আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখিকা মৈত্রেয়ী দেবী

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

২৯ জানুয়ারি ২০১৯, ০৪:০৬ পিএম


আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখিকা মৈত্রেয়ী দেবী

সময় আমাদের শরীরকে জীর্ন করে, শরীরের চামড়াকে কুঁচকে দেয়। হয়তো বদলে দেয় পরিবেশকে ব্যক্তিকেও। কিন্তু দেহস্থিত "প্রেম" বা "সত্য জ্ঞান" অমর। কখন যে তা পরিধি বাড়িয়ে মনের শূন্য আসল পূর্ণ করে দেয়, তা উপলব্ধি করাই যায় না।  সময় বা পরিস্থিতি শুধু তার ওপর প্রলেপ দিতে পারে কিন্তু নিশ্চিহ্ন করতে পারে না। এই বিষয়টি অনেকটা অবগত হই আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখিকা মৈত্রেয়ী দেবী (রু/অমৃতা/মৈত্রেয়ী) সম্পর্কে জানতে এসে,পড়তে এসে,লিখতে এসে। এমন একশতজন লেখিকাকে নিয়ে লিখতে এসে উনাদের কে জানা। এক একজনের সম্পর্কে পড়ছি আর অবাক হচ্ছি। অর্জন করছি অভিজ্ঞতা। উপলব্ধি করছি দুঃখ কষ্টকে। শুধু কি তাই? বাড়ছে ধৈর্যের পরিধি ও। শেয়ার করছি বন্ধুদের সাথে পরের প্রজন্মের সাথে। বর্তমানের আমরা কত অধৈর্য কত বেশি আবেগি কত বেশি অসচেতন। 

১৯১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাবা সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের কর্মস্থল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহধন্য লেখিকা মৈত্রেয়ী দেবী। বরিশালের রত্নগর্ভা গ্রাম গৈলার অন্যতম কৃতী সন্তান প্রখ্যাত দার্শনিক প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত মৈত্রেয়ী দেবীর বাবা, মায়ের নাম হিমানী মাধুরী রায়। মৈত্রেয়ী দেবীর শৈশব কাটে বাবার বাড়ি বরিশাল জেলার আগৈলঝারার গৈলা গ্রামে। তবে পিতার কর্মক্ষেত্রের সুবাদে তিনি কৈশরেই সপরিবারে কলকাতার ভবানীপুরে বসবাস শুরু করেন। সেই সাথে ক্রমেই তিনি তৎকালীন কলকাতার "এলিট" বা "ক্রিম অব কলকাতা" সম্প্রদায়ের সহচর্য তথা স্নেহধন্যা হতে থাকেন। ভবানীপুরের বিখ্যাত এই বাড়িতে রোজ আনাগোনো হয় তৎকালীন বিখ্যাত সব লেখক লেখিকা, সম্পাদকদের, এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও। 

১৯৩৬ সালে মৈত্রেয়ী দেবী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগমায়া দেবী কলেজ থেকে প্রাইভেট রেজিস্ট্রেশন করে দর্শনে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। স্নাতক ডিগ্রী লাভের আগেই ১৯৩৪ সালে তিনি ড. মনোমোহন সেনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মনোমোহন সেন ছিলেন একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী। তিনি মংপুতে সিনকোনা ফ্যাক্টরির ম্যানেজার ছিলেন ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধী ভেষজ সিনকোনা চাষ নিয়ে গবেষণা করেন।মংপুতে সিনকোনা চাষের ব্যাপারে তাঁর স্বামীর বিশেষ অবদান ছিলো। মৈত্রেয়ী দেবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহভাজন হওয়ায় তারা মংপুতে থাকাকালীন রবীন্দ্রনাথ মৈত্রেয়ীর আমন্ত্রণে ১৯৩৮ সাল থেকে ১৯৪০ সালে চারবার সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন।

