জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১
প্রাপ্তি ও কৌশলের রোডম্যাপ বাস্তবায়নের দ্বায়বদ্ধতা নিয়ে কথা বলবে বাংলাদেশ
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম
অভিনেতা মোশাররফ করিম। ছবি : সংগৃহীত
আগামী নভেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি ও বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতির ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও বিরল সন্ধিক্ষণ হতে যাচ্ছে। একদিকে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে জাতিসংঘের চূড়ান্ত উত্তরণ-প্রস্তাবনার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, অন্যদিকে একই সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম নীতি-নির্ধারণী আসর। এত দিন স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যেসব বিশেষ সুবিধা, বাণিজ্যছাড় ও জলবায়ু তহবিল পেত, উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে সেই অগ্রাধিকারের সুযোগগুলো ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসবে। অথচ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান আধা শতাংশের (০.৫%) কম হওয়া সত্ত্বেও বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকিতে দেশটি এখনো বিশ্বের ৭ম ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত। এ অবস্থায় আয় বৃদ্ধির অজুহাতে বদ্বীপের দুর্যোগ-ঝুঁকি কমার সুযোগ নেই; তাই এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশের মূল সুর হওয়া উচিত—উত্তরণ যেন কোনো শাস্তিতে পরিণত না হয় এবং সহায়তার ক্ষেত্রগুলো যেন টেকসই হয়।
জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু সম্মেলন (কপ৩১) আগামী ৯ নভেম্বর সোমবার থেকে শুরু হয়ে ২০ নভেম্বর শুক্রবার ২০২৬ পর্যন্ত তুরস্কের আন্তালিয়া শহরে অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্বমঞ্চের এই প্রধান সম্মেলনের পাশাপাশি এর প্রাক্-সম্মেলন পর্বটি বসছে প্রশান্ত মহাসাগরের দুই অতি-ঝুঁকিপূর্ণ দ্বীপরাষ্ট্র ফিজি ও টুভালুতে। এবারের সম্মেলনের আয়োজক দেশ তুরস্ক এবং দর-কষাকষির নেতৃত্বে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। প্রাক-সম্মেলন ও মূল সম্মেলনের যৌথ সমন্বয়ে আয়োজকেরা এবারের আসরকে ‘বাস্তবায়নের সম্মেলন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, যার মূল লক্ষ্য নতুন প্রলোভন বা প্রতিশ্রুতির বদলে পুরোনো অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন করা।
এবারের কপ৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রথম কৌশলগত দাবি হওয়া উচিত—জলবায়ু অর্থায়নের প্রধান মাপকাঠি মাথাপিছু আয় নয়, বরং প্রকৃত ভৌগোলিক ‘ঝুঁকি’ হতে হবে। এলডিসি উত্তরণের পর অন্তত ৫ থেকে ৭ বছর যেন বাংলাদেশ আগের মতো সহজ শর্তে বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিলে প্রবেশের সুযোগ পায়, সে জন্য বিশেষ উত্তরণ-সহায়তার দাবি তুলতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু অর্থায়ন কেবল অঙ্কের হিসাবে অনুদান নাকি ঋণ—তা স্পষ্ট করা জরুরি। সম্প্রতি ঘোষিত ২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার ও বছরে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক লক্ষ্যের বড় অংশ যদি ঋণের মোড়কে আসে, তবে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশের ওপর ঋণের বোঝা আরও বাড়বে। বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (NAP) অনুসারে ২০৫০ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, যার মধ্যে বছরে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক অনুদান ও সহজ শর্তের অর্থায়ন হিসেবে আসা উচিত, যাতে অভিযোজন ব্যয় আগামী প্রজন্মের ঋণে পরিণত না হয়। একই সঙ্গে অভিযোজন অর্থায়ন তিন গুণ করার সময়সীমা ২০৩০ থেকে ঠেলে ২০৩৫-এ পিছিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদ জানাতে হবে।
ক্ষয়ক্ষতি (Loss and Damage) তহবিল কেবল কাগজের কাঠামোতে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত ছাড়যোগ্য ও সরাসরি জাতীয় পর্যায়ে ব্যবহারযোগ্য করার জোরালো প্রস্তাব দিতে হবে। কারণ, নদীভাঙনে এক রাতে বাস্তুচ্যুত পরিবার প্রকল্প প্রস্তাব লিখে তিন বছর অপেক্ষা করতে পারে না। উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির সংস্থান, লবণসহিষ্ণু ফসল ও স্থানীয় নেতৃত্বাধীন অভিযোজনে প্রাধান্য দিতে হবে। নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন সীমান্ত কর (CBAM), যা ২০৩০ সালের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতে যুক্ত হতে পারে। উত্তরণ-পরবর্তী শুল্ক এবং কার্বন কর মিলিয়ে পোশাক রপ্তানিতে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি চাপ আসতে পারে। কার্বন কমানোর অজুহাতে বাণিজ্যপ্রাচীর তোলা বন্ধ করা এবং শিল্পের ‘সবুজ রূপান্তরের’ জন্য ন্যায্য প্রযুক্তি ও অর্থ সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি তুলতে হবে।
বাংলাদেশ বৈশ্বিক টেবিলে কেবল অভিযোগ নয়, বরং নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব নিয়ে হাজির হতে পারে। ২০৩৫ সালের মধ্যে বিদ্যুতের ২৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আনার জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে সৌরবিদ্যুৎ, সঞ্চালন গ্রিডের আধুনিকায়ন ও সবুজ শিল্পায়নে সুনির্দিষ্ট ‘বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প’ প্রদর্শন করতে হবে। একই সঙ্গে কার্বন বাজার নীতিমালায় সতর্ক থেকে সুন্দরবন বা উপকূলীয় বনভূমিকে বিদেশি কোম্পানির সস্তা ‘অফসেট’ করা থেকে রক্ষা করতে হবে। সদ্য গঠিত জাতীয় জলবায়ু অর্থায়ন কমিটির মাধ্যমে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রূপরেখা তুলে ধরতে হবে। আন্তালিয়া সম্মেলনে এলডিসি জোট, জি-৭৭ এবং ফিজি-টুভালুর মতো জলবায়ুবিপন্ন দ্বীপরাষ্ট্রগুলোকে সঙ্গে নিয়ে একটি শক্তিশালী ‘টিকে থাকার জোট’ গড়ে তুলে বিশ্বকে দেখাতে হবে—বাংলাদেশ কেবল দুর্যোগের শিকার নয়, বরং বৈশ্বিক সমাধানেরও এক অগ্রণী অংশীদার।


























