভিযানে জাতির ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। আমরা প্রায় প্রতিদিনই শুনি আফগানিস্তানে, পাকিস্তানে, ইরাকে, সিরিয়াতে এমনকি তুরস্কে আত্মঘাতি বোমা হামলায় এত এত মানুষ মৃত্যু বরণ করছে। তবে কি আমাদের দেশে তা শুরু হল? এই বড় প্রশ্নের কোন উত্তরআছে কি?

এই আট প্রশের উত্তর খুজে বের করা আজ সময়ের দাবি। এ ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। আর তাই নবম প্রশ্নে আমি বলতে চাই এ ব্যাপারে সরকার কিভাবছেন?

লেখক: বর্তমানে আর্মি ইন্সটিটিউট অব বিজনেস এ্যডমিনিষ্ট্রেশন, সিলেটে কর্মরত আছেন।

 

 

Ads