১৪ ডিসেম্বর একটি ঘৃণ্য নীল নকশার নাম

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

১৪ ডিসেম্বর ২০২২, ০৩:২২ পিএম


১৪ ডিসেম্বর একটি ঘৃণ্য নীল নকশার নাম

খায়রুজ্জামান খান সানি। ছবি- প্রতিদিনেরচিত্র বিডি

 

ত্রিশ লক্ষ শহীদের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশটি আজ সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়ে। এগিয়ে যাচ্ছে সকল কঠিন পরিস্থিতি সামলে নিয়ে। নব গঠিত এ দেশটির কথা স্মরণ করলে গর্বে পুরো বাঙ্গালী জাতির হৃদয় পূর্ণ হয়ে যায়। আজ বুদ্ধিজীবীদের কথা, শহীদদের রক্তে রাঙা মানচিত্রের কথা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর আত্মত্যাগের কথা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে, থাকবে অমর হয়ে।

বুদ্ধিজীবীরা একটি দেশের মস্তিস্ক ও একটি জাতির বিবেক। মূলত, তাদের দক্ষতা এবং সত্যনিষ্ঠা জাতির অগ্রগতিতে মূখ্য ভূমিকা পালন করে। তাঁরা দার্শনিক, গবেষক এবং জাতির পথ প্রদর্শক। এই বুদ্ধিজীবিদের সঠিক বিশ্লেষণ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্র বা জাতির উন্নয়নে অগ্রণীভুমিকা রাখতে সক্ষম হয়। যুগযুগ ধরে মানুষের এবং দেশের আদর্শবাদ ও সত্যের হাতিয়ার বাঁচিয়ে রাখে এই বুদ্ধিজীবিরাই।

 
বাঙালি জাতির মহান মুক্তিযুদ্ধে বেদনাদায়ক ও দুঃখজনক অধ্যায়ের নাম বুদ্ধিজীবী হত্যা।

১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর বাঙালির মেধাশুন্য করতে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়। ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইট পরিকল্পনার সাথে একসাথেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা অপারেশন চলাকালীন সময়ে খুঁজে-খুঁজে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে ২৫শে মার্চের রাতেই হত্যা করা হয়। ইতিহাসের পাতায় কালো অধ্যায় হয়ে বাঙালির মনে ক্ষত হয়ে থাকবে। কারণ, বুদ্ধিজীবীদের আদর্শ ও কর্মকান্ড দেশের সর্বস্তরের জনগণের জন্য কল্যাণকর। কিন্তু এসকল সত্যের পথ প্রদর্শক এবং দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী বুদ্ধিজীবী মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে যারা নিজ স্বার্থ দেখেছিল সেসকল মানুষের সাথে শত্রুতায় জড়িয়ে যায়।

 

কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজী, শিক্ষাবিদ, দার্শনিকসহ বিশিষ্ট বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের তাদের বাড়ি থেকে তুলে আনা হয় এবং গেস্টাপোর রায়েরবাজার বধ্যভূমি এবং মিরপুরে তাদের হত্যা করা হয়। তাদের হাত পিছে বাঁধা ছিল এবং মাথায় গুলি করা হয়েছিল। বর্বর হত্যাকাণ্ডে পরবর্তীতে তাদের নামমাত্র সনাক্ত করতে পেয়েছিল। দেশের সোনার সন্তানদের এভাবে হত্যার পেছনে নেতৃত্ব  দিয়েছিল তথাকথিত গভর্নর, মেজর জেনারেল রাও ফোরমান আলী। তিনি বুদ্ধিজীবী ও উচ্চশিক্ষিত শ্রেণিকে হত্যার মাধ্যমে  সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্রের মূল পরিকল্পনা করেছিলেন। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান জেনারেল নিয়াজির তত্ত্বাবধানে গঠিত আধাসামরিক বাহিনী আল-বদর ছিলেন সেই জঘন্য গণহত্যার উদ্বোধক। তাদের উদ্দেশ্য ছিল অপহরণ এবং হত্যার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে আতঙ্ক প্রকাশ করা। তার প্রেক্ষিতে বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়৷ অনেককে জ্যান্ত কবর দেওয়া হয়, আবার অনেকের চোখ উপড়ে ফেলা হয় আবার অনেককে এতটা নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় যাদের পরবর্তীতে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। যাদের মধ্যে বধ্যভূমি থেকে অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ, ডাঃ ফজলে রাব্বি, ডাঃ আলিম চৌধুরী,  চিহ্নিত করা যায়, যদিও সহিদুল্লাহ কায়সার, অধ্যাপক মুনিয়ার চৌধুরী, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ এবং আরও অনেককে চিনতে পারেনি। ১৪ ডিসেম্বর রাতে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর ও আল শামস বাহিনীর সহায়তায় দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিজ নিজ গৃহ হতে তুলে এনে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে। এই পরিকল্পিত গণহত্যাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত।

 

নবগঠিত দেশটিকে পঙ্গু ও দুর্বল করে দিতে এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত দিক থেকে দুর্বল করে দিতে চেয়েছিল। বাঙালি জাতির জন্য যা ছিল অকল্পনীয়। আমরা  যা হারিয়েছি তা ফিরে পাবার নয়।  বাংলাপিডিয়া হতে প্রাপ্ত্য তথ্য অনুযায়ী, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যায় শিক্ষাবিদ ছিলেন সর্বোচ্চ। যা  দেশের মেধা শুন্যের কোটায় সর্বোচ্চ।  অবৈধ ও সুবিধাবাদী স্বাধীনতাবিরোধী মানুষের ষড়যন্ত্রে  পা দিয়েছিল দিয়েছিল বুদ্ধিজীবীরা এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে বুদ্ধিজীবীদের সনাক্ত করতে সহায়তা করেছিল। বুদ্ধিজীবীদের অপহরণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তুলনামূলকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থী এবং তথাকথিত সাংবাদিকদের ব্যবহার করা হয়েছিল। সেনাবাহিনীর অপহরণ অভিযানের কথা বিবেচনা করে রাও ফোরমান আলী বুদ্ধিজীবী হত্যায় বদর বাহিনীকে ব্যবহার করেছিলেন।

 

আমরা যদি দেশের উন্নয়নের দিকে তাকাই, দেশের অগ্রগতিতে যাদের ভূমিকা মূখ্য ছিল বিবেচনা করি তাহলে দেখতে পাই বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা সর্বাধিক। সুতারং, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও  আমাদের জাতীয় উন্নয়নের অগ্রযাত্রার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে আমরা কয়েক ঘন্টা বা কয়েক দিন বা কয়েক মাস মারা যাওয়া শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আদর্শের দ্বারা আলোকিত হতে পারি না মহান বিজয় দিবসের  আগে। আমাদের উচিত বুদ্ধিজীবীদের প্রতিটা সময়, প্রতিটা সেকেন্ড তাদের আত্মত্যাগের কথা  সর্বোচ্চ সম্মানের সহিত স্মরণ করা এবং তাদের আদর্শে উজ্জীবীত  হয়ে দেশের কল্যাণে কাজ করা।


খায়রুজ্জামান খান সানি
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

Ads