শৈশবে  মনিষী সাহিত্যিক বর্গের সাহচর্যে বড়ো হয়েছেন মৈত্রেয়ী দেবী। সাহিত্য জীবনের স্ফুরণ নিতান্ত অল্পবয়সেই তাঁর। মাত্র ১৬ বছর বয়সে ১৯৩০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উদারতা’ যার ভূমিকা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ নিজেই। তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'চিত্তছায়া'। ১৯৪২ সালে রবীন্দ্রনাথের মংপুতে কাঠানো দিনগুলোর স্মৃতি ও তার সাথে আলাপচারিতা নিয়ে লিখেন স্মৃতিকথা 'মংপুতে রবীন্দ্রনাথ'। কবির অন্তরঙ্গ আলাপচারিতার এক উজ্জ্বল পরিচয় ফুটে উঠেছে এই অনবদ্য গ্রন্থে। অসাধারণ জনপ্রিয়তার কারণে বইটি ইংরেজিতে অনুদিত হয় ‘টেগোর বাই ফায়ারসাইড’ নামে। রবীন্দ্র বিষয়ক তাঁর অন্যান্য গ্রন্থ: স্বর্গের কাছাকাছি, বিশ্বসভায় রবীন্দ্রনাথ, গৃহে ও বিশ্বে, কবি সার্বভৌম, রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ দি ম্যান বিহাউন্ড হিজ পেয়েট্রি প্রভৃতি। তার ‘অচেনা চীন’,'মহাসোভিয়েত’, ‘চীনে ও জাপানে’ প্রভৃতি গন্থ এ বিষয়ে স্মরণীয়। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: বিধি ও বিধাতা, এত রক্ত কেন, ঋগবেদের দেবতা ও মানুষ, হিরন্ময় পাখি, আদিত্য মারীচ প্রভৃতি। 

সাহিত্যরচনা ছাড়াও সমাজসেবামূলক কর্মে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহন করেছেন মৈত্রেয়ী দেবী। ১৯৬১-তে রবীন্দ্র শতবর্ষে বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রিত হয়ে তিনি সোভিয়েত রাশিয়া, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া ও গণতান্ত্রিক জার্মানিতে গিয়েছিলেন। সোভিয়েট ইউনিয়ন তাঁকে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী পদকে ভূষিত করে। মৈত্রেয়ী দেবী সোভিয়েট ইউনিয়ন, ইউরোপ ও আমেরিকাতে রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি শান্তির সমস্যা বিষয়ক বহু ভাষণ দেন। তিনি ১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলাকালীন 'কাউন্সিল ফর প্রমোশন অব কমিউনাল হারমনি' সংস্থা স্থাপন করেন।১৯৭১ সালের বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এছাড়া এই সময়ে তিনি কলকাতা থেকে ২৪ মাইল দূরে বাদু নামক গ্রামে একটি ৯ বিঘা জমি জুড়ে কৃষি, মীন পালন, মৌ পালন, গো পালন, হাঁস কুকুর পালনের সাথে শরনার্থী শিবিরের অনাথ শিশুদের জন্য 'খেলাঘর' নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এই সংস্থার দেখাশুনা করেন।

তাঁর আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস 'ন হন্যতে' পাঠক মহলে তাকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে আসে। 'ন হন্যতে' মানে 'যাকে বিনাশ করা যায় না'। এই বইতে তিনি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, জীবন বোধ, ইংরেজ শাসনামলে ভারতের সমাজ ব্যবস্থা এবং জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরেন। এই বইটির জন্য তিনি ১৯৭৬ সালে ভারতীয় "লেখিকা সংঘ" থেকে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। বইটি ইংরেজি ভাষায় (It Does Not Die: A Romance) নামে অনূদিত ও প্রকাশিত হয়। লেখিকার জীবন বোধ, দৃষ্টিভঙ্গি মূল চরিত্র মির্চার তুলনায় নিঃসন্দেহে অনেক গভীর, যা পাঠক মহলকে বেশ নাড়া দেয়। তার অনেকগুলো গ্রন্থ একাধিক ভারতীয় ভাষায় অনুদিত হয়েছে। সাহিত্য ছাড়াও সমাজসেবায় অনন্য অবদান রাখার জন্যে ১৯৭৭ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ সম্মাননা পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৮৯ সালের ২৯ জানুয়ারি ৭৪ বছর বয়সে ভারতের কলকাতায় মৃত্যু বরণ করেন মৈত্রেয়ী দেবী।

