চাঁদ উঠা নিয়ে বিভ্রান্তির সমাধান হওয়া দরকার

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

০৬ জুলাই ২০১৭, ১২:২১ এএম


চাঁদ উঠা নিয়ে বিভ্রান্তির সমাধান হওয়া দরকার

ছবি-সংগৃহীত

প্রতিবারের মত চাঁদ দেখা নিয়ে মত পার্থক্যের ফলে আমাদের দেশে দুই দিন ঈদ উল ফিতর উদযাপিত হয় এবারও তাই হয়েছে। একটি দল মক্কা মদিনার দেশ সৌদি আরবের সংগে সংগতি রেখে একদিন আগেই রোজা রাখা শুরু করে, আর সেই সুবাদে একদিন আগেই তারা ঈদ উল ফিতর উদযাপন করে ফেলেন। যতই বলা হচ্ছে হাদিস অনুযায়ী চাঁদ দেখে রোজা রাখতে হয়, আবার চাঁদ দেখেই রোজা ভাঙতে হয়, কিংবা বলা হয় এই রোজা রাখা ও তৎপরবর্তী ঈদ উৎযাপন একটি সামাজিক ইবাদত, এবং সরকারই এটা শুরু ও শেষ ঘোষনা করবেন। অথচ দিনকে দিন পার্থক্য বেড়েই চলেছে। আগে চাঁদপুরের কিছু সম্প্রদায় ভুক্ত মুসলিম পরিবারের লোকজন সৌদি আরবের সংগে সংগতি রেখে এই রোজা ও ঈদ উৎযাপন করত। কিন্তু ইদানিং ঢাকা ও অন্যান্য জেলার অনেকেই এতে যোগ দিয়েছেন। আমি আমার ফেইসবুকের কলামে দেখলাম অনেক শিক্ষিত লোকেরাই এ ধারনা বশবর্তী হয়ে তাদের সংগে সংগতি প্রকাশ করে ঈদ উৎযাপন করেছেন। অনেকে আবার রোজা একই সাথে শুরু করলেও ঈদ করে ফেলেছেন একদিন আগেই। এতসব মত পার্থক্য সত্যিই এক যন্ত্রনায় ফেলে দিয়েছে এদেশের মুসলমানদের ।

 

একদিন আগে ঈদ উল ফিতর উদযাপনকারী দলের কিছু যুক্তির কথা তুলে ধরা যাক। প্রথমত : সৌদি আরব ইসলাম ধর্মের সূতিকাগার এবং মক্কা ও মদিনা মুসলমানদের তীর্থ স্থান। ধর্মীয় বিষয়ে তাদের অনুসরণ দোষনীয় তো নয়ই, অবশ্যই পালনীয় কর্তব্য। দ্বিতীয়ত: সৌদি আরবে চাঁদ দেখা গিয়েছে মানে চন্দ্র উদিত হয়েছে। তার অর্থ নিশ্চিত ভাবেই চন্দ্র মাস শুরু হয়েছে। পৃথিবীর একদেশে চন্দ্র দেখা গেলেই হল, ঈদ উদযাপন করা যাবে, যা হাদিসের বিপরীত নয়। তৃতীয়ত: অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ এর উপর সম্মানিত পাঠক নিশ্চয়ই অবগত  আছেন। সৌদি আরব ৪৫ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। বাংলাদেশ ৯০ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। পক্ষান্তরে জাপান ১৩৮ডিগ্রি, অস্ট্রেলিয়া ১৩৩ডিগ্রি এবং চীন ১০৪ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। কিন্তু এই তিনটি দেশ বাংলাদেশের পূর্বে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও তারা সৌদি আরবের সংগে একই অর্থাৎ ২৬ জুন ২০১৭ ঈদ-উল-ফিতর উৎযাপন করেছে। কি ভাবে সম্ভব হল? তবে কি তারাও সৌদি আরবের মত ২৫ জুন ২০১৭ তারিখ চাঁদ দেখেছিল ? কিংবা সৌদি আরব কি ২৫ জুন ২০১৭ তারিখে খালি চোখে চাঁদ দেখেছিল ? নাকি যন্ত্রের সাহায্যে দেখেছিল। এমনকি পাশের দেশ ভারতও ২৬ জুন ঈদ-উল-ফিতর উদযাপন করেছে ।

