আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসঃ শিক্ষার্জনকে বয়সের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৭:৪৮ পিএম


আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসঃ শিক্ষার্জনকে বয়সের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়

মো. জিল্লুর রহমান।


সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি গুরুত্ব সহকারে পালন করা হয়। আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হলো জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা বা ইউনেস্কো-ঘোষিত একটি আন্তর্জাতিক দিবস। ১৯৬৬ সালের ২৬ অক্টোবর ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনের ১৪তম অধিবেশনে ৮ সেপ্টেম্বর তারিখকে “আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস” হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৬৭ সালে প্রথমবারের মতো দিবসটি পালিত হয়। দিবসটির লক্ষ্য ব্যক্তি, সম্প্রদায় এবং সমাজের কাছে সাক্ষরতার গুরুত্ব তুলে ধরা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন দেশের সাক্ষরতা এবং বয়স্ক শিক্ষার তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা।। বর্তমানে জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্র এ দিবসটি পালন করে থাকে।

 

আভিধানিক অর্থে সাক্ষরতা হল অক্ষর পরিচিতি, লেখা ও পড়ার ক্ষমতা। অর্থাৎ যদি কোনাে ব্যক্তি কোনাে বিষয় পড়ে, সেটা লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করতে সক্ষম হয় তাহলে তাকে সাক্ষর বলে। আন্তর্জাতিক সংজ্ঞানুযায়ী, সাক্ষরতা হচ্ছে পড়া, অনুধাবন করা, মৌখিকভাবে ও লেখার বিভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করা, যোগাযোগ স্থাপন করা এবং গণনা করার দক্ষতা। অর্থাৎ সাক্ষরতা বলতে লিখতে, পড়তে, গণনা করতে ও যোগাযোগ স্থাপন করার সক্ষমতাকে বোঝানো হয়। বিশেষজ্ঞরা সাক্ষরতা সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে বাংলাদেশের পঞ্চম শ্রেণি পাস করা শিক্ষার্থীর সমমানের হতে হবে বলে মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন। সাক্ষরতা শব্দটি অবশ্য দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়—ব্যবহারিক সাক্ষরতা এবং আনুষ্ঠানিক সাক্ষরতা। ব্যবহারিক সাক্ষরতা বলতে বোঝায় লেখা, পড়া এবং গণিতের সাধারণ জ্ঞান অর্জন করা আর আনুষ্ঠানিক সাক্ষরতা হল স্কুল, কলেজে পড়ে যে শিক্ষা পাওয়া যায়।

 

তবে সার্বজনীন সাক্ষরতা বলতে বুঝায় ব্যক্তির দৈহিক, মানসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রে শিক্ষার যথার্থ ব্যবহারকে। সার্বজনীন সাক্ষরতার প্রথম উদ্দেশ্য হল সকল শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ঘটানো। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের মন থেকে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার দূর করে চিন্তাভাবনাকে বিজ্ঞানসম্মত ও যুক্তিশীল করে তোলা। তৃতীয়ত, সার্বজনীন সাক্ষরতার উদ্দেশ্য হল শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে জাতীয় উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা। চতুর্থত, মানব সম্পদের সার্বিক উন্নয়ন ঘটানো। পঞ্চমত, এর আরেকটি উদ্দেশ্য হল প্রতিটি মানুষকে তার অধিকারবােধ সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। ষষ্ঠত, নাগরিক হিসেবে প্রতিটি মানুষের দেশের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলি সম্পর্কে সচেতন হওয়া। সপ্তমত, প্রতিটি মানুষের মানসিক বিকাশ সাধন করা অর্থাৎ চিন্তাভাবনা, বুদ্ধি, বিচারশক্তি, বিশ্লেষণী ক্ষমতার বিকাশ সাধন করা।

 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রায়োগিক সাক্ষরতা নিরূপণের জন্য দেশের সকল জেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে বলা হয়, দেশের ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের প্রায়োগিক সাক্ষরতার হার ৭২.৯৭। এছাড়া ১৫ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের ক্ষেত্রে এ হার ৬০.৭৭। পড়তে, লিখতে, বুঝতে ও গণনা করতে পারে—দেশে এমন প্রায়োগিক সাক্ষরতা সম্পন্ন মানুষের হার ৬২.৯২। এর আগে ২০১১ সালে ১১ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের নিয়ে জরিপ চালানো হয়। তখনকার জরিপে প্রায়োগিক সাক্ষরতার হার ছিল ৫৩.৭০। এই বয়সসীমা ধরলে বর্তমান জরিপে প্রায়োগিক সাক্ষরতার হার ৭৩.৬৯। এর অর্থ গত ১৩ বছরে এই হার বেড়েছে ১৯.৯৯। অন্যদিকে ২০২২ সালের জনশুমারির প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী জাতীয়ভাবে দেশে সাক্ষরতার হার ৭৪.৬৬ শতাংশ। এক্ষেত্রে পুরুষের হার ৭৬.৫৬ শতাংশ ও নারী ৭২.৮২ শতাংশ। ২০১১ সালের জনশুমারির প্রতিবেদন বলছে, সাক্ষরতার হার ছিল ৫১.৭৭ শতাংশ। তবে দেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের জন্য লক্ষ্যমাত্রায় আছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে নিরক্ষরমুক্ত করতে হবে।

