আজ শ্রমিক দিবস

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

০১ মে ২০১৭, ০৪:৩৬ এএম


আজ শ্রমিক দিবস

আজ পহেলা মে। মেহনতী জনতার প্রত্যয় দীপ্ত মহিমায় আত্মোৎসর্গের পথ বেয়ে আবার ফিরে এসছে মে দিবস। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ শ্লোগান আন্দোলন সংগ্রামের অনুপ্রেরণায় উৎস ও আলোকবর্তিকার দিন। বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবিদের আন্দোলন সংগ্রাম ও অধিকার আদায়ের অনুপ্রেরণার দিন।

১৮৮৬ সালের ১লা মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে হে মার্কেটে শ্রমের উপযুক্ত মূল্য এবং দৈনিক আট ঘন্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের উপর পুলিশের গুলিতে অনেক শ্রমিক হতাহত হয়। সে দিনের এই আত্বত্যাগের বিনিময়ে দৈনিক কাজের সময় আটঘন্টা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ঐতিহাসিক বিজয় ঘটে। ৮ ঘন্টা  শ্রম সময় নির্ধারণ, মজুরি বৃদ্ধি এবং ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল মে দিবসের মূল দাবি। শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকেই ঘন্টা কমানোর আন্দোলনের সূচনা ঘটে। সে সময় কাজের সময় ছিল সুর্যোদয় থেকে সুর্যস্ত পর্যন্ত ও কখনো ষোল থেকে আঠার ঘন্টা পর্যন্ত। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকরা এর প্রতিবাদ জানায়।কাজের ঘন্টা কমানোর জন্য আন্দোলন অব্যাহত ছিল এবং বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন গঠিত হতে থাকে। ১৮২৭ সালে গৃহ নির্মান শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকদের এক ধর্মঘটের মাধ্যমে দৈনিক কাজের ঘন্টা কমানোর দাবিতে দুনিয়ার প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন হিসাবে খ্যাত ফিলাডেলফিয়ার মেকানিকদের ইউনিয়নের জন্ম হয়।১৮৬৬ সালে ২০ আগষ্ট ৬০ টি ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা বালাট মোরে মিলিত হয়ে “ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়ন”গঠন করেন।যার নেতৃত্বে ছিলেন উইলিয়াম এইচ সিলভিস। সদ্য গঠিত ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়ন এর প্রতিষ্ঠা উপলক্ষ্যে সম্মেলনে বলা হয় শ্রমিক শ্রেণীদের পুজিবাদীদের দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে এই মুহুত্বে প্রথম এবং প্রধান কাজ হবে এমন একটি আইন তৈরী করা,যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রর সমস্ত রাজ্যই সাধারণ কাজের সময় হবে আট ঘন্টা। ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়নের আন্দোলনের ফসল হিসাবে গড়ে উঠে আট ঘন্টা শ্রম সমিতি। এ সংগঠনের পরিচালনায় যে রাজনৈতিক তৎপরতা সৃষ্টি হয় তার চাপে অনেক রাজ্যে সরকার কর্মক্ষেত্রের সময় দৈনিক আট ঘন্টা মেনে নেয়।১৮৬৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র আইন সভা এ বিষয়ে আইন পাম করেন।অপরদিকে শিকাগোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সংগঠিত ট্রেড ও লেবার ইউনিয়নের ফেডারেশন নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্টা হয়।যার সংক্ষিপ্ত নাম“ফেডারেশন অব লেবার”

