বসন্ত ছুঁয়ে দিল প্রাণ
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:১৭ পিএম
পথের ধারে ঝরা পাতার মর্মরধ্বনি জানান দিচ্ছে পুরাতনকে বিদায় দিয়ে হাজির হচ্ছে নতুন ঋতু। কংক্রিটের শহর কিংবা শ্যামল ছায়ার চির সবুজে মায়াবী রূপের আগুন ঝরিয়ে ডানা মেলে আসে প্রকৃতিতে ঋতুরাজ বসন্ত।সবুজের বুকচিরে উঁকি দেয় লাল রঙের পলাশ ফুল। প্রকৃতি আজ দক্ষিণা দুয়ার খুলে দিয়েছে। সে দুয়ারে বইছে ফাগুনের গোলাপী হাওয়া। বসন্তের আগমনে কোকিল গাইছে গান। ভ্রমর করছে যৌবনেরসুধা পান। গাছের ডালে পলাশ ফুলের মেলা।
ফাল্গুনের হাত ধরেই ঋতুরাজ বসন্তের আগমন। ঋতুরাজকে স্বাগত জানাতে প্রকৃতি করছে এতো বর্ণিল সাজ। ফাগুনের গন্ধমাখা দখিনা হাওয়া মেখে শহরের এক প্রান্ত থেকে সে প্রান্তে ঘুরে বেড়ায় তরুণ-তরুণী। বসন্তের স্বাদ পাওয়ার জন্যে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে প্রেমিক প্রেমিকার দল, শিশু থেকে শুরু করে তরুণ, কিশোর, যুবা, মধ্যবয়সী কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠ। বসন্তে বাসন্তী কিংবা হলদে শাড়ি পড়া তরুণীরা পলাশের রঙের সাথে মাতিয়েতোলে রংধনুর খেলা। তরুণীর খোঁপায় শোভা পায় পুষ্পমালা। কারও কপালে শোভা পায় গোলাপ-গাঁদায় গড়া টায়রা। পাঞ্জাবি বা ফতুয়ায় পুরুষের দেখা মিলে বাসন্তীসহ নানা রঙের ছড়াছড়ি। এভাবেই বহু বর্ণে ঋতুরাজ বসন্ত আসে আমাদের প্রকৃতিতে ।
আবহমান বাংলার ঋতু বৈচিত্র্যের উল্লেখযোগ্য ঋতু বসন্ত। এ ঋতুকে বলা হয় ঋতুরাজ। বঙ্গাব্দের শেষ দুই মাস ফাল্গুন ও চৈত্র মিলিয়ে বসন্ত ঋতু।
গাছের শাখার শাখায় রঙিন ফুলের পসরা সাজিয়ে, ঝরিয়ে দিয়ে মলিন পাতার রাশি বসন্ত প্রকৃতির কাছে করে আবদার। পহেলা ফাল্গুনে সূর্য ছড়িয়েদেয় তার গুচ্ছিত সফল আলোর ঝলক। বসন্ত মানেই নতুন সাজে প্রকৃতি মুখরিত হওয়ার দিন। ফুল ফোটার পুলকিত সময়। ফাল্গুন পেরিয়ে বসন্ত তার যৌবনের চৌকাঠ মাড়িয়ে চৈত্রে পদার্পণ করে। আপনা হতেই প্রকৃতিতে লাগে পরিবর্তনের হাওয়া। তরুলতা পুরানো পাতা ঝেড়ে ফেলে নববধূরূপে মুকুলিত হয়। পত্রপলবে সুশোভিত,মূখরিত হয় সবুজ উদ্যান। কোকিল ফাগুনের হাওয়ায় ডানা ভরকরে গেয়ে ওঠে সুখ বিলাসী গান। এ বসন্তকে আশ্রয় করে শিল্পীর কন্ঠে আবিষ্কার হয় নতুন নতুন গান।কবির মনে ভেষে উঠে বসন্তে কবিতার ছন্দ।শিল্পীর তুলির আচড়ে ফুটে ওঠে ললনার বাসন্তী শাড়ির নকশা।
শীতের খোলসে ঢুকে থাকা কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, নাগলিঙ্গম বসন্তের অলৌকিক স্পর্শে জেগে উঠে। বাতাসে ভেসে আসা ফুলের গন্ধে বসন্ত জানিয়ে দেয়, সত্যি সে ঋতুর রাজা।তাইতো হলুদ, লাল বাসন্তী রঙে প্রকৃতির সাথে নিজেদের সাজিয়ে বসন্তের উচ্ছলতায় ভাসে বাঙালি ললনা। নতুন কচিপাতার দোলায় দুলে প্রকৃতি, দুলে আবেগী মন। এ বসন্তে নতুন ও প্রবীণ প্রাণে লাগে ফাগুনের সতেজ হাওয়া।
