নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে নবান্ন উৎসব
১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০৫:৪৩ পিএম
উৎসব বলতে মূলত আনন্দময় অনুষ্ঠানকে বোঝায়। উৎসবের মাধ্যমে আমরা আনন্দ লাভ করে থাকি। তবে এ আনন্দ একার আনন্দ নয়। পারিবারিক, সামাজিক বা সাম্প্রদায়িক পরিমণ্ডলে সকলের সম্মিলনে সুখ বা আনন্দ লাভের উপায় হলো উৎসব। উৎসব মানুষে মানুষে প্রীতির বন্ধনকে দৃঢ় করে, হৃদয়কে করে প্রসারিত। সঞ্চারিত করে অপার আনন্দ; দেয় নবতর চেতনা। ইংরেজি ‘Festival ’ কথাটির বাংলা অর্থ হলো উৎসব। আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের উৎসবের প্রচলন রয়েছে। উৎসবগুলোকে প্রধানত কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। ধর্মীয়, সামাজিক, জাতীয়, সাংস্কৃতিক তার মধ্যে উৎকৃষ্ট। সকল শ্রেনির উৎসবের মত এ দেশের নানা ধরনের সামাজিক উৎসব রয়েছে। বাংলা নববর্ষ, হালখাতা, বিবাহ, ভাইফোঁটা, অন্নপ্রাশন, খৎনা, জন্মদিন, নবান্ন, শ্রাদ্ধ, পৌষপার্বণ ইত্যাদি আমাদের দেশের সামাজিক উৎসব। এসব সামাজিক উৎসবের মধ্যে নবান্ন হচ্ছে একটি। নবান্ন উৎসব হল নতুন আমন ধান কাটার পর সেই ধান থেকে প্রস্তুত চালের প্রথম রান্না উপলক্ষ্যে আয়োজিত উৎসব। সে ক্ষেত্রে 'নবান্ন' শব্দের অর্থ 'নতুন অন্ন'। সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান পাকার পর এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৮ সাল থেকে রাজধানী ঢাকা শহরে আনুষ্ঠানিকভাবে নবান্ন উৎসব উদযাপন শুরু হয়েছিল। অন্যদিকে গবেষকদের মতে কৃষি প্রথা চালু হবার পর থেকে নবান্ন উৎসব পালন হয়ে থাকে। তবে ৪৭ এর দেশভাগের পর এই উৎসব ধীরে ধীরে কদর হারাতে থাকে।
অগ্রহায়ণের হিম হিম হেমন্ত দিনে আনন্দধারায় ভাসে কৃষকের মন-প্রাণ। কারণ তখনই আমন ধান কাটার মাহেন্দ্র সময়। বাড়ির উঠোন ভরে উঠে নতুন ধানের মৌ মৌ গন্ধে। নতুন ধানের ভাত মুখে দেওয়ার আগে কোথাও কোথাও মিলাদ, মসজিদে শিন্নি দেওয়ার রেওয়াজ আছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের কৃষকের ঘরে পূজার আয়োজন চলে ধুম-ধামে। কৃষিভিত্তিক সভ্যতার পুরোভাগে থাকা এই নবান্ন উৎসব অনাদি কাল হতে বাঙালির জীবন অধিকার করে আছে। মেয়েকে নাইয়র আনা হয় বাপের বাড়ি। নতুন চালের ভাত আর সেই চাল ভাঙিয়ে চালের পিঠা তৈরি করা হয়। মেয়ে জামাই থেকে শুরু করে নিকট আত্মীয়স্বজনের আগমনে মুখরিত হয় পুরো বাড়ি। খাওয়া হয় বিভিন্ন রকম পিঠাপুলি। গ্রাম বাংলার প্রতি ঘরে ঘরে তৈরি করা হয় দুধপুলি, তিলপুলি, নারিকেলপুলি, দুধের পিঠা, তেলের পিঠা, সেমাই পিঠা, ভাঁপা পিঠা, চিতই পিঠা, মুঠি পিঠা ও পাঠিসাপটা পিঠা। এ সময় বিবিধ ব্যঞ্জনে অন্নাহার, পিঠেপুলির উৎসবের আনন্দে মুখর হয় জনপদ। আগে নবান্ন উৎসবে খাবার খাওয়ার প্রতিযোগিতা করা হতো। যে যত বেশি খেতে পারত তাকে উপহার দেওয়া হতো দুগ্ধবতী গাভী কিংবা ছাগল। বিভিন্ন স্থানে মেলা বসত। নবান্ন উৎসবকে ঘিরে কৃষকরা আয়োজন করত। লাঠিখেলা, হা-ডু-ডু, ষাঁড়ের লড়াই, নৌকাবাইচসহ বিভিন্ন খেলাধুলার।
দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে লক্ষ্মীপূজা, পিতৃশ্রাদ্ধ,বীরবাশ এই তিনটি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা পর কাকবলি করা হতো। বাড়ির উঠানের মাঝখানে একটি গর্ত করা হয়। তার চারপাশে পিটুলী দিয়ে আলপনা আঁকা হয়। গর্তে জ্যান্ত কই মাছ ও কিছু দুধ দিয়ে একটি বাঁশ পোতা হয়। সেই বাঁশের প্রতি কঞ্চিতে ধানের ছড়া বাধতে হয়। এটাকে বীরবাশ বলে। এ প্রথা সব অঞ্চলে প্রচলিত না থাকলেও বরিশালে প্রচলিত। একটি কলার ডোগায় নতুন চাল, কলা, নারকেল নাড়ু কাককে খাওয়াতে হয়। এ প্রথার নাম হচ্ছে কাকবলি। নবান্ন উৎসব এর অন্যতম প্রথা হচ্ছে এটি। প্রচলিত বিশ্বাস হচ্ছে কাকের মাধ্যমে ওই খাদ্য মৃতের আত্মার কাছে পৌঁছে যায়। এক সময় ঢেঁকির সুরেলা শব্দ ফুটিয়ে তুলত নবান্ন উৎসব। বাড়ি বাড়ি পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যেত। অগ্রহায়ণের নতুন ধান ঘরে আনার আগে মাটি এবং গোবর গুলিয়ে বাড়ির আঙিনা ও ধানের গোলা লেপে পরিপাটি করা হতো। লোকজন নতুন ধানের আঁটি মাথায় করে এনে ফেলত লেপে রাখা ওই উঠোনে। এর পর মাড়াই করে ধান রোদে শুকিয়ে মচমচে করা হতো। সেই ধান ঢেঁকিতে পিষে চাল তৈরির পর ওই চাল গুঁড়ো করে তৈরি করা হতো পিঠা-পায়েস। কৃষকরা সারাদিন কায়িক পরিশ্রম করে উঠোনের পাশে বসে যেতেন খেতে। ঋতুচক্রে এই সময় শীতের আগমন ঘটে বিধায় খেজুরগাছে শুরু হয় গাছিদের হাঁড়িতোলা। একদিকে নতুন ধানের আতপ চাল, অন্যদিকে খেজুরের রস। এই দুয়ের রসায়নেও তৈরি হতো মুখরোচক পায়েস।
নবান্ন উৎসবের সঙ্গে মিশে আছে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। বিশ্বায়নের এই যুগে বাংলার ঐতিহ্যগুলো ক্রমেই হারিয়ে যেতে বসেছে। আজকের গ্রামবাংলার শিশুরা যেন স্বপ্নের মধ্যে নবান্নের উৎসবের ইতিকথা বাবা-মা কিংবা দাদা-দাদির মুখে মুখে শোনে। বর্তমানে আমনের জায়গা দখল করেছে আউশ-আমন-বোরো ধান। যেখানে আগে কৃষকের প্রধান খাদ্যশস্য ছিল আমন ধান। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ধানের বীজ থেকে চাল উৎপাদন হওয়া পর্যন্ত সব কাজই এখন যান্ত্রিক পদ্ধতিতে হচ্ছে। তাছাড়া বিভিন্ন জাতের উচ্চফলনশীল ধান বাজারে আসায় নতুন ধানের গন্ধ হারিয়ে যাচ্ছে এবং স্বল্প সময়ে ওইসব ধান উৎপন্ন হওয়ায় গ্রামবাংলার ঐত্যিবাহী নবান্ন উৎসব হারিয়ে যেতে বসেছে। অন্যদিকে খেলার মাঠের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই ডিজিটাল যুগে খেলার জায়গা বলতে এক চিলতে বারান্দা। শিশুদের খেলার মাঠের জায়গা দখল করে নিয়েছে ট্যাব, মোবাইল কিংবা কম্পিউটারের ছোট্ট মনিটর। দুরন্ত শৈশবটাই যেন হারিয়ে যাচ্ছে তাদের। নগরায়ণ আর আধুনিকতার অজুহাতে বিলীন হচ্ছে সব ঐতিহ্য। তেমনি গ্রামীণ জনপদে দিগন্তবিস্তৃত ফসলের মাঠ আছে; কিন্তু কৃষকের ঘরে নেই নবান্নের আমেজ। এমন করে নিরবে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসব কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে। নবান্ন পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী উৎসব। নবান্ন এক অসাম্প্রদায়িক উৎসব। এ উৎসব বাঙালি জাতিকে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ করে। তাই কালের বিবর্তনে হারাতে বসা বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য পিঠা-পুলি উৎসবে গ্রামবাংলার জনপদ আবার মুখরিত হয়ে উঠুক।
শিশু সাহিত্যিক ও সাংবাদিক





















