প্রসঙ্গ “ইন্ডিয়ানীতি”

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

২১ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ০৩:১৯ এএম


প্রসঙ্গ “ইন্ডিয়ানীতি”

।। সাহাবুদ্দিন লাল্টু ।। শতকরা একশত ভাগ হিন্দু মানুষের দেশ হলো নেপাল। সেই নেপালই যখন ইন্ডিয়ার সাথে কোনো রকমের সম্পর্ক ছাড়াই survive করতে চায়, তখন ইন্ডিয়া দেশ হিসেবে কেমন বুঝতে কারো অসুবিধা হবার কথা নয়। একই কথা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সবচেয়ে বেশী অবদান যে দেশ রেখেছিলো তার নাম ইন্ডিয়া। অথচ আজকের বাস্তবতায় বাংলাদেশের বেশীর ভাগ মানুষ ইন্ডিয়াকে পছন্দ করেন না। যে সব কারণে বাংলাদেশের মানুষ ইন্ডিয়াকে পছন্দ করেন না, তার মধ্যে বৃহত্তম দুটি হলো ১) ফারাক্কার পানি এবং ২) বর্ডার কিলিং। ইন্ডিয়া বাংলাদেশকে কোনঠাসা করতে করতে এমন এক যায়গায় নিয়ে দাড় করিয়েছে যে, বাংলাদেশে জনগনের ভোটাধিকার থাকবে কি না সেটাও এখন সে দেশের সরকারের দয়ার উপর নির্ভর করছে! ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনের প্রাক্কালে ইন্ডিয়ার স্বরাষ্ট্র সচিবতো বংলাদেশে এসে রীতিমত সিদ্ধান্তই দিয়ে গেছেন যে, কোন দল নির্বাচনে যাবে, আর কোন কোন দল যাবে না! কিছু কিছু রোগকে মানুষ জন্মগত রোগ বলে থাকেন। ধরে নেয়া হয় যে, এসব রোগ থেকে মানুষ মৃত্যু অবদি রেহাই পাবেন না। বাংলাদেশের জন্য তেমনি একটি রোগের নাম হলো ইন্ডিয়া। বাংলাদেশ যতদিন দেশ হিসেবে টিকে থাকবে, নামেই মাত্র স্বাধীন বলে বিবেচিত হবে। বাস্তবে বাংলাদেশটা ইন্ডিয়ার চোখে সেদেশের একটি অংগরাজ্যের চেয়েও কম গুরুত্বের বলে বিবেচিত হবে। বাংলাদেশের সাথে কোনো একটি যৌথ নদীর পানি বন্টন সংক্রান্ত একটি চুক্তির ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকা সত্বেও শেষ মূহুর্তে হলেও সে চুক্তি থেকে ইন্ডিয়া একতরফা সরে গিয়েছে শুধুমাত্র পশ্চিমবংগ সরকারের বিরোধীতার কারণে। এটা কল্পনাই করা যায় না যে, ইন্ডিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার তাদের কোনো একটি অংগরাজ্যের নির্বাচনে কোনো প্রকার কারচুপি নিজে করবে কিংবা অন্যকে করতে সহায়তা করবে। অথচ বাংলাদেশের বিগত একটি নির্বাচনে একটি দলকে কারচুপি করে ক্ষমতায় বসানোর জন্য ইন্ডিয়া এতোটাই একরোখা ছিলো যে, এ্যামেরিকার মত একটি দেশের বাংলাদেশে নিযুক্ত এ্যামব্যাসাডার যখন বাংলাদেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের উপায় নিয়ে জরুরী ভিত্তিতে আলোচনার জন্য ইন্ডিয়া ছুটে গেলেন, ইন্ডিয়া সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের একজন ছোট কর্মকর্তাও এ নিয়ে কোনো প্রকারের আলোচনার জন্য সে দেশে ছুটে যাওয়া এ্যামব্যাসাডারকে এমনকি একটি সৌজন্য এ্যাপয়িন্টমেন্ট পর্যন্ত দিতে সম্মত হননি। আর এই পানি চুক্তি থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের এক তরফাভাবে সরে যাওয়া কিংবা যে কোনো মূল্যে কারচুপির মাধ্যমে বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় তাদের পছন্দের একটি দলকে টিকিয়ে রাখা এ দুটি ঘটনাই এ কথা প্রমান করার জন্য যথেষ্ঠ যে, বাংলাদেশের মত একটি দেশের গুরুত্ব ইন্ডিয়ার কাছে সে দেশের যে কোনো অংগরাজ্যর চেয়েও অনেক নীচে অবস্থান করছে। বাংলাদেশের মর্যাদা ইন্ডিয়ার চোখে কেনো সে দেশের একটি অংগরাজ্যের চেয়েও নীচে তার জন্য ইন্ডিয়াকে একতরফা দোষ দেয়া যায় না। কেননা, দেশের মর্যাদা সমুন্নত রাখার জন্য বাংলাদেশের সতের কোটি মানুষ যদি সব সময় ঐক্যবদ্ধ থাকতেন, দশটি ইন্ডিয়া এক হয়েও বাংলাদেশের মর্যাদার এতটুকু হানি ঘটাতে পারতো না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অন্তত বিশ শতাংশ মানুষ আছেন যাদের কাছে নিজ দেশের চেয়েও ইন্ডিয়ার স্বার্থটাই অনেক বড়। এদের মধ্যে কেউ কেউ তো ইতিমধ্যে বলেই দিয়েছেন, ইন্ডিয়ার বিরোধীতা করলে বাংলাদেশেই থাকা যাবে না! আর এই বিশ শতাংশ অন্ধ ইন্ডিয়ার-সমর্থক বাংলাদেশীরা এতটাই সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী যে, বাকী আশি শতাংশ মানুষের ইচ্ছা এদের ইচ্ছার কাছে খুবই নগন্য। একটি ঘটনা আপনাদের মনে থাকার কথা। একবার বিএনপি প্রেসকে জানালে যে, ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সভাপতি বাংলাদেশের বর্তমানের সবচেয়ে বড় দল বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়াকে কোনো এক ব্যাপারে ফৌন করে সমবেদনা জানিয়েছেন। মূহুর্তেই আমরা দেখলাম, জনগনের ম্যান্ডেট ছাড়া ক্ষমতায় টিকে থাকা বর্তমান সরকার উঠে পড়ে লাগলো এ কথা প্রমানের জন্য যে, খালেদার মত এত নগন্য একজন মানুষকে ইন্ডিয়ার মত দেশের এত বড় একজন গন্যমান্য মানুষ কোনো রকমের সমবেদনা জানাতেই পারেন না। শেষ পর্যন্ত তারা সেটা প্রমাণও করলেন। এদের জন্য এটা প্রমান করাটা কিছুটা হলেও সহজ ছিলো এ জন্য যে, তারা (ইন্ডিয়া) বাংলাদেশে তাদের স্বার্থ রক্ষায় দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধুর মুখ রক্ষা করতে গিয়ে এই ফৌন করার কথাটিই শেষ পর্যন্ত অস্বীকার করে বসলেন! আমার এতসব কথার অর্থ হলো, ইন্ডিয়া পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যত হুংকারই দিক না কেনো, ফাইনালি তারা পাকিস্তানের সাথে কোনো প্রকারের যুদ্ধে না জড়ানোর সম্ভাবনাই বেশী। কেননা, তারা জানেন যে, পাকিস্তান ছাড়াও আশেপাশের অন্যান্য ছোট দেশ সবগুলোই তাদের উপর ক্ষেপে আছে। এসব দেশ ক্ষমতায় কুলাতে পারবে না বলে কখনই ইন্ডিয়াকে কিছু বলে না। কিন্তু পাকিস্তানের সাথে যদি ইন্ডিয়ার যুদ্ধ লেগে যায়, তাহলে নির্যাতিত এই ছোট দেশগুলো একযোগে ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে। সেজন্যই ইন্ডিয়া প্রয়োজনে ছোটোখাটো কোনো ক্ষতিকে নির্দিধায় মেনে নেবে। তবুও তারা সম্ভাব্য বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি নেবে না। আর এটাই হলো তাদের রাষ্ট্রীয় নীতি।         - চলমান

লেখক: ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও প্রাবন্ধিক

Ads