১৯২৮ বা ২৯ খ্রীস্টাব্দে মির্চা ইউক্লিড (ইলিয়াদ) নামের এক রোমানিয়ান যুবক অতিথি হিসেবে আশ্রয় গ্রহন করেন মৈত্রেয়ী দেবীদের দাসগুপ্ত পরিবারে। লক্ষ্য ছিল ভারতীয় ভাষা-সংস্কৃতি তথা প্রাচ্যের দর্শন সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ। মির্চার শিক্ষক গৃহকর্তা সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ঘটনাক্রমে তাঁর ষোড়শী কন্যা "রু"কে (রু/অমৃতা/মৈত্রেয়ী) দায়িত্ব দেন রোমানিয়ান এই তরুনকে বাংলা শেখানোর, এবং মির্চকে ভার দেন রু-কে ফরাসী ভাষা শেখানোর। কিন্তু এই অত্যন্ত মেধাবী ও বিদ্যানুরাগী এই তরুন-তরুনী জীবনে ভিন্ন-ভাষা-সংস্কৃতির বাঁধ সরিয়ে 

প্রেমের স্রোত ঢুকে পড়েন। কিন্তু দুই ধর্মের এই প্রেমিক প্রেমিকার সেই প্রেম আপাত-পূর্নতায় রূপ নেয়নি। বাধ্য হয়ে মির্চাকে আতিথ্যের আসন ত্যাগ করে বাড়ি ছাড়তে হয়। বাধ্য হয় ভারত ছেড়ে নিজের দেশে ফিরে যেতে। ১৯৩৩ এ ফরাসী ভাষায় তার লেখা "লা নুই বেঙ্গলি" নামে একটি আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস লিখেন। এই উপন্যাসে তিনি মৈত্রেয়ী দেবীর সাথে তার প্রনয়কাহিনী তুলে ধরেন, উপন্যাসটি লিখে তিনি বিখ্যাত হন।

১৯৩০ সালে যে প্রেম পূর্নতা পায়নি, বহু প্রতিক্ষার পর অন্য ভাবে সেই প্রেমের পূর্নতা আসে ১৯৭২ সালে মৈত্রেয়ী দেবীর "ন হন্যতে" নামক আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস প্রকাশের পর। ১৯৩০ এ যে প্রেম আধ-পোঁড়া হয়ে ষোড়শী অমৃতার মনকে বন্ধী করতে পারেনি। অথচ পরিস্থিতির বশীভুত করে বিয়ে করতে হয় অন্যকে, সংসার করেন নিখুঁতভাবে। ১৯৭২ সালে ৫৮ বছরের পৌঢ়া অমৃতা যৌবনের সেই অমর প্রেমের দহনে নিজেকে পুরোপুরি উপস্থাপিত করে ছুটে যান কলকাতা থেকে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে মির্চা ইলিয়াদকে দেখতে। 'ন হন্যতে' পাঠককুলের প্রশ্ন তবে কি শুধু মাত্র জাতের মিল ছিলো না বলেই এই প্রেমের পূর্ণতা পায়নি। মির্চা খুব আপন করে নিয়েছিল পরিবারের সবাইকে। প্রতিভাবান বিশ্ববিশ্রুত দার্শনিক মনস্বী এবং প্রবন্ধকারের পরিবারও সংস্কার ভাঙার সাহস করেনি। নাকি এসবই  আত্মগরিমার জন্যে হয়েছে। ১৯৩০ সালে ঘটে যাওয়া একটি কাহিনি চল্লিশ বছর পর প্রাক্তন বিচ্ছেদের পুনর্জাগরণ 'ন হন্যতে'। উপন্যাসটিতে আসলে মৈত্রেয়ী দেবী আত্মার অমরত্বের পাশাপাশি প্রেমের অমরত্বের কথা বলেছেন।

মৈত্রেয়ী দেবীর লিখেছেন,"জ্ঞানের আলো, বুদ্ধির আলো ইত্যাদি সব কিছুরই একটি সীমানা আছে। প্রেমের আলোর সীমানা নেই।" মৈত্রেয়ী দেবীর পরিচয়ে আছে অনেক ভিন্নতা। যাকে সবসময় পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় বিখ্যাত দার্শনিক সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের কন্যা, রবীন্দ্রনাথের ভাবশিষ্য আর স্নেহে লালিত। আবার তিনি পরিচিত হন মির্চা ইলিয়াড (ইউক্লিড) নামের বিখ্যাত রোমানিয়ান দার্শনিক এর “লা নুই বেঙ্গলী” উপন্যাসের নায়িকা হিসেবে। উল্লেখ্য The Bengali Nights নামে মির্চা ইলিয়াডের লেখা নিয়ে সিনেমাও হয়েছিল। রুমানিয়ান ভাষায় 'লা নুই বেঙ্গলী’ উপন্যাসটি ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত হয়ে ফরাসী ভাষায় অনুদিত হয় ১৯৫০ সালে। মৈত্রেয়ী দেবী এর সম্বন্ধে অবগত হন অনেক পরে। পাঠকের কাছে মনে হয় ‘ন হন্যতে’ আর ‘ লা নুই বেঙ্গলী’ বইদুটি পরস্পরের মধ্যে কথা বলে, প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, দেয় জবাবও।