সম্মানিত পাঠকদের জ্ঞাতার্থে বলছি কোন একটি ঈদ এর উৎসব কিংবা ইসলামি অন্যান্য উৎসব কিন্তু প্রকৃত দিনের আগের দিন থেকেই শুরু হয় । অর্থাৎ ২৬ জুন ২০১৭ তারিখের ঈদ-উল-ফিতর শুরু হয়েছিল ২৫ জুন ২০১৭ তারিখের  সূর্যাস্তের পরপরই। আর তা  চলেছে ২৬ জুন ২০১৭ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তা হলে এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে সৌদি আরব সহ অন্যন্য দেশ যারা ২৬ জুন তারিখে ঈদ উদযাপন করেছেন, তারা ২৫ জুন ২০১৭ তারিখে সন্ধায় শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখেছেন, এটা তা-ই প্রমাণ করে।

যদি তা-ই হয়, তবে আসুন চন্দ্র উদয় নিয়ে কিছু বিশ্লেষন শুনি এবং ২৫ জুন ২০১৭ তারিখে পশ্চিম আকাশে তাত্ত্বিক ও প্রয়োগিক ভাবে চাঁদ দেখা গিয়েছে কিনা সে সম্পর্কে অবগত হই। 

আমরা জানি পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে। আর চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে। পৃথিবী একবার সূর্য্যকে চারদিকে ঘুরে আসতে সময় নেয় ৩৬৫. ২৪ দিন। আর চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে একবার ঘুরে আসতে সময় নেয় ২৯.৫ দিন । পৃথিবী থেকে চাঁদ দেখা কিংবা না দেখা, কিংবা কতটুকু দেখা যাবে তা প্রাথমিকভাবে নির্ভর করে এই সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের ঘূর্নয়নের খেলার উপর। আর বাকীটা হল আবহাওয়ার খেলা । যদি আকাশ পরিস্কার থাকে তা হলে চাঁদ দেখা যায়ই ।

আশ্চর্য হলেও সত্যি যে চাঁদের কোন আলো নেই, সূর্য্যরে আলোতেই চাঁদ আলোকিত হয় । আর আমরা চাঁদের যে অংশ দেখি তা সব সময়ই চাঁদের অধ্যাংশ। পুরো চাঁদ আমরা কখনও এক সংগে দেখি না। চাঁদের যে অংশ আমরা দেখি না তাকে বলা হয় “ডার্ক সাইড অব দি মুন”। সূর্য, পৃথিবী ও চন্দ্রের ঘূর্নয়নের কাল পৃথিবী থেকে চাঁদকে ৮টি পর্যায়ে দেখা যায। এগুলো হল (১) নিউ মুন, এটা এমন একটা সময় যখন সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী একই লাইনে থাকে। ফলে চাঁদের আলো পৃথিবীতে আসে না, আর চাঁদকেও দেখা যায় না। (২) ওয়াক্সিং ক্রিসেন্ট, যে সময় চাঁদের এক থেকে ৪৯ শতাংশ দেখা যায়। (৩) প্রথম কোয়ার্টার, যে সময় চাঁদের ৫০ শতাংশ দেখা যায়,  (৪) ওয়াক্সিং স্ফীত অংশ, যে সময় চাঁদের ৫১ থেকে ৯৯ শতাংশ দেখা যায়, (৫) ফুল মুন, যে সময় চাঁদকে সম্পুর্ন মানে পুরো অর্ধাংশ দেখা যায়, (৬) ওয়ানিং স্ফীত, যে সময় থেকে চাঁদ ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে এবং উক্ত সময়ে চাঁদ ৯৯ শতাংশ থেকে ৫১ শতাংশে নেমে আসে, (৭) তৃতীয় কোয়ার্টার, বা শেষ কোযর্টার, সে সময় চাঁদের সাইজ ৫০ শতাংশে নেমে আসে, অর্থাৎ এ সময়েও চাঁদের অধ্যাংশ দেখা যায়, সবশেষ হল (৮) ওয়ানিং ক্রিসেন্ট, যে সময় চাঁদের সাইজ ৪৫ শতাংশে থেকে এক শতাংশে নেমে আসে। তারপর চাঁদ চলে যায় নিউমুন স্টেজে; যখন চাঁদকে দেখা যায় না। চন্দ্রমাস শুরু হয় নিউ মুন পর্যায় থেকে। আর শেষ হয় ওয়ানিং ক্রিসেন্ট পর্যায়ে। এ হিসাবগুলো সঠিক ভাবে নির্ধারন করতে পারলেই চাঁদ কখনও আকাশ থেকে হারিয়ে যাবে না। শুরুতেই চাঁদ এবং সূর্য প্রায় একই সময় উদিত হয় পরবর্তীতে ঘূর্নয়নের ফলে চাঁদ সূর্য থেকে আলাদা হতে থাকে।