১৮৮৫ সালে ফেডারেশন এর সম্মেলনে পরবর্তী বছর ১৮৮৬ সালে ১লা মে কারখানা ধর্মঘট করে শ্রমিক বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত পূণরায় ঘোষনা হয়। ৮ ঘন্টা কাজের দাবিতে ধর্মঘট তারিখ ঘোষনা দেবার পর ফেডারেশনের প্রতি আস্তা ও জনপ্রিয়তা অব্যহত গতিতে শ্রমিকদের মধ্যে আশানুরূপ ভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং সল্প সময়ের মধ্যে এ সংগঠনের সদস্য ২লাখ থেকে বৃৃদ্ধি পেয়ে ৭ লাখে পরিনত হয়। সংগঠনের কর্মিরা ব্যাপক উৎসাহের সহিত ধর্মঘটের প্রস্তুতি নিতে থাকে এবং শহরে শহরে গড়ে উঠে আট ঘন্টা শ্রম সমিতি। তৎকালিন সময়ে শিকাগো শহর ছিল ধর্মঘটের শহর।

নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, পিটসবুর্গ, বালটিমোড়, সিনসিন্নাটি, সিনওয়াকি, সেন্টলুইসহ অন্যান্য শহরে ১লা মে ধর্মঘটের কর্মসূচী গ্রহন করে। ১লা মে শিকাগোতে বিশাল সমাবেশ অনুষ্টিত হয়।সমস্ত শ্রমিক কাজ বন্ধ করে বেরিয়ে আসে,পালিত হয় নজির বিহীন শ্রমিক সমাবেশ।শ্রমিক আন্দোলনের এমন সংহতির বলিষ্ঠ প্রকাশ আর এখন দেখা যায় না। সে বছরই ৮ ঘন্টা ধর্মঘট আন্দোলনের চুড়ান্ত রূপ ধারন করে। কিন্তু এ আন্দোলন ধমাতে মালিক পক্ষ মরিয়া হয়ে উঠে এবং তেমন কোন সুবিধা করতে না পারায় প্রতিশোধ নিতে শ্রমিকের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। ১লা মে ঘটনার পর প্রত্যক্ষ পরিনতি ঘটে ৩ ও ৪ মে ঘটনাবলি,যা হে মার্কেটের ঘটনা বলে পরিচিত। ৩রা মে ম্যাক কমিক রিপার কারখানার ধর্মঘটি শ্রমিকদের এক সভায় পুলিশের হামলার শিকার হয়ে ৬জন শ্রমিক নিহত হয়।পুলিশের এমন আক্রমনের প্রতিবাদে ৪ মে হে মার্কেট স্কোয়ারের সামনে এক সভা অনুষ্টিত হয় এবং সভার শেষ পর্যায়ে পুলিশে আবারও আক্রমন করে সে সময় এক বোমা বিস্ফোরণে এক সার্জেন্ট নিহত হবার পর লড়াই আরো বেগ পেতে থাকে তাতে আরো ৪ জন শ্রমিক ও ৭ জন পুলিশ নিহত হয়। এ ঘটনার ফলে ফিসার, এনলেজ, পার্সনসহ ৮ জন শ্রমিককে ফাঁসিতে ঝুলানো হয় এবং শত শত শ্রমিককে জেলে পাঠানো হয়।

এমন ঘটনার পরেও ১৮৮৬ সালে দ্বিতীয় ভাগে চলে শ্রমিকদের উপর মালিকের অত্যাচার। শিকাগোতে শ্রমিক নেতার ফাঁসির এক বছর পর ১৮৮৮ সালে ফেডারেশন অব লেবার ”সেন্ট লুই সম্মেলনে আবারও ৮ ঘন্টা কাজের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয় এবং পূনরায় সংগঠিত হবার আহ্বান করা হয়। পরপর ২ বছর তারা কাজের সময় ৮ ঘন্টা করার আন্দোলন পূনরুজ্জীবিত করার জন্য ১লা মে তারিখ ধর্মঘট করার সিদ্ধান্ত নেয়। সে থেকেই অদ্যাবদি পর্যন্ত ১ লা মে শ্রমিক দিবস হিসাবে সারা বিশ্বে এক যোগে পালিত হয়ে আসছে।            

লেখকঃ  ফ্রি-ল্যান্সার, সোনারগাঁ , নারায়ণগঞ্জ। মোবাইল: ০১৭৩০০১৮৩৮৪

Ads