১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩০ ভবানিপুরের বাড়ি থেকে বিদায়লগ্নে অমৃতা শেষবারের মত বারান্দায় দাঁড়িয়ে মির্চাকে লক্ষ্য করে বলেছিল -

"অজ: নিত্য শাশ্বতোহয়ং পুরানো ন হন্যতে হন্য মানে শরীর' আজ সে শরীর নেই কিন্তু সে আছে, সে অম্যতা"। তাই ঐ সময়ের অমৃতা - মির্চাকে বানাতে অনুরোধ করলাম আমি পুনর্বার। বিশেষজ্ঞ টিমের সদস্য 'ট' বললো - "এমন করলে কেমন হয়? ক্লোনের পর অমৃতাকে তার ভবানিপুরের বাড়িতে স্থাপন করা হবে। আর মির্চা স্থাপিত হবে কাশির কাছে শালবনের ছায়াঢাকা পাথুরে পথের পাশে পার্বত্য নদীর ওপারে ব্র্রহ্মপুরী অরণ্যে, ঋষিকেশের পাশেই 'স্বর্গাশ্রম' যার নাম ছিল। কালীকম্বলিওয়োলার ধর্মশালার ভোজনালয় ঠিক নৈকট্যে। ওখানে এক গুহায় ছাইমাখা জটাধারী কমণ্ডলুক সন্যাসিরূপী 'মির্চা'। 'ট'র এমন নিখুঁত বর্ণনায় হেসে উঠলো সবাই সমস্বরে। এবং তাই সিদ্ধান্ত হলো। কেবল ক্লোন নয়, ১৯৩০'র আবহ ও পরিবেশ সৃষ্টি করে স্থাপন করা হবে তাদের দুজনকে ঐ সময়ের ভারতে!

(প্রিয় পাঠক, আমার লেখা এখানেই শেষ, আসলে এই ব্যক্তিকে নিয়ে লিখতে গেলে শেষ হবে না। তবে উনার সম্পর্কে পড়তে গিয়ে যার লেখাটা আমায় খুব আকর্ষণ করে তিনি হলেন ড. লজিক্যাল। তাই আমার লেখার শেষে উনার লেখাটাও যোগ করলাম।) 

অমৃতা-মির্চা এলিয়াদের প্রেম ও পরবর্তী কথামালা মৈত্রেয়ী দেবীর 'ন হন্যতে'র সম্পর্কে ড. লজিক্যাল লিখেছেন---

"আমার জানা অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রিয় ব্যক্তিদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ, বঙ্গবন্ধু, হুমায়ুন আজাদ প্রমুখের নাম ছাড়িয়ে কেন যেন তাদের আগেই আমার মনে নাড়া দিলো ১৯৩৩-সনে রুমানিয়ান, ১৯৫০-এ ফ্রেঞ্চ ও শেষে ১৯৮৮ সনে বাংলাতে 'লা নুই বেঙ্গলী' এবং তার প্রতি জবাবে ১৯৭৪- সনে প্রকাশিত মৈত্রেয়ী দেবীর 'ন হন্যতে'র কথা। দুটো আত্মজৈবনিক উপন্যাসই পড়া ছিল আমার ছাত্রাবস্থায়। এমনই পড়া ছিলো যে, আজ এক হাজার বছর পরও এই ৩০১৬-সনে হুবহু ঐ ঘটনার অনুপুঙ্খ মনে আছে এক অমীয় প্রেমের গল্পকথনের মত। 'অমৃতা' আর 'মির্চা'র ক্লোন করার পুস্তাবনা শুনে ও 'লা নুই বেঙ্গলী' ও 'ন হন্যতে' নামক 'আন-কমন' এমন নামে 'বিশেষজ্ঞ টিম' জানতে চাইলো, "কি এমন চমৎকারিত্ব ছিল ঐ কাহিনির, যাতে অন্য অনেক ঘটনার আগেও আপনার মনে পড়লো মির্চা আর অমৃতার এ গল্প"? বিশেষজ্ঞ টিম প্রস্তাব দিলো, তারা কি তাদের সাহিত্য আর্কাইভে রক্ষিত 'মাইক্রো-ফ্লিম' ঘেটে ঐ বই দুটো বের করবে? ঘটনাটা আমার কাছে তখনো জলের মতই উজ্জ্বলতর ছিলো বলে আমি তাৎক্ষণিক বললাম -