এখন দেখা যাক সৌদি আরব ও বিশ্বের অন্যান্য দেশ যখন ২০১৭ সালের ঈদ উল ফিতর উৎযাপন করল তখন চাঁদের অবস্থা কেমন ছিল। পুর্বেই বলেছি ২৫ জুন ২০১৭ তারিখ সূর্যাস্ত থেকে ২৬জুন ২০১৭ তারিখ সূর্য্যাস্ত পর্যন্ত সৌদি আরব ও বিশ্বেও অন্যান্য দেশ ঈদ উল ফিতর উৎযাপন করে। তার মানে ২৫ জুন ২০১৭ তারিখ সন্ধায় শাওয়াল মাসের চাঁদ সৌদি আরবের আকাশে উদিত হয়েছিল। ২৬ জুন ২০১৭ তারিখ ছিল আরবী শাওয়াল মাসের ০১ তারিখ। ২৫ জুন ২০১৭ তারিখে সৌদি আরবে আকাশে উদিত শাওয়াল মাসের চাঁদটি কেমন ছিল? সেদিন চাঁদ ছিল ওয়াক্সিং ক্রিসেন্ট অর্থাৎ উদয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে। সেদিন চাঁদের দীপন (ইলিউমিনেশন) ছিল ৩ শতাংশ । সূর্য ডুবার সংগে সংগেই চাঁদটি দেখা গিয়েছিল। ঐদিন চাঁদের বয়স ছিল ১.৬১ দিন, চাঁদটি দিগন্ত রেখা থেকে মাত্র .৫৪ ডিগ্রি কোনে ছিল, আর পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব ছিল সাড়ে তিন লক্ষ কিলোমিটার এর একটু বেশী। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয়টি ছিল ২৫ জুন ২০১৭ তারিখে সৌদি আরবে সূর্য্য ডুবে ছিল সন্ধা ৬টা ৪৫ মিনিটে। আর ঐদিন চাঁদ ডুবেছিল রাত ৯ ঘটিকায়। তা হলে ঐদিন চাঁদটি উদিয়মান ছিল ২ ঘন্টা ১৫ মিনিট। সেই সুবাধে সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশগুলো সন্ধার পরপরই ০২ ঘন্টা ১৫ মিনিটের মধ্যেই খালি চোখে অথবা যন্ত্র ও খালি চোখ এ দু’য়ের সমন্বয়ে চাঁদটি দেখেছিল এবং ২৬ জুন ২০১৭ তারিখে ঈদ-উল-ফিতর ২০১৭ উৎযাপন করেছিল।

আর আমরা? আমাদের দেশে গত ২৫ জুন ২০১৭ তারিখে সূর্য্য অস্ত গিয়েছিল ৬টা ৪৮মিনিটে। আর চাঁদ ডুবে ছিল ৮টা ২ মিানট ১৭ সেকেন্ডে। এ হিসেবে ১ ঘন্টা ১৪ মিনিট ১৭ সেকেন্ড আকাশে চাঁদ অবস্থান করছিল। তা হলে আমরা দেখতে পেলাম না কেন ? খুব সংক্ষিপ্ত সময় চাঁদটি আকাশে অবস্থান করেছিল বিধায় চাঁদ দেখার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে দিনের শুরুতেই প্রস্তুত থাকা উচিত ছিল।

