মরণ ফাঁদ শতবর্ষী নাজিরহাট পুরাতন হালদা সেতু
১৬ নভেম্বর ২০১৯, ০৫:০২ পিএম
মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বহু কালজয়ী ইতিহাসের নিরব সাক্ষী ফটিকছড়ি- হাটহাজারীর উপজেলার সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত শতবর্ষী নাজিরহাট পুরাতন হালদা সেতুটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যে কোনো সময় সেতুটি ধ্বসে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশংকা করছেন স্থানীয়রা। জানা যায়, গতবছরের মাঝামাঝি সময়ে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে মধ্যখানের একটি পিলারের মাটি সরে গিয়ে প্রায় দেড়ফুট দেবে যায় শতবর্ষী সেতুটি। যা বর্তমানে ৩ ফুট ছাড়িয়ে গেছে। তখন ফটিকছড়ি উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশে নাজিরহাট পৌরসভা কর্তৃপক্ষ জরুরী ভিত্তিতে সেতুটি দিয়ে সকল প্রকার চলাচল বন্ধ করে দিলেও পরের দিন এলাকাবাসী সেতুর দু’পাশে বেঁধে দেয়া লোহার গ্রীল ভেঙ্গে পুনরায় চলাচল শুরু করে। এর আগে ১৯৯৪ সালে সড়ক ও জনপথ বিভাগ সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছিল বলে জানা গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, এশিয়ার মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে খ্যাত হালদা নদীর উপর নির্মিত নাজিরহাট পুরাতন হালদা সেতুটি ফটিকছড়ি- হাটহাজারী উপজেলাদ্বয়ের সেতু বন্ধন হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে । বর্তমানে ব্রিজটির উভয়পাশ ও মধ্যভাগের বৃহৎ অংশ নিম্নে দেবে গেছে। ব্রিজের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। দু’পার্শ্বেও রেলিং অকেজো হয়ে পড়েছে। নিচের খুটিঁ অনেকটা সরু হয়ে গেছে। ফলে বর্তমানে এ সেতু দিয়ে সকল প্রকার যান চলাচল বন্ধ থাকায় বৃহত্তর ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীর উপজেলার ৫ লক্ষাধিক জনগোষ্ঠি বেকায়দায় পড়েছে। ধ্বস নেমেছে চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলীয় বাণিজ্যিক কেন্দ্র নাজিরহাটের ব্যবসা-বাণিজ্যেও।
৩’শ ৩০ ফুট দীর্ঘ এ সেতুটি পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, বৃহত্তর ফটিকছড়ি এবং হাটহাজারী উপজেলার লাখো জনসাধারণ ছাড়াও ট্রেন যাত্রীদের যাতায়াতের একমাত্র পথ। এমনকি, র্দীঘ ৩’শ ৩০ ফুট দীর্ঘ (১০০ মিটার) সেতুর অভাবে স্থানীয় সর্বসাধারণ ১০০ মিটারের পরিবর্তে প্রায় ৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। নিরুপায় হয়ে হেটেই পারাপার হচ্ছেন পথচারীরা। হেটেও পারাপারেও যেন বিপত্তি! ‘কাঁপতে থাকে সেতু, ভয়ে কাঁপে মানুষ’। বলতে গেলে সেতুটি এখন ব্যবহার অনুপযোগী। তবুও থেমে নেই মানুষের চলাচল। নানা প্রয়োজনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত পারাপার হতে হচ্ছেন ফটিকছড়ি-হাটহাজারীর লক্ষাধিক মানুষ। বিশেষ করে সেতুর দু'পাড়ে অবস্থিত বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রসার হাজারো শিক্ষার্থীর ভোগান্তি চরমে। প্রতিদিন প্রাণ হাতে নিয়ে সেতু পারাপার হচ্ছেন তারা। এছাড়া, সরকারী-বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক, নাজিরহাট পৌরসভা কার্যালয় সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংক-বীমা অফিস সেতুর পূর্ব পাড়ে অবস্থিত নাজিরহাট বাজারে হওয়ায়, ফটিকছড়ি-হাটহাজারীর বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী এ বাজারের উপর নির্ভরশীল। ফলে প্রতিদিন কয়েকহাজার মানুষ তাদের প্রয়োজন মেটাতে এ সেতুর উপর দিয়ে নাজিরহাট বাজারে আসে। এরমধ্যে যে কোন সময় সেতুটি ধ্বসে বড় ধরনের দূর্ঘটনার আশংকা রয়েছে। পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে দু'উপজেলার স্বাভাবিক যোগাযোগ । বন্ধ হয়ে যেতে পারে হাজারো শিক্ষার্থীর লেখাপড়া।
জানা গেছে, ১৯১৯ সালে বৃটিশ সরকারের আমলে তৎকালীন ডিস্ট্রিকবোর্ড(বর্তমান জেলা পরিষদ) ফটিকছড়ি-হাটহাজারী উপজেলার সীমান্ত এলাকা নাজিরহাটে এ সেতু স্থাপন করে। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাক হানাদার বাহিনী ডিনামাইড দিয়ে সেতুটির একাংশ ধ্বংস করে দেয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালে সেতুটি মেরামত করে পুনঃযোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করে। এরপর ব্যক্তি উদ্যোগে দু'একবার সংস্কার করা হলেও সেতু সংস্কার কিংবা পুনঃনির্মাণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলে দাবী স্থানীয়দের। ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা জানান, ঝুঁকিপূর্ণ শতবর্ষী এ সেতুটি পুনঃনির্মাণ সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবী হলেও দু’উপজেলার কোনো এমপি-মন্ত্রী কিংবা জনপ্রতিনিধিগণ সামান্যতম আন্তরিক হননি। সবাই শুধু আশার বাণী শুনিয়ে গেছেন। হয়তো তাঁরা মানুষের প্রাণহানির জন্য অপেক্ষা করছেন; তবেই তাদের ঘুম ভাঙ্গবে। বড় ধরনের বিপর্যয় মোকাবেলা করতে এবং দু’উপজেলার মানুষের জীবন ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে জনস্বার্থে দ্রুত সময়ের মধ্যে জনগুরুত্বপূর্ণ সেতুটি পুনঃনির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী।
এদিকে, ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটি ভেঙ্গে পাশে নতুন সেতু নির্মাণে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে। গত ২২ অক্টোবর নাজিরহাট বাজার সংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ পুরাতন হালদা সেতু স্থলে নতুন সেতু নির্মাণে সেতু এলাকা পরিদর্শন করেন এলজিইডি'র প্রকল্প পরিচালক (গ্রামীণ অবকাঠামো ও সেতু পুনঃনিমার্ণ) এবাদত আলী। ইতোমধ্যে, ঝুঁকিপূর্ণ এ সেতুটির সরেজমিন প্রতিবেদন,নক্সা সহ যাবতীয় প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন এলজিইডি'র বিশেষজ্ঞ (ইকিউএমএস কনসাল্টিং লিঃ) রাফিউল ইসলাম।
