"দরকার হবেনা খোঁজার। আশা করি আমি এর ব্যাখ্যা দিতে পারবো আমার পুরোণ স্মৃতি থেকেই। 'হিউমান প্রডাকশন ল্যাবে'র নিয়মানুসারে বিশেষজ্ঞ টিমের কাছে বর্ণনা দিতে শুরু করলাম আমি উনিশ শতকের কোলকাতার মেয়ে 'অমৃতা' আর 'রুমানিয়ার' ছেলে মির্চার ভালবাসার ঘটনা এক নিটোল প্রেমের সপ্তপদি দুখদের বহ্নিমান মৃত্যুর মত।

প্রাক্তন ভারতের কলকাতা শহরের ভবানিপুরে মৈত্রেয়ী দেবী নামে ১৬-বছরের এ তরুণি বাস করতো তার মা, বাবা, বোনের সাথে। যদিও এ পরিবারটির বসবাস ছিল মূলত প্রাক্তন বাংলাদেশের বরিশাল জেলার মনসামঙ্গলের কবি বিজয়গুপ্তের গ্রাম ফুল্লশ্রীতে। ষোড়শী এ মেয়েটিকে তার বিজ্ঞানী ও দার্শনিক বাবা ড. সুরেন্দ্রনাথ সেন ও মা হিমানী মাধুরী রায় (ইন্দিরা) 'রু' নামেই ডাকতো। মির্চা এলিয়াদের জন্ম ১৯০৭-সনে প্রাক্তন রুমানিয়ার বুখারেস্টে। ১৯২৮-৩২ সালে ভারতে 'নোয়েল এন্ড নোয়েল' কোম্পানির প্রতিনিধি হয়ে ২৫০-টাকা বেতনে সে ভারতে আসে চাকুরি করতে। উদ্দেশ্য চাকুরির সাথে ভারতীয় সংস্কৃতি আর জ্ঞান সাধনা। এবং ঘটনাক্রমে ড. সেনের বাড়িতে পেয়িংগেস্ট হয় তখনকার খৃস্টধর্মী ইউরোপিয়ান শেতাঙ্গ মির্চা। এ দার্শনিক বিজ্ঞানীর মেয়ে তৎকালীন ভারতীয় কফিরঙা অমৃতা কলেজছাত্রী, ভাবুক ও কবি। তার কথাবার্তায়, চালচলনে রয়েছে কিছুটা দার্শনিকতার ছাপ। অল্প বয়সী মেয়ের এমন আচরণ মির্চার মধ্যে যার পর নাই বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। একদিন সেই মেয়েটিকেই তখনকার ফ্রেন্স ভাষা শেখানোর দায়িত্ব পড়ল মির্চার ওপর। আর মেয়েটিকে দেয়া হলো মির্চাকে ঐ সময়ের কলকাতার বাংলা শেখানোর কাজ। অমৃতা প্রথম ভালোবেসেছিল একটি গাছকে, যে বৃক্ষ ছাড়া সে থাকতে পারতো না একটুও! অমৃতার দার্শনিকসুলভ ধীরস্থির আচরণ সহজেই মন কাড়ে মির্চার। অর্থাৎ নারী চরিত্র হিসেবে অমৃতা ঐ যুগে ছিল আধুনিক ও অনন্য।