অন্য দিকে ঐদিন চাঁদ না দেখার কিছু কারনতো আছে। হতে পারে সেদিন (১) আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল, (২) খালি চোখে চাঁদ দেখার চেষ্টা করা হয়েছিল, কোন অনুবীক্ষন যন্ত্র ব্যবহার করাহয়নি (৩) হতে পারে আমরা আগে থেকে ধরে নিয়েছি যেহেতু সৌদি আরবের একদিন পর আমরা রোজা শুরু করেছিলাম, সেহেতু সৌদি আরবের একদিন পরই আমাদের ঈদ হবে। তাতে এত চেষ্টা করে চাঁদ দেখার প্রয়োজন কি? তাই চাঁদ দেখার কোন চেষ্টাই হয়ত  সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ করেন নি।

আমি সে দিন একজন সম্মানিত ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম ঈদের চাঁদকি খালি চোখে দেখতে হবে, তিনি বলেছিলেন চাঁদকে খালি চোখে দেখতে হবে, কোন যন্ত্রের সাহায্য নেয়া যাবে না।

এ সম্পর্কে আমি একটি হাদিসের অবতারনা করছি। আসলে কেয়ামত পর্যন্ত ইসলামের হুকুম আহকামগুলো চালু রাখতে হলে ইসলামকে সংকীর্ণ করা চলবে না। আর সে কারনেই হাদিস হল এরকম। আবু হুরাইরা (রা:) কর্তৃক বর্নিত, নবী (স) বলেছেন “আমাকে সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপক অর্থ সম্বলিত কথা বলার ক্ষমতা/অনুমোদন দেয়া হয়েছে”। (সহিহ মুসিলিম ১০৬২-১০৬৭)। এর অর্থ এই যে আল্লাহতালা ও তাঁর রাসূলের কথাগুলোর অর্থ বা ব্যাখ্যার কোন নির্দিষ্ট সীমানা করতে নেই। দিন দিন ঈদ নিয়ে বিভাজন বাড়ছে। এটা দূর করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্রের অবশ্যই এমন শক্তিশালী সংস্থা থাকবে যারা এ ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য প্রয়েজনীয় যন্ত্রপাতি ও দলিল নিয়ে হাজির থাকবেন। চাঁদকে সারা বছর অনুসরন করা যায়। আমাদের আবহাওয়া অধিদপ্তর একাজটি করতে পারে। শুধুমাত্র ইসলামিক ফাউন্ডেশন কিংবা জেলা প্রশাসকের এ ব্যাপারে দায়িত¦ দিলেই চলবে না। গত ২৫ জুন ২০১৭ তারিখে অবশ্যই বাংলাদেশের আকাশে শাওয়ালের চাঁদ উদিত হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দেখার ক্ষমতা ছিল না। সেটাই বড় কথা। তবে দেখা না গেলেও ২৭ জুন ২০১৭ তারিখে আমরা ঈদ উল ফিতর উদযাপন করেছি, সেটাও সঠিক ছিল। কারন বাহাদুর সরকার এই সামাজিক উৎসব পালনের ঘোষণা প্রদানের জন্য ক্ষমতা রাখেন, এটা বাদ দিয়ে অন্য দেশের সংগে সংগতি রেখে উৎসব পালন মোটেই সংগতিপূর্ণ নয়। এটা বুঝতে হবে। তাই আগামীতে সরকার এই ব্যাপারে সঠিক এবং শক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন দেশের মুসলমানদের প্রত্যাশা।

 

লেখক: মেজর তারিকুল ইসলাম মজুমদার, পিএসসি, জি (অব:), বর্তমানে এআইবিএ, সিলেটে কর্মরত।

 

Ads