 

আমরা অনেকেই জানি, 'লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে’ প্রবাদটি গ্রাম-বাংলায় বহুল প্রচলিত প্রবাদসমূহের মধ্যে অন্যতম। শতবছর আগে মদন মোহন তর্কালঙ্কার তার শিশু শিক্ষা বইটিতে এই কথাগুলো লিখেছিলেন যা ক্রমেই মানুষের মুখে মুখে ফিরে আসছে। মনযোগী অমনযোগী প্রায় সকল শিক্ষার্থী এবং ছোট-বড় সকলেই জীবনে অন্তত একবার হলেও লাইন দু’টি শুনেছে বা কাউকে শুনিয়েছে। আমাদের সমাজে প্রায় প্রতিটি শিশুকে অত্যন্ত যত্নের সাথে একথাই বোঝানো হয় যে লেখাপড়া করলে ভাল চাকরী পাওয়া, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়। অনেক টাকা কামানো কিংবা গাড়ী-বাড়ি করা এর মূল উদ্দেশ্য নয়, বরং লেখা পড়ার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন, বাড়ি-গাড়ি করা হয়ে ওঠে শিশুটির পড়ালেখার একমাত্র উদ্দেশ্য। তবে, বাস্তবতা বড়ই কঠিন। ঘোড়ার চল উঠে গেছে বহু আগেই। আর এখন সবাই গাড়িতে চড়তে পারে, অন্তত লোকাল বাসে চড়তে কারো লেখা পড়ার দরকার নেই। গাড়ি প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফোর্ডের মালিক হেনরি ফোর্ডের কথা উল্লেখযোগ্য। হেনরি ফোর্ড কিন্তু অত পড়ালেখা করেন নি। তিনি যে শুধু গাড়ি চড়েছেন তাই নয়, বিশাল একটা গাড়ি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাও করেছেন।

 

মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার অন্যতম শর্ত হল সাক্ষরতা অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষা অর্জন। শিক্ষাকে তুলনা করা হয় আলোর সাথে। জ্ঞান মানুষকে আলোকিত করে, মুক্ত করে অজ্ঞতার অভিশাপ হতে, মানুষকে আগামীর পথ চলতে সহায়তা করে। কাজী নজরুল ইসলাম আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম শুনেন নি এমন কেউ তো দুই বাংলায় নেই। দুজনের নামেই অসংখ্য স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় আছে। তাদের কিন্তু তেমন কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাসনদ ছিল না। অথচ এখন নজরুল রবীন্দ্রনাথের উপর পি.এইচ.ডি করেছে বা করবে এমন লোক অগনিত আছে। আলবার্ট আইনস্টাইনও কিন্তু হাই স্কুল পাশ করতে পারেননি। আব্রাহাম লিংকন, উইনস্টন চার্চিল, শেকস পিয়ার, হেনরি ফোর্ড, মার্কটোয়াইন, স্টিভ জবস এবং এমন আরো অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি আছেন যারা তথাকথিত উচ্চ শিক্ষিত নন। তাদের তেমন কোন প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট ছিল না। অথচ দেখুন এদের কথা না পড়লে উচ্চ শিক্ষিত হওয়া যায়না, ভাল একটা চাকরীও কপালে জোটে না।

 

বিশ্বের বড় বড় বুদ্ধিজীবি, শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক যারা এখনও নিজেকে বিকিয়ে দেননি তাদের হয়ত দামী গাড়ী নেই। এদের অভিজাত এলাকায় বাড়ি নেই, ফ্ল্যাটও নেই। অনেকেই আবার ভাড়া বাড়িতেও থাকেন। তবে তাদের আছে জ্ঞানের ভান্ডার, আলোর মশাল। যা যুগে যুগে আলোকিত করে এসেছে বিভিন্ন সমাজ ও জাতিকে। তারা পড়ালেখা করে ভাল লাগে বলে, এর পেছনে গাড়ি-বাড়ি করার উদ্দেশ্য নেই। পৃথিবীর উন্নত ও উন্নয়নশীল প্রতিটি দেশ বয়স্ক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে থাকে কেননা যে জাতি যত শিক্ষিত, সে জাতি তত উন্নত। শিক্ষা ও জাতীয় উন্নয়ন পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। বাংলাদেশ সরকারও জাতীয় শিক্ষানীতিতে বয়স্ক শিক্ষাকে গুরুত্ব প্রদান করে বিভিন্ন ধরণের কৌশল সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণ শিক্ষা ধারার সাথে বয়স্ক শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমেই জনগণকে শিক্ষিত করার মাধ্যমে কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করা সম্ভব।