১৯৩০-সালে কালচে বাদামি রঙের ভারতীয় এ বালিকার সাথে রোমানিয়ার এ তরুণের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠতে বেশি সময় লাগেনা। এ সম্পর্ক তারা গোপন রাখতেও পারেনি বেশিদিন। অল্পদিনেরই অভিভাবকেরা বিষয়টি জেনে যায়। কিন্তু বিস্ময়কর ছিল সেই ১৯৩০-এর পৃথিবীর ধর্মনির্ভর সমাজ। জাতপাত তথা ধর্মীয় কারণে তরুণটিকে শিক্ষকের বাড়ি থেকে চলে যেতে রূঢ়ভাবে এবং আর কখনোই মেয়েটির সাথে যোগাযোগ না করতেও বলা হয় কঠোরতর নির্দেশে। সন্যাস জীবন শেষে পরবর্তীতে সেই তরুণ পরিচিতি পান বিশ্বখ্যাত দার্শনিক হিসেবে। লেখেন একটি আধা-আত্মজৈবনিক উপন্যাস, যা ১৯৩৩-সালে রোমানিয়ায় প্রথম প্রকাশিত হয়। বইটি লেখা হয়েছিল বিশেষ করে একটি সাহিত্য পুরস্কারের জন্যেই। পরে তা "হট সেলার বুক" হিসেবে দেদার বিক্রি হয় এবং লেখকের জন্য বিপুল অর্থ ও খ্যাতি বয়ে আনে। উপন্যাসটি তখন ইতালিয়ান, জার্মান, ফরাসি, স্প্যানিশ সহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয় অল্পদিনেই। রোমানিয়ার সেই লেখকের নাম মির্চা এলিয়াদ, আর ভারতীয় মেয়েটির নাম মৈত্রেয়ী দেবী। রোমানিয়ার উপন্যাসটির ইংরেজি নাম 'বেঙ্গল নাইটস'। মির্চা এলিয়াদও এরপর সংসারি হন। তার দু'স্ত্রীর নাম ছিল যথাক্রমে Christinel Cotescu ও Nina Mareş কিন্তু দুজনেই ঘটনাক্রমে জ্ঞানতাপস মির্চার আগেই মৃত্যুবরণ করে তাকে একাকি রেখে।

এর পরে বিশ বছর বয়সে অমৃতার বিয়ে হয়ে যায় কলকাতার ভারতীয় মনমোহন সেনের সাথে। তাদের সন্তানও হয় দুটো। এরপর সে লেখালেখিতে আত্মনিয়োগ করেন, প্রকাশ করতে থাকেন কবিতা ও গদ্যের বিবিধ বইপত্র। ১৯৩৯-সালে তার পিতা ড. সেনের ইউরোপ ভ্রমণের পরেই কেবল 'রু' রোমানিয়ায় প্রকাশিত মির্চার লেখা 'লা নুই বেঙ্গলি' উপন্যাসটি সম্পর্কে জানতে পারেন। এও জানতে পারেন, সেটি তাকেই উৎসর্গ করে লেখা হয়েছিল। ১৯৭২-সালের দিকে লেখকের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু কোলকাতায় এলে অমৃতা বুঝতে পারেন যে, বইটিতে তাদের দুজনের 'যৌন' সম্পর্কের বর্ণনা করা হয়েছে। ঐ বইতে মির্চা সহজাতভাবে লেখেন, তাদের প্রেমের এক পর্যায়ে প্রায়শ রাতে তার প্রেমিকা তার ঘরে চলে আসতো তথা তাদের মধ্যে স্থাপিত হতো শারীরিক সম্পর্ক। যদিও মির্চার বইর উৎসর্গপত্রে অমৃতাকে লেখা ছিল "..... Tomar Ki moné acché ? .... Yadi thaké, taholé Ki, Kshama Karté Paro ? ...." 'মির্চার এ বর্ণনা পরিপূর্ণ মিথ্যে' - এ সত্য প্রতিষ্ঠা করতেই পাল্টা আরেকটি বই লেখেন ভারতীয় নারী মৈত্রেয়ী দেবী বা অমৃতা। সে বইটিই হলো ‘ন হন্যতে’। বাংলা করলে ‘ন হন্যতে’-এর অর্থ দাঁড়ায়, "হত্যা করা যায় না" বা "নিহত হয় না" এমন কিছু। মানবাত্মার আঁধার যে মানব-শরীর, তাকে হত্যা করা যায় কিন্তু আত্মাকে যায় না। উপন্যাসটিতে আসলে লেখিকা আত্মার অমরত্বের পাশাপাশি প্রেমের অমরত্বের কথা বলেছেন। এতোটুকু শোনার পর কিছুটা 'অধৈর্য' হন বিশেষজ্ঞ কমিটি। তারা জানতে চান - "যেহেতু প্রেমের পর দুজনেই আবার দুজনকে ভুলে যায় এবং আলাদা 'স্পাউসে'র সাথে ঘর-সংসার করতে থাকে, তাহলে আর বিশেষত্ব কি রইলো এ কাহিনিতে"?