পৃথিবীর অনেক প্রান্তে এই ঋতুতে নতুন গাছের পাতা গজায়, নতুন গাছের জন্ম হয়।বসন্তে গাছে গাছে ফোটে অনেক যাতের ফুল যেমন, অশোক,আকড়কাঁটা,হিমঝুড়ি, ইউক্যালিপটাস,কুরচি,কুসুম, গাব, গামারি, গ্লিরিসিডিয়া, ঘড়ানিম,জংলীবাদাম, দেবদারু, নাগেশ্বর,পলকজুঁই, পলাশ, পাখিফুল , পালাম, বুদ্ধনারিকেল, মনিমালা, মহুয়া, মাদার, মুচকুন্দ, রুদ্রপলাশ, শাল, শিমুল, স্বর্ণশিমূল,ক্যামেলিয়া ইত্যাদি।
যান্ত্রিক শহর ঢাকায় বিরাজ করে বসন্তের স্নিগ্ধ আবহাওয়া। প্রকৃতির পালাবদলে নাগরিক মনে এখন বইছে ফাল্গুনে ফোঁটা পলাশ ফুলের মিষ্টি সুভাষ।চারি পাশে পাক পাখালির কন্ঠে গুঞ্জরিত হচ্ছে ‘ওরে ভাই ফাগুন এসেছে বনে বনে’। মায়াভরা এ রূপময় ঋতু বরণে নিজের সুবিধামতো সময়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে রাজধানীবাসী।তাদের পোশাক ও মনে থাকে বসন্ত বরণের নয়ন জুড়ানো দৃশ্য। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহরের নানা প্রান্তজুড়ে থাকে বসন্ত বন্দনার বহু আয়োজন। শহরের বিভিন্ন প্রসস্ত রাস্তা এ বসন্তকে ঘিড়ে বাহারি আল্পনায় ফুটিয়ে তোলে রং তুলির শিল্পীরা। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকার সড়কগুলো বাহারি রঙে সাজানো হয়। সবচেয়ে আকর্ষণীয় আয়োজনটি থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় বিভিন্ন আয়োজন। এখানেই ১৪০১ বঙ্গাব্দে সূচনা হওয়া বসন্ত আবাহনের অনন্য আয়োজনটি করে জাতীয় বসন্ত উৎসব উজ্জাপন পরিষদ।
বসন্ত উজ্জাপনের জন্য, রোদ ঝলমলে সকালের আলো যখন ছড়িয়ে পড়ে গাছের সবুজ পাতার উপর। বকুলতলায় সবুজ পাতার ফাঁকে মিষ্টি রোদের কিরণে উদ্ভাসিত হয় বকুলতলার মঞ্চ। ভেসে আসে টুংটাং শব্দ তোলা সুর।হারমনিয়াম,তবলা ও গিটারের যন্ত্রসঙ্গীতে বসন্ত বাহার রাগের আশ্রয়ে ঋতুরাজ বরণের প্রথম পরিবেশনাটি উপস্থাপন করেন এক দল শিল্পী। এরপর শিল্পীদ্বয় কণ্ঠে তুলে বাহারি গান।বাংলাদেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতি সংগঠন বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে বসন্তকে বরন করেনেয় ।
ফাল্গুন এবং চৈত্রমাস মিলে হয় বসন্ত ঋতু। বসন্ত ঋতুর আগমন ঘটে শীত চলে যাবার পর এবং গ্রীষ্ম আসার আগে।বাংলা পঞ্জিকা বর্ষের শেষ ঋতু বসন্তের প্রথম দিনকে বাঙালি পালন করে ‘পহেলা ফাল্গুন-বসন্ত উৎসব’ হিসেবে।এদিনটির জন্য দির্ঘ অপেক্ষাকরে তরুনরা। বাঙালির নিজস্ব সার্বজনীন প্রাণের উৎসবগুলোর মধ্যে এ উৎসব গোটা বাঙালির কাছে ব্যাপক সমাদৃত ।বসন্ত উৎসব এখন সবার প্রিয় উৎসব হলেও এর শুরুর একটা ঐতিহ্যময় ইতিহাস আছে, যা অনেকের অজানা।মোগল সম্রাট আকবর প্রথম বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেন ১৫৮৫ সালে। নতুন বছরকে কেন্দ্র করেই ১৪টি উৎসবের প্রবর্তন করেন তিনি। এর মধ্যে বসন্ত উৎসব অন্যতম। তখন অবশ্য ঋতুর নাম এবং উৎসবের ধরনটা এখনকার মতো আগে ছিল না। তাই পহেলা ফাল্গুন বা বসন্ত উৎসব কেবল উৎসবে মেতে ওঠার সময় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালিসত্তা ও ঐতিহ্য।
বঙ্গাব্দ ১৪০১ সাল থেকে প্রথম ‘বসন্ত উৎসব’ উদযাপন করার রীতি চালু হয়। সেই থেকে জাতীয় বসন্ত উৎসব উজ্জাপন পরিষদ বসন্ত উৎসব আয়োজন করে আসছে।
















