গল্পটি শীতের
২০ জানুয়ারি ২০১৯, ০৮:৪৮ পিএম
প্রতিদিন সকালবেলা দাদু বাড়ির উঠানে চেয়ার পেতে বসে খবরের কাগজ পড়েন আর শীতের মিষ্টি মিষ্টি রোদ শরীরে মাখেন। অরিত্রী দৌঁড়ে এসে দাদুকে জাপটে ধরে বলে, ‘দাদু, তুমি রোদে বসে খবরের কাগজ পড়ছ কেন?’
দুষ্টু মিষ্টি নাতনির কথার জবাব দাদু না দিয়ে থাকতে পারেন না।
‘শোনো দাদু, শীতের রোদ খুবই মিষ্টি; গাঁয়ে মাখলে সব ঠাণ্ডা পালিয়ে যায়। তুমিও বইপত্র নিয়ে এসো। আমার কাছে বসে পড়বে। দেখ না কত মজা লাগে!’
অরিত্রী দাদুর কথা না মেনে ভৌঁ-দৌড়ে পালিয়ে যায়।
দাদু আবার খবরের কাগজ পড়ার দিকে মনোযোগ দেন। ওদিকে দাদি শীতের পিঠা নিয়ে হাজির হয়ে যায়।
‘রাখো দেখি খবর পড়া! সকালের নাস্তাটা করে নাও।’
শীতের পিঠা দেখে দাদু আর লোভ সামলাতে পারেন না। চটজলদি জলে হাতে ধুঁয়ে নিয়ে দুধে ভেজা চিতই পিঠা মুখে দেন। দু’একটা পিঠা খেতে না খেতেই দুষ্টু মিষ্টি নাতনি অরিত্রী কোথা থেকে যেন আবার ছুটে আসে।
‘দাদু, শীতকালে আমরা দুধে ভেজা চিতই পিঠা খাই কেন?’
নাতনির বড্ড কঠিন প্রশ্ন শুনে দাদুর বিষম ঠেঁকে যায়।
‘ওরে দুষ্টু, এতেও তোর প্রশ্ন! ও আমি জানি না ভাল। তোর দাদিকে জিজ্ঞেস কর।’
‘ও দাদি, তুমি বল না।’
দাদি অরিত্রীর কথা ফেলতে পারেন না।
‘শোনো তাহলে, শীতকাল হল পিঠা-পুলি খাওয়ার উপযুক্ত সময়। এ সময় খেঁজুরের গুড়, আমন ধানের চাল পাওয়া যায়। আর খেঁজুর গুড়রের পিঠা যে কত মজা তা তোমার দাদুকেই জিজ্ঞেস কর।’
দাদি শীতের পিঠার কথা শেষ করতে না করতেই অরিত্রী ছুটে পালায়। দাদু দাদিকে বলেন, ‘খুব দুষ্টু হবে আদরের নাতনিটা।’
দাদুর খবরের কাগজ পড়া শেষ হয়ে যায়। সকালের রোদের স্পর্শে চেয়ারে তিনি ঠেঁকনা দিয়ে ঘুমঘুম ভাবে বসে পড়েন। অরিত্রী এসে পেছন থেকে দাদুকে ধাক্কা দিতেই দাদু জেগে ওঠেন। ‘কি হল রে দুষ্টু বুড়ি?’
‘দাদু, আমাকে নিয়ে চল না।’
‘আরে কোথায় নিয়ে যাবো, বলবে তো?’
‘খেঁজুরের গুঁড় কিভাবে তৈরি করে, তা আমি দেখতে চাই।’
অরিত্রীর বায়নায় দাদু তো রীতিমত থ মেরে যায়। যারা গুঁড় বানায়, তাদের বাড়ি গ্রামের পশ্চিমপাড়ায়। এখন কি যাওয়া সম্ভব?
‘ঠিক আছে, তোমাকে বিকালে নিয়ে যাবো।’
কিন্তু অরিত্রী যেন কোনো বাঁধা মানে না। দাদুকে ঠেলে চেয়ার থেকে উঠায়।
‘চল না, দাদু এক্ষুণি।’
দাদু অরিত্রীকে নিয়ে পশ্চিম পাড়ার কাশেম শেখের বাড়ির দিকে রওনা করেন। দাদু এক হাতে লাঠিতে ভর করে হাঁটেন, অন্য হাত নাতনির হাত ধরেন। গ্রামের মেঠেপথের দূর্বাঘাসের ওপর শিশির মাড়িয়ে সকাল সকাল দাদু-নাতনি গাছুয়ার বাড়িতে পৌঁছে যায়।
কাশেম শেখের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে দাদু খেঁজর গুঁড় প্রস্তুত করার কার্যপ্রণালী নাতনিকে দেখায়।
‘অরিত্রী, ঐ যে লোকটাকে দেখছ না, তিনি হল কাশেম শেখ। এ গ্রামের নামকরা গাছুয়া। তিনি বিকালবেলা খেঁজুর গাছে চড়ে মাটির হাড়ি লাগিয়ে আসেন। সারারাতে হাড়িগুলো খেঁজুরের রসে টুইটুম্বর হয়ে যায়। সকাল হওয়ার আগেই হাঁড়িগুলো গাছ থেকে নামিয়ে আনেন। তারপর রসগুলো ছাঁকনি দিয়ে ছেকে চুলায় জ্বাল করানো শুরু করে দেন। এভাবে ধীরে ধীরে রসগুলো শুক্রোজে পরিণত হয়। তারপর গুঁেড় পরিণত হয় যেগুলো তিনি বাজারে বিক্রয় করে জীবিকা নির্বাহ করেন।’
অরিত্রী গুঁড় তৈরির প্রণালী ঘুরে ঘুরে দেখে আর অবাক হয়ে যায়। সে মনে মনে ভাবে, ‘পানি (রস) থেকে কিভাবে গুঁড় হয়?’
অরিত্রী ও তার দাদুকে কাশেম শেখের স্ত্রী শীতল পাটিতে বসতে দেয়। অরিত্রী বসে বসে আবারও ভাবতে থাকে, ‘সত্যই পানি (রস) থেকে কিভাবে গুঁড় হয়?’
দাদু অরিত্রীকে জিজ্ঞেস করে, ‘কি ব্যাপার অরিত্রী, তুমি কি কিছু ভাবছো?’
অরিত্রী একটু লজ্জ্বা পেয়ে যায়।
‘না দাদু, তেমন কিছু না।’
ওদিকে কাশেম শেখের স্ত্রী অরিত্রীর জন্য মুড়ির মোয়া নিয়ে আসেন।
‘সাহেব, আপনার শহুরে নাতনিকে দিন এগুলো। ও খেয়ে বেশ মজা পাবে।’
বড় বড় মুড়ির মোয়া দেখে অরিত্রী দাদুকে প্রশ্ন করে, ‘দাদু, এগুলো কি? কি দিয়ে বানায়?’
এবার দাদু তার নাতনির প্রশ্নের উত্তর অকপটে দেন।
‘এগুলো হল মুড়ির মোয়া। গুঁড় ও মুড়ি দিয়ে বানানো হয়েছে। এগুলো বাজারে বিক্রয় করা হয়।’
অরিত্রী দাদুকে বলে, ‘দাদু, আমি কিছু মোয়া এবার শহরে নিয়ে যাব।’
‘অবশ্যই নিয়ে যাবে। কাশেম শেখের বাড়ি থেকে খাঁটি গুড়, মোয়া তোমাদের জন্য কিনে দেওয়া হবে। তোমার আম্মু অনেক আগেই বলেছে।’
তারপর দাদু-নাতনি বাড়ি ফিরে আসে।
অরিত্রীর দাদুর বাসায় কয়েকটি খেঁজুর গাছ রয়েছে। বিকালবেলা অরিত্রী উঠানে খেলছিল। হঠাৎ দেখে যে কাশেম গাছুয়া গাছের ওপর উঠে হাঁড়ি লাগাচ্ছেন। অরিত্রী তা দেখে দৌঁড়ে তার আম্মুর কাছে যায়।
‘আম্মু আম্মু, ঐ লোকটা ওখানে কিভাবে উঠলেন? বল না।’
‘অরিত্রী, গাছ বেয়ে বেয়ে উঠেছেন তিনি। তারা এ কাজে বেশ অভ্যস্ত।’
‘যদি ওখান থেকে ছিটকে পড়ে যায়, তাহলে কি হবে আম্মু?’
‘একদম বোকা মেয়ে তুমি! বললাম তো, তারা অভ্যস্ত।’
তারপর সে দৌঁড়ে গিয়ে কাশেম শেখকে প্রশ্ন করে, ‘দাদু, গাছে উঠতে আপনার ভয়ে করে না?’
কাশেম শেখ মুচকি হাসি দিয়ে জানায়, ‘না দাদু, আমি বেশ দক্ষ। ত্রিশ বছর ধরে এ কাজ করছি।’
পরের দিন সকালবেলা। অরিত্রী দেখতে পায়, তার দাদু আজও চেয়ারে বসে রোদ পোহাচ্ছেন আর খবরের কাগজ পড়ছেন।
‘দাদু, তুমি কি রোজ এভাবে মিষ্টি রোদ গায়ে মাখো আর খবরের কাগজ পড়?’
দাদু এক চিলতে হাসি দিয়ে বলেন, ‘তুমি ঠিক ধরতে পেরেছ। এটা আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। সকালের মিষ্টি রোদ আমাকে প্রাণবন্ত করে তোলে। তুমিও বস, ভাল লাগবে।’
আজ আর অরিত্রী দৌঁড়ে চলে যায় না। দাদুর পাশে চেয়ার পেতে বসে। একটু পর, দাদি দুই গ্লাস ঠাণ্ডা খেঁজুর রস এনে দু’জনকে দেন। খেুঁজর রস দেখে দাদিকে অরিত্রী জিজ্ঞেস করে, ‘দাদি এগুলো কি?’
দাদি গ্লাস হাতে দিতে দিতে বলেন, ‘এগুলো হল, খেঁজুরের রস। খেয়ে দেখ, দারুণ মজা লাগবে।’
দাদুর সাথে সাথে এক চুমকে এক গ্লাস রস অরিত্রী খেয়ে ফেলে।
‘সত্যই, খেঁজুর রস মজাদার!’
অরিত্রীর কথায় সায় দিয়ে দাদু বলেন, ‘মজার বলেই তো আমি প্রতিদিন খাই।’
‘হুম দাদু, শহরে ফিরে গেলে তোমাদেরকে যেমন মিস করব, তেমনি শীতের পিঠা, খেঁজুর গুঁড়, রস, মুড়ির মোয়া ও কুয়াচ্ছন্ন গ্রাম বাংলার সুন্দর প্রকৃতি মিস করব।’
দাদু অরিত্রীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, ‘কোনো মিস নয়, তোমরা প্রতিবার শীতেই আসবে। তোমাদের পেয়ে আমার মনটা ভরে ওঠে।’
