আমি আবার বলা শুরু করি। অমৃতা মির্চাকে নিয়ে এতোদিন কিছুই লেখেনি কিন্তু মির্চার উপন্যাসের "জৈবিকতার পাঠ" তার কাছে অতিকথন তথা 'মিথ্যে বর্ণনা' মনে হয় ও সে এর প্রতিবাদে প্রায় ষাট বছর বয়সে মূল সত্যটি সামনে আনতে এক নতুন উপন্যাস রচনা করেন, যার নামই মূলত 'ন হন্যতে'। এ উপন্যাসে লেখিকার জীবনবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি, মির্চার তুলনায় নিঃসন্দেহে অনেক গভীর ও হৃদয়গ্রাহী, যেখানে দৈহিক চাওয়াকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে, পারিবারিক-সামাজিক ধমীয় রীতিকে প্রাধান্য দিয়ে। দুজনের বর্ণনাতেই যদিও অনেক ঘটনার বেশ সাদৃশ্য বিদ্যমান কিন্তু ১৯৩০-সনে অমৃতার বাড়ি থেকে মির্চাকে তাড়িয়ে দেয়ার পরের বর্ণনায় অমৃতা নিটোল সত্যকে ধরে রেখেছিল অত্যন্ত নিপুণতার সাথে। বই এর শেষভাগে এসে দীর্ঘদিন পর মৈত্রেয়ী আর এলিয়াদের সাক্ষাতের বর্ণনা আছে; ঐ সময়ের জীবনের অপূর্ণতা আরেক জীবনে মিটিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি আছে, আর আছে পার্থিব ভালবাসার অব্যক্ত হাহাকারের দহন।

এবং পরিণতিতে ১৯৫২-সনে পিতা ড. নরেন্দ্র সেনের মৃত্যুর পর, ১৯৫৭ শিকাগোতে যখন ইতিহাসের ধর্মীয় অধ্যাপক নিযুক্ত হন মির্চা এলিয়াদ, ক্রমে সেও স্ত্রী হারিয়ে নি:সঙ্গ একাকি জীবন কাটাতে থাকেন পুস্তক আর জ্ঞানের রাজ্যে। ১৯৮৬-সনে মির্চার মৃত্যুর আগে অমৃতা একাকী ভারতবর্ষ থেকে শিকাগোতে গমন করেন, কেবল তার ১৬-বছর বয়েসি প্রেমিক মির্চার সাথে দেখা করতে। কিন্তু শেষ জীবনে অমৃতা যখন পৌঁছলো তার বিশ্ববিদ্যালয়ে, মির্চা ততদিনে অন্ধ হয়ে গেছে চিরদিনের জন্যে। তাদের সেই সাক্ষাতের দৃশ্য আমাদের চিত্তকে এতো আলোড়িত করে যে, সারা জীবন তা ভোলার নয়। সাক্ষাতের প্রথমেই মির্চার টেবিলে অমৃতা তার নিজের লেখা ৪০-বছর আগের যে চিরকুটটি দেখতে পায়, তাতে লেখা ছিল - "অজস্র মণিমুক্তা সজ্জিত সুবর্ণ দেবতার মত, অপার অসীস সুষমায় আমি তোমার সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণতা হই, আর তুমি আমাকে বুকে তুলে নাও"। ঐ চিরকুটির কোনে মির্চারও শেষ কথাটি ছিল - "আমার প্রচণ্ড ইচ্ছে করতে লাগলো, অমৃতাকে অন্তত একবার চোখের সামনে দেখি"।

৪২-বছর পর অশীতিপর বৃদ্ধা অমৃতা যখন পৌছলো বৃদ্ধ অধ্যাপকের কক্ষে মেঝেতে ছড়ানো হাজারো পুস্তকের পাহাড় ডিঙিয়ে, তখন তার কাঙ্খিত ২০-বছরের মির্চা চুলহীন টাক মাথায় থুড়থুড়ে বুড়ো তার দিকে না তাকিয়েই বললো - "তুমি অমৃতা"। এবং প্রলাপের মত যখন মির্চা স্বগতোক্তিতে বলতে লাগলো - "চল্লিশ বছর! হায়! চল্লিশ বছর"। তখন ঐ কথার রেশ টেনে অমৃতা বললো-

- "জান লোকে আমায় জিজ্ঞাসা করে, কতোদিন তুমি আমাদের বাড়িতে ছিলে, আমার মনে পড়ে না, কতো দিন ছিলে বল তো?'