 

আমরা প্রায়শঃ খবরে দেখি মা ছেলে কিংবা পিতা পুত্র একত্রে এসএসসি কিংবা স্নাতক পরীক্ষায় পাশ করেছে। এগুলো এক ধরনের উৎসাহ ব্যঞ্জক ও অনুপ্রেরণাদায়ক খবর। আসলে লেখা পড়ার নির্দিষ্ট কোন বয়স নেই। জীবনের যেকোন সময় লেখাপড়া করা যায়। এক্ষেত্রে বয়স একটি আপেক্ষিক সংখ্যামাত্র। প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো কাজে বাধা হতে পারে না বয়স। হরহামেশা এ কথাগুলো আমরা অনেককেই বলতে শুনি। তবে ইতালির জিউসেপ্পে প্যাতার্নো এ কথাকে বাস্তবে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। তিনি ৯৮ বছর বয়সে পড়াশোনা করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তাঁকে বলা হচ্ছে ইতালির সবচেয়ে বয়স্ক শিক্ষার্থী। তাছাড়া, ভারতের রাজ কুমার ভাইশ নামের এক ব্যক্তি ৯৮ বছর বয়সে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি ভারতের একটি ইউনিভার্সিটি থেকে ২০১৫ সালের শিক্ষাবর্ষে অর্থনীতিতে মাস্টার্স শেষ করেন। আবার শ্রীকান্ত জিচকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের সবচেয়ে শিক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ তার একটি বা দুটি নয়, মোট ২০টি ডিগ্রী ছিল। তিনি ৪২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার মাধ্যমে এই ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি এমনই নিষ্ঠার সাথে পড়াশোনা করেছেন মাত্র ২৫ বছর বয়সেই তার নামে ১৪টি ডিগ্রি ছিল। শুধু তাই নয়, বেশিরভাগ পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ পেয়েছেন এবং এর পাশাপাশি তিনি অনেক স্বর্ণপদকও অর্জন করেছেন। পৃথিবীর আনাচে কানাচে এ রকম হাজারো দৃষ্টান্ত আছে। বয়সের বাধা লেখাপড়া বা জ্ঞানার্জনকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বাংলাদেশের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও যেকোন বয়সে যেকোন ডিগ্রি অর্জন করা সম্ভব। শুধু দরকার মনের অদম্য ইচ্ছা শক্তি আর প্রবল আগ্রহ। লেখাপড়ার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, চোখের পর্দা খুলে সমগ্র পৃথিবীকে দেখতে পারি। কিন্তু সেটা যখন পাঠ্যপুস্তকে আর পরীক্ষার খাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায় কিংবা এর পেছনে যদি টাকা কামানোই একমাত্র উদ্দেশ্য হয় তখন ব্যাপারটা উদ্বেগের বটে। কারণ দেশ ও জাতি গঠনে সুশিক্ষিত নাগরিকের থেকে স্বশিক্ষিত নাগরিকের গুরুত্ব বেশী।

 

বাংলাদেশের সংবিধানে শিক্ষা মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা রাষ্ট্রীয়  মূলনীতি হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। এরপরও এদেশে নিরক্ষরতার হার কমেনি। সকল শ্রেণির মানুষকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় আনা প্রায় অসম্ভব। শিশুদের একটি বৃহৎ অংশ নানা কারণে স্কুলে ভর্তি হতে পারে না। যারা ভর্তি হয় তাদের  মধ্যে অনেকেই ঝরে যায়, আর স্কুলে ফিরতে পারে না। এদের জন্যই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রয়োজন। যারা স্কুলে পড়ার সুযোগ পায়নি, আনুষ্ঠানিক শিক্ষার অভাবে নিরক্ষর রয়ে গেছে তাদের জন্যও এটি আবশ্যক। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমেই মূলত বয়স্কদের ব্যবহারিক শিক্ষা দেওয়া হয়। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত শিশু, কিশোর ও বয়স্কদের জন্য বিকল্প শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করাই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। এক্ষেত্রে শিক্ষাকে বয়সের ফ্রেমে আবদ্ধ না রেখে সার্বজনীন সাক্ষরতার মাধ্যমে সকলকে শিক্ষিত করার আন্দোলনে সকলকে এগিয়ে আসা উচিত।

 

ব্যাংকার ও কলাম লেখক,
সতিশ সরকার রোড, গেন্ডারিয়া, ঢাকা।

Ads