'হাজার বছর-' তবে?... আমি তো সেই তোমাকেই দেখতে এসেছি, যাকে Weapon cannot pierce, fire cannot burn... সংস্কৃতিতে বললে, 'ন হন্যতে হন্য মানে শরীরে-' ।

ফিরে যাচ্ছিল অমৃতা -অবশেষে কথা কইতে কইতে মুখ তুললে অমৃতা দেখলো স্থির দৃষ্টির পাথুরে চোখ মির্চার। চোখের আলো নিভে গেছে তার। এবং অমৃতার কণ্ঠ রুদ্ধ অনুভব করে মির্চা বললো -

......'একটু দাঁড়াও অমৃতা-... এতো দিন এতো সাহস দেখিয়ে, এখন তুমি ভেঙে পড়লে কেন? আমি বলছি, আমি যাব তোমার কাছে, এখানে নয়, সেখানে গঙ্গার তীরে, আমার সত্যরূপ তোমাকে দেখাব I will show you my real self on the shores of the Ganges..।'

এবং অমৃতারূপী মৈত্রেয়ী দেবী তার উপন্যাসটির শেষ বাক্য পর্যন্ত পাঠকদের ধরে রাখেন তার সৎ ভাষণে স্নাত করে যে, "ফিনিক্স পাখি হলেও মির্চার চোখে আলো জ্বালাবেই সে একদিন"। এবং শেষ বাক্যটি মির্চাই বলে - 'যেদিন ছায়াপথে তোমাদের দেখা হবে, তার তো আর বেশি দেরি নেই।'

হ্যা, এবং বেশি দেরী ছিলনা। শেষ সাক্ষাতের কদিন পরই প্রথমে মির্চা ১৯৮৬-তে এবং অমৃতা মৃত্যুবরণ করেন ১৯৮৯-তে এক পরিপূর্ণ বিচ্ছেদের যন্ত্রণাকাতর হাহাকার নিয়ে। কেবল প্রাক্তন ভারতীয় সামাজিক আর ধর্মীয় ভিন্নতার কারণে মির্চা আর অমৃতার মিলন হয়নি। তাই উনিশ শতকের এ দুই মানব-মানবী মুলত এক ট্রাজিক জীবন নিয়েই পৃথিবী ছাড়ে। আর 'ন হন্য'তে বই লিখে অমৃতা অনেক আপনজনকে বিব্রত করেছিল ঐ সময়ের সামাজিকতায়। কেউ-কেউ ওঁর সঙ্গ চিরদিনের জন্যে সম্পর্ক ত্যাগও করেছিল, কেবল একজন অভারতীয় অধার্মিকের সাথে প্রেম করার 'অপরাধ' প্রকাশ করার কারণে। আর এ ট্রাজিকতার কারণে আমার ইচ্ছে ১৯৩০-সনের অমৃতা আর মির্চাকে 'ক্লোন' করা হয় যেন এবং তাদের বেছে নেয়ার অধিকার দেয়া হোক আজকের ৩০১৬ সনের ধর্ম, জাতপাতহীন এ মুক্ত সুন্দর পৃথিবীতে।

৩০১৬'র পৃথিবীর মানুষেরা তাদের চিন্তন, বিজ্ঞান, যোগাযোগ ইত্যাদিতে প্রভুত উন্নতি করলেও, তার আবেগ রয়ে গেছে সেই ২০১৬'র মতই। তাই ন হন্যতের অমৃতা-মির্চা কাহিনি শুনে সুখ জীবনের স্মৃতিদীর্ণ পোড়ো বাড়ির কষ্টের মত বিশেষজ্ঞ টিম আবেগাপ্লুত হয় ঝড়োজলের মতই। ঐকমত্যে পৌঁছে তারা ১৯৩০-র শেষ বিচ্ছেদের দিনের অবয়বে অমৃতা আর মির্চার ক্লোন করতে।"

লেখক- সাহিত্যিক কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